Monday, August 3, 2020

টেনেরিফের বতুতা বাহিনী-৩

সিয়াম পার্কের কৃত্রিম সৈকত। ছবিঃ অন্তর্জাল

৬.

ওয়াটার পার্কের নাম শুনলেই মনে হয় দেয়াল ঘেরা বিশাল কোনো জায়গা, যার চিপা চুপায় অনেকগুলো পানির কল বসিয়ে রাখা আছে আর লোকজন তাতেই হুটোপুটি খাচ্ছে। এর মাঝে বিনোদনের কি আছে। সুতরাং, প্যাঁচা মুখ করে ঘুরছি। টেনেরিফের একেবারে উত্তর দিকে সিয়াম পার্ক নামের এই ওয়াটার পার্কে আসতে সময় লেগেছে। বাকিটা দিন মাঠে মারা যাবে মনে হচ্ছে।

আশে পাশে নানান বয়সী ছেলেবুড়ো আর বিকিনি সুন্দরীদের ভিড়। এমন নির্মল খোলামেলা পরিবেশে এসে বেশ লাগছে আমাদের দলের জনা দুয়েকের। ছেলের বাবা আর তার স্যাঙ্গাৎ আর কি। তারা আগ্রহ নিয়ে আগে আগে হাঁটছে। আমি আর আদিবা আস্তে ধীরে অলস পা ফেলছি। আজকের দলটা অসম্পূর্ন। সামান্য সর্দি-গর্মির কারনে ছোট্ট আমালিয়াকে তার বাবার জিম্মায় রেখে আসতে হয়েছে। আদিবা তাই ঝাড়া হাত-পা। কিন্তু তার কপালে দু’টো ভাঁজ। ছানা রেখে এসে ঠিক স্বস্তি লাগছে না।   

দলের একমাত্র শিশু তাফসু মিয়াকে দলপতি বানিয়ে তার আজ্ঞায় বাকিরা চললাম পিছু পিছু। খানিক্ষনের ভেতরেই সে তার মর্জি মত ভিজে ভূত হয়ে একটা ভেজা তোয়ালের মত হয়ে গেল। হাত চাপলেই পানি ঝরছে। তবুও থামাথামি নেই। তার ইশারায় এবার যেতে হল সৈকতের দিকটায়। একটা হোঁচটের মত খেলাম। এ যে দেখি কৃত্রিম বানিয়ে রাখা সিমেন্টের সৈকত। টেনেরিফের অমন দারুন বীচ রেখে লোকে এখানে ভিড় করছে কেন, মাথায় ঢুকলো না।

লোকের চিন্তা বাদ দিয়ে আরেক চিন্তা এসে ভর করেছে। বিশাল ঢেউ পাল তুলে হঠাৎ তেড়ে আসছে। মানুষজন আতংকে চিৎকার করছে রীতিমত। এদের পানির কল ফেটে ফুটে গেল নাকি? নইলে এমন সুইমিং পুল মার্কা জায়গায় ঢেউ আসবে কোত্থেকে? মুহূর্তের মাঝে বাবা-ছেলে বরাবর দৌড় লাগালাম। এদের কেউই সাঁতার জানে না। বড় একটা ছাতার ছায়ায় আধশোয়া আদিবা কিচির মিচির করে কি যেন বলছে। কিছুই ভাল করে কান অবধি পৌছালো না।

বারো হাত কাকুরের তেরোর হাত বিচির মত হাঁটু পানির নকল সৈকতে ঘাড় সমান ঢেউটা আছড়ে পড়ে এক ধাক্কায় ছিটকে ফেলে দিলো। পুরোপুরি হতভম্ব, তবে আশ্বস্ত চোখে দেখলাম সাঁতার না জানা দু‘জন দিব্যি একজন আরেকজনের কাঁধে আকর্ন হাসি নিয়ে বসে আছে। তাদেরকে হাঁটু পানির জলদস্যুর মতই দুর্ধর্ষ লাগছে।

ঢেউটা তো একটা খেলা। অ্যাডভেঞ্চার ভাব আনার জন্যে একটু পর পর এরা পানির একটা তোড় ছাড়ে। আসতে আসতে খেয়াল করেন নি? বাই দ্যা ওয়ে, দৌড়টা কিন্তু সেরকম খিঁচে দিয়েছেন, হাহাহা...। ’ আদিবার একটু আগের কিচির মিচিরের অর্থ বুঝলাম এতক্ষনে।

৭.

বাকিটা বেলার পুরোটা জলে-ডাঙ্গায় কাটিয়ে যখন ফিরলাম, তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। দলের বাকি সদস্য আমালিয়া আর তার বাবা আকরাম এসে জুটেছে সাথে। বসেছি সেই গতকালের কাঁচা পেঁপের আলপাকা রঙের চেয়ার টেবিলেই। তবে আজকের আয়োজন অন্যরকম। মঞ্চের মত বাঁধা হয়েছে রেস্তোরাঁর পেছনের ফাঁকা জায়গাটায়। আলো-আঁধারের ঝাপসা পরিবেশ বদলে গিয়ে বল্রুমের ঝকমকে ঝালর ঝুলছে মঞ্চের ওপাশে।  

হেতুটা স্পষ্ট হতে সময় লাগলো না। ফ্লামিঙ্গো নাচ হবে এখন। পুরু করে মোজ্জারেলা দেয়া পিজ্জা আর রোজমেরীর ঘ্রানে ভুরুভুর মাশরুম পাস্তার থালা ঠেলে উঠে গেলাম। একটা সম্মোহন কাজ করছে। আঁটোসাঁটো নকশা কাটা পোশাকে চওড়া কাঁধের দুইজন ভীষণ সুপুরুষের বিপরীতে টকটকে লাল গাউনে দুই অপ্সরী এগিয়ে এল। তাদের ব্লক হিল স্যু অদ্ভূত সুরে তাল তুলেছে। স্প্যানিশ গিটারের সাথে জুতার ঠকঠক যেন সঙ্গতের কাজ করছে। সেতারের সাথে যেমন তবলা।  

ভাবছি,পায়ের জুতা কি হাতের গিটার, সবই তো নিষ্প্রান কাঠের। তাদের জুড়ি কি করে এমন জ্যান্ত, প্রানবন্ত হয়ে উঠছে। তালে তালে মরাল গ্রীবা বাঁকিয়ে মোহনীয় মুদ্রায় লাল গাউনের নাচিয়েদের ঝরে পড়া কৃষচূড়া বলে ভুল হচ্ছে। এই তাহলে ফ্লামিঙ্গো নাচ। টেবিলের থালাগুলো জুড়িয়ে যেতে দিয়ে আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মত হারিয়ে গেলাম সুর-তাল-লয়ের প্রলয়ে।

কড়া হাততালি দিয়ে নাচের পালার ইতি টানা হল। আমরাও খাবারগুলোর কাছে ফিরে এলাম। ঠান্ডা পিজ্জা টান দিতেই চুইংগামের মত লম্বা হতে লাগলো। তা-ই গোগ্রসে চিবিয়ে গিলে ক্ষুধার্ত পেটে পাঠিয়ে দিলাম।

বাক্স-পেটরা গুছিয়ে নাচিয়ের দলটা বেরিয়ে যাচ্ছে। ব্যস্ত সমস্ত ভাব। কৌতূহলী আড়চোখে তাদের ব্যস্ততা দেখছি। একজন নর্তকীকে দাঁতের পাটি খুলে ছোট্ট একটা বাক্সে পুরে নিতে দেখে তাজ্জব বনে গেলাম। আরেকজন ঘন কালো পরচুলা খুলে ভাঁজ করছে। চেপ্টে থাকা পাতলা ফিনফিনে চুল ঘেমে লেপ্টে একাকার। পুরুষদের একজন কন্ট্যাক্ট লেন্স খুলে মোটা ফেমের চশমা এঁটেছে নাকের ডগায়। পৌরুষদীপ্ত ভাবটা উবে গিয়ে তাকে স্কুলের মাস্টার মশাই লাগছে রীতিমত। সাজসজ্জার সাথে একটু আগের দারুন শোম্যানশীপও স্যুটকেসে পুরে নিল চারজনের দলটা। ঢোলা টি-শার্ট আর ভুশভুশে জিন্সে নয়-পাঁচটা চাকুরের মত হদ্দ ক্লান্ত হয়ে বিদায় নিল তারা। কে জানে আরেক রেস্তোরাঁয় গিয়ে নাচতে হবে কিনা আবার। বিচিত্র অথচ বাস্তব এক অনুভূতিতে মন ছেয়ে গেল। (চলবে)


ছবি কৃতজ্ঞতায়ঃ আদিবা আমাথ ও অন্তর্জাল

-রিম সাবরিনা জাহান সরকার

মিউনিখজার্মানি০১.০৮.২০২০


Thursday, July 30, 2020

টেনেরিফের বতুতা বাহিনী-২

৪.

দলবিহীন একলা ডাকাতকে দুর্ধর্ষ লাগে না। কেমন মিনমিনে সিধেল চোর মনে হয়। বেড়াতে এলেও দলবল লাগে। নইলে ঠিক পর্যটক পর্যটক ভাব আসে না। ভবঘুরে-ভ্যাগাবন্ড মন হয়ে বড়জোর। হোটেলে পা রাখা মাত্র আমরা তাই দল ভারী করে ফেলে জাতে উঠে গেলাম। আদিবা আর আকরাম তাদের পুঁচকে ছানা আমালিয়াকে নিয়ে আমাদেরই অপেক্ষায় বসে ছিল। শুধু বগলে জুতা চেপে ইবনে বতুতা সেজে বেরিয়ে পড়া বাকি। 

ঘাড়ের বয়সী এই তরুন দম্পতির সাথে আগেও এদিক সেদিক যাওয়া হয়েছে। বছর খানেকের ছোট হলেও মনের দিক থেকে কাছাকাছি বয়সের। তাই একসাথে পথ চলতে বেশ লাগে। আরেকটা ব্যাপার আছে। আদিবা-আকরামদের ভেতর বউ-জামাই ভাবটা প্রবল। আকরাম কারন ছাড়াই হম্বিতম্বি করছে তো আদিবা আবহামান বাঙালি নারীর রূপ ধরে হাসিমুখে চুপ করে আছে। আসলে এটা এক ধরনের ভেক। আদিবার সাথে থাকলে আমিও এই ভেক ধরি। ছেলের বাবাকে ইচ্ছেমত কর্তৃত্ব ফলাতে দেয়া হয়। সমস্ত সিদ্ধান্ত তাদের হাতে। বউদের এই ‘জি জাঁহাপনা’ চেহারা ভাল লাগে না, এমন বাংলাদেশি ছেলে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাই খোশ মেজাজের স্বার্থে তাদেরকে দিন কতকের জন্যে সিংহাসনটা ধার দিতে কোথাও বাধে না।   

চোখে মুখে পানির ঝাপ্টা মেরে জাঁহাপনাদের পিছু পিছু আমরা বেগমরা বাচ্চাকাচ্চা কোলে নিয়ে আবার তৈরি হয়ে নিলাম। হাতে আজকের পুরো বিকেলটা রয়ে গেছে। খরচ না করা অবধি শান্তি মিলছে না। ডেকে আনা ট্যাক্সিতে চেপে সৈকতের দিকটায় চললাম। যেতে যেতে পুরোটা সময়ে হাতের ডানের পাহাড়ের সারি হাতছানি দিয়ে ডাকলো। পাহাড়ের মাথায় ঘোলাটে মেঘের আনাগোনা। মোটামুটি বিশ্বাস হয়ে এল তার চূড়ায় বুঝি বা কোনো ডাইনি বুড়ির রাজ্য। অথচ পাহাড়ের আঁচলেই সৈকত। আর সেখানে দিব্যি আয়েশী রোদের ছড়াছড়ি। যেন পাশাপাশি দুই সমান্তরাল জগত। আলো আর আঁধারে কি অদ্ভূত হাত ধরাধরি। 

৫.

সৈকতে নেমে আরেকবার চমক লাগলো। কোথায় সাগরতীর ঘেঁষা সোনার কুঁচির মত বালুর রাশি। এখানে বালু নিকষ কালো। যেন এই বালুকাবেলা পৃথিবীর কোন অংশ না। ভাড়া করা হলুদ ট্যাক্সিটা দশ ইউরোর বদলে আমাদেরকে আরেক গ্রহে পৌঁছে দিল নাকি?

আমাদের ঘোর কাটছে না। এই সুযোগে ছানা দুটো ছুট লাগিয়েছে। খোলা বেলাভূমি পেয়ে ইচ্ছেমত দৌড়ে বেড়াচ্ছে। সৈকত কালো না ধলো, এই মাথাব্যাথায় ফায়দা কি? তারা বরং দুহাত দু’পাশে ছড়িয়ে দৌড়ে পাখি হয়ে উড়ে যাবার চেষ্টায় মগ্ন। তবে তীর থেকে বেশ তফাতে বলে ঢেউয়ের ভয় নেই। বড়রা তপ্ত বালুতে পা ছড়িয়ে বসেছি। পাখি হয়ে আমাদের কাজ নেই। হাড়গুলো বুড়ো হয়ে যাচ্ছে, জিরোতে পারলে বাঁচি। 

ছোট্ট একটা নোটিশ বোর্ড চোখে পড়লো এক কোনায়। কৌতূহলী হয়ে উঠে গেলাম। বালু-রহস্য বোঝা গেল এতক্ষনে। আগ্নেয়গিরির জমাট বাধা লাভা আর ভেঙ্গে গড়িয়ে পড়া পাথরের কুঁচি জমে জমে এই সৈকতের সৃষ্টি। তাও ভাল, জানা গেছে। নইলে ভূতের জায়গা বলে মনে হচ্ছিল। 

প্রবাসী হবার প্যারা আছে। পড়াশোনা কি চাকরি, সবখানেই একশোর উপর একশো দশ ভাগ ঢেলে দিতে হয় নিজেকে প্রমানের চেষ্টায়। তাতে জীবনের রস কিছুটা হলেও শুকিয়ে আসে। আজকে অনেকদিন বাদে শুকিয়ে আসা প্রাণটাকে সাগরতীরে বসে ইচ্ছেমত ভিজিয়ে নিলাম। 

ডুবন্ত সূর্য পুরো বিকেলটা গিলে খেয়ে ঢেকুর তুলবে তুলবে করছে। আমাদেরও আমোদ একেবারে কম হয় নি। আরাম করে হাড় জিরিয়ে আর লাল-কমলা কতগুলো আইসক্রিম খেয়ে নবাবী কায়দায় সময় পার। তারপর জবজবে আঠালো হাতের তালুতে বাচ্চাগুলোকে আটকে নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। 


এখানকার হোটেলগুলোও যেমন। যাব্বাবাহ্! কাঁচতোলা লিমুজিন গাড়ি ঢুকছে আর বেরোচ্ছে কেবল। উঁচু দালানগুলোর গায়ে পাঁচ তারা যেন একদম ছিল ছাপ্পড় মারা। তেমনই একটা পাঁচিলঘেরা ঝাঁ চকচকে বড়লোকী হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আধা ঘন্টা লাগিয়ে অনেকগুলো ফোন খরচের পর আরেকটা লক্করঝক্কর হলুদ ট্যাক্সি জোটাতে পারলাম। তারপর ‘এই সব দামী হোটেল আসলে ভাল না, লোকে কেন যে শুধু শুধু পয়সা জলে ফেলতে আসতে’ ইত্যাদি তুচ্ছতাচ্ছিল্য কথাবার্তায় নিজেদের দৈন্যতা কোনরকম ঢাকাঢুকি দিয়ে ফিরে চললাম আমাদের দুই কি তিন তারকা সস্তা হোটেলের ডেরায়। 

সস্তা হোটেলের পেটের ভেতর রেস্তোরাঁ নেই। তবে যে যার ঘরে রেঁধে খাবার ব্যবস্থা আছে। ক্লান্তিটা বড্ড বেশি, নইলে সে চেষ্টা করে দেখা যেত। ঠিক করলাম, সবচেয়ে কাছের রেস্তোরাঁয় গিয়ে হামলে পড়বো। টেবিল-চেয়ার পর্যন্ত কামড়ে খেয়ে রেখে আসবো। একরকম একটা জ্বালাও-পোড়াও ধরনের খিদে নিয়ে বেরোলাম আবার। আমাদের হতাশ করে দিয়ে সব মিলিয়ে গোটা চারেক রেস্তোরাঁ পাওয়া গেল। লোকে গিজগিজ। তিল ধারনের জায়গা নেই। 

ইতস্তত করছি কি করবো, এমন সময়ে কোনের দিকে পুরানো চেহারার রেস্তোরা চোখে পড়লো। ভেতরটা অন্ধকার, ভিড় কেমন বোঝার উপায় নেই। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। নামফলকটা বলিহারি ঠেকলো। কাসা পেপে (Casa Pepe). অত সাধের স্প্যানিশ নামটাকে আমরা আমাদের সুবিধামত কাঁচা পেঁপে বানিয়ে নিলাম। পেপের দেখা না মিললেও সেখানে আধ কাঁচা সি ফুডের দেখা মিললো। গোল মরিচের গুড়ো ছিটিয়ে আর অলিভ অয়েলে চুবিয়ে সেগুলোকে মুখে পুরে কচরমচর চিবিয়ে ঘোরাঘুরির ইতি টানলাম সেদিনের মত। তবে তার ফাঁকে পরের দিনের ছক এঁটে নিতে ভুললাম না। (চলবে)


ছবি কৃতজ্ঞতায়ঃ আদিবা আমাথ

মিউনিখ, জার্মানি

২৪.০৭.২০২০


Wednesday, July 29, 2020

টেনেরিফের বতুতা বাহিনী-১


 
টেনেরিফে, স্পেন। 
১.
সাল ২০১৮। মিউনিখ বিমানবন্দর। থলথলে সুখী সুখী চেহারার এক মহিলা পুলিশ দ্রুত ধেয়ে আসছে। তার চেয়েও দ্রুত হেঁটে পালিয়ে যাবো, সে উপায় নেই। এখন কি মামলা ঠুকে দেয় সেটাই দেখার বিষয়। এয়ারপোর্টে সবার সামনে মান ইজ্জত ফেঁসে শেষে কিয়েক্টা অবস্থায় দাঁড়াবে, ঠোঁটে মেকি হাসি টেনে তাই ভাবছি।
‘বাচ্চাটা কি তোমাদের? ওভাবে কাঁধে নিয়েছো কেন?’

বলা মাত্র ছেলের বাবা তাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে সোজা দাঁড় করিয়ে দিল। কিন্তু ভিকটিম বাবাজী মাটিতে পা পড়ামাত্র ঈশান কোনের দিকে দিল এক ভোঁ দৌড়। সেখানে এয়ারপোর্ট পুলিশের গলফ কার্টগুলো পার্ক করা। তেমন একটা গাড়ি হাকিয়ে সে পালিয়ে যাবে, এই হল ধান্দা। এতক্ষনে পুরো ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে পুলিশ ভদ্রমহিলা তার থলথলে শরীর বিদ্যুৎবেগে উড়িয়ে নিয়ে সম্ভাব্য গাড়ি চোর বরাবর ছুট লাগালো। মুহূর্ত আগের আসামী বাবা-মা আমরা বিনা লড়াইয়ে মামলা জিতে এবার তাড়িয়ে তাড়িয়ে চোর-পুলিশ খেলে দেখতে লাগলাম। 

বেশিক্ষন মজা নেয়া গেল না। কারন, কালপ্রিট ধরা পড়ে পুলিশ আপার হাতের ফোঁকরে হাত ঝুলিয়ে পায়ে পায়ে ফিরে আসছে।

‘ছেলে তো মারাত্মক চঞ্চল। কিন্তু বকাঝকা একদম বারণ। বুঝিয়ে বলবে, কেমন? নইলে বড় হয়ে গুন্ডা টুন্ডা বনে যাবে...।’ বলেই গুন্ডা ছেলে হাতে গছিয়ে দিয়ে সে বিদায় নিল তখনকার মত। চোখের আড়ালে চলে যেতেই আবার ছেলে কাঁধে ফেলে চেক-ইনটা কোন দিকে খুঁজতে রওনা দিয়ে দিলাম। শিশুপালন বিষয়ক জ্ঞান মাথা ঝাঁকিয়ে বাম কান দিয়ে বের করে দিয়েছি। বাঙালি বাবা-মা বলে কথা।

জার্মান সময়ানুবর্তিতা মেনে প্লেন ছাড়ল ঘড়ির কাটায়। ঘন্টা পাঁচেকের মাঝারি লম্বা ভ্রমন। মিউনিখ টু টেনেরিফে। নভেম্বরের হাড় কাঁপানো শীতকে ভেংচি কেটে ইউরোপের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় পালিয়ে যাচ্ছি আফ্রিকার গা ঘেষে দাঁড়ানো স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে। টেনেরিফে তারই এক দ্বীপ। মনের ভেতর জেল ডিঙ্গানো ফেরারীর আনন্দ। ভারী জ্যাকেটগুলো খুলে ওভারহেড ব্যাংকারে পুরে আরাম করে বসলাম। 

‘উফ্, এ্যাইকক্...!’ শান্তিতে আর বসা গেল কই। পাজি ছেলেটা সামনের আসনের কারো চুল টেনে দিয়েছে। বছর ষাটেকের প্রৌঢ়া ঘাড় ঘুরাতে ঘুরাতে অপ্রস্তুত আমি বার দশেক ছেলের হয়ে স্যরি বলে ফেললাম। ভদ্রমহিলা হালকা হেসে, ‘আহা, ছেলেমানুষ, ইটস ওকে‘ বলে ফিরে বসলেন। তবে আরো তিন-চারবার চুলে টান খাবার পরে সেই একই ভদ্রমহিলা আমাদের মাতা-পুত্রকে একযোগে দৃষ্টি দিয়ে ভস্ম করে দিলেন। তারপর পাশের সিটের যাত্রীর সাথে আসন বদলে নাগালের বাইরে চলে গেলেন। বেয়ারা ছেলেটা যে কোন ফাঁকে সুযোগ কাজে লাগায়! কিন্তু যা ঘটার তা তো ঘটেই গেছে। সুতরাং, ছাই ভষ্ম ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে জানালার বাইরে নির্লিপ্ত দৃষ্টি ছুড়লাম।

২.
মেঘ কেটে নেমে যাচ্ছি। আকাশী নীলের জগত থেকে সাগর নীলে নামছি যেন। আরো নামতেই আটলান্টিকের বুক গোটা আষ্টেক বড় সড় দ্বীপ আর কিছু খুচরো দ্বীপের অবয়ব ভেসে উঠল। ছোট বড় পুঁতি মিলিয়ে গাঁথা মালার মত এক সুবিশাল দ্বীপমালা। এই সব মিলিয়েই ক্যানারি আইল্যান্ড। ভূগোলের ভাষায় তাকে আদর করে ডাকা হয় ‘আর্কিপেলাগো’ বলে। তারই একটা লালচে দ্বীপ বরাবর ছুটে চলছে আমাদের বিমান।

ক্যাপ্টেন আর বিমানবালাদের তাড়ায় পড়ে সিটবেল্ট বাঁধছি। হঠাৎ মনে হল, টেনেরিফে নিয়ে অনেক আগে কোথাও কিছু একটা পড়েছি বা ডকুমেন্টরি দেখেছি যেন। ঘটনা বা দুর্ঘটনা। হাজার স্মৃতি ঘেটেও লাভ হল না। ওদিকে প্লেন নাক নামিয়ে  মাটি ছুঁলো বলে। আর তখনি মনে পড়ল ব্যাপারটা। 

টেনেরিফে এয়ারপোর্ট, ১৯৭৭। রানওয়েতে হালকা কুয়াশা কেটে ৭৪৭ জাম্বো জেট টেক অফের জন্যে দৌড়াচ্ছে। কেউ কিচ্ছু টের পেল না যে আরেকটা ৭৪৭ উল্টো দিক থেকে নাক বরাবর ঘন্টায় দুইশ মাইল গতি নিয়ে ছুটে আসছে। শেষ মুহুর্তের কোনো চেষ্টাই কাজে এল না। স্ফুলিঙ্গ তুলে ঘটে গেল বিমান ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। মিনিটের ব্যবধানে প্রায় ছয়শ মানুষ হারিয়ে ছাই।

কাহিনী মনে পড়ার আর ভাল সময় পেল না। আমাদের রায়ান এয়ারের পলকা প্লেনটাও প্রকান্ড এক ঝাঁকি মেরে রানওয়ে ছুঁয়ে প্রায় ছেঁচড়ে যেতে থাকলো। ‘পাগলা ঘোড়া ক্ষেপেছে, চাবুক ছুড়ে মেরেছে’ অবস্থা। অস্বস্তিতে কলিজা খামচে বসে থাকলাম।   

অবশ্য মিনিট খানেক বাদেই ভয় উবে গেল। ধুলো উড়িয়ে পাগলা ঘোড়ার খুর থেমেছে। কিন্তু এ কোথায় এসে পড়েছি? চারিদিক আলোয় আলোয় ঝলসে যাচ্ছে। মিউনিখের মেঘে ঢাকা ঘোলাটে গুমোট দিন দেখে অভস্ত্য চোখে তাতানো রোদ সইছে না। পিটপিট চোখে হাতড়ে হাতড়ে বেরিয়ে আসলাম একে একে। 

৩.
ভাড়া করা গাড়িটা মসৃন হাইওয়ে ধরে দুর্বার গতিতে ছুটছে। ইচ্ছে করেই হোটেল অনেক দূরে নেয়া হয়েছে। লোকালয় থেকে দূরে থাকা যাবে। হাতুড়ি বাটালি পিটিয়ে গড়া শহরে দেখার কি আছে? রঙ বেরঙের ইটকাঠ আর সুরকি ছাড়া? তার চেয়ে পাহাড়, সাগর, খোলা আকাশ ঢের ভাল। তাছাড়া, বহুদিন শীতের দেশে থেকে খানিকটা নবাব হয়ে গিয়েছি। সামান্য গরমেই ননীর পুতুল ঘেমে গলে যাই। টেনেরিফের নভেম্বরকে রীতিমত কাঠাফাটা জুলাই বলে ভুল হচ্ছে। সাগরপাড়ে হয়ত গরমটা কম হবে।

ড্রাইভার নিজে উদ্যোগে আলাপী হয়ে কথা জুড়েছে। আমরা পথের ক্লান্তিতে কুপোকাৎ। মাঝে মাঝে হ্যাঁ-হুঁ করছি ভদ্রতার খাতিরে। আর সে বকেই চলছে। পুরো ক্যানারি আইল্যান্ড নাকি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুতপাতের ফল। আগ্নেয়গিরি এই দ্বীপমালাকে সাগর থেকে টেনে তুলেছে। বলা যায় না, কবে আবার আগ্নেয়গিরির মাথা বিগড়ে যায় আর দ্বীপগুলোকে গলন্ত লাভার স্রোতে তলিয়ে ফেলে। সবই প্রকৃতির লীলা। আসতে না আসতেই গরম লাভায় ডুবিয়ে মারার কথায় সামান্য চুপসে গেলাম। এ কেমন অভ্যর্থনা রে বাবা!

টেনেরিফে পেশাদার পর্যটন অঞ্চল। পাহাড়ি পথের দুপাশে ক্লাব আর অল-ইনক্লুসিভ রিসোর্টের ছড়াছড়ি। মোট কথা, প্রমোদ দ্বীপ। সেখানে ছাও-পাও নিয়ে গিয়ে কতখানি আমোদ করা যাবে, ভেবে কপালে তিন-চারটে ভাঁজ পড়লো।   

প্রায় এক ঘন্টা পর হোটেলে পৌঁছে অবশ্য মুচকি হাসি ফুটলো। সামনেই উথাল পাথাল ঢেউ আছড়ে পড়েছে সৈকতে। জায়গাটা কোলাহল থেকে বহু দূরে। আমোদ-প্রমোদের মত চটুল শব্দগুলো ঢেউয়ের ঝাপটায় কই যে ভেসে চলে গেলো, হদিসই পেলাম না। তাজা নোনা বাতাস নিমিষেই ক্লান্তি ঘুঁচিয়ে কর্পূরের মত উড়িয়ে দিল। দীর্ঘ যাত্রার শেষে শুরু হল আসল ভ্রমন। (চলবে)

ছবি কৃতজ্ঞতায়ঃ আদিবা আমাথ

মিউনিখ, জার্মানি
২০.০৭.২০২০
  
টেনেরিফের স্বচ্ছ আকাশ।


Saturday, July 4, 2020

সাইকেল আউর আওরাত


লাল বাতিতে দাঁড়িয়ে আছি। পেছন থেকে জড়ানো গলায় হাঁক আসলো, ‘সাইকেল নিয়ে কই যাও?’ ফিরে দেখি, মহল্লার পরিচিত মাতালচলতে ফিরতে সামান্য হাই-হ্যালোর মত আলাপ কি ভেবে এক গাল হাসি হেসে সাইকেল ঘুরিয়ে আনলাম তার কাছে। বাস স্টপের বেঞ্চিটায় হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে ভদ্রমহিলা চোখে মুখে এই সাত সকালে গাঢ় মেকাপ। কড়া লিপস্টিকে বয়সটা ষাট থেকে ধাক্কায় পঞ্চাশে এমে এসেছে। পরিপাটি ববকাট চুল আর লম্বা ঝুলের ফুলেল স্কার্টের সাথে একেবারেই বেমানান ভঙ্গিতে পায়ের কাছে অ্যাবস্যুলুট ভদকার স্বচ্ছ একটা বোতল অলস গড়াগড়িতে ব্যস্ত। দৃশ্যটা বলেই দিচ্ছে, আর দশজনের মত বাস ধরার তাড়া নেই বোতল মালিকের। বেঞ্চিতে সে আজকে একাই বসে। অন্য সময় সহ-মাতাল হিসেবে দু’চার জনকে পাশে ঝিমোতে দেখা যায়। এক সাথে চোঁ চোঁ টেনে চুর চুর হয়ে পড়ে না থাকলে মজা কোথায়।

‘তা, তোমার লোকজন কই?’। ভকভকে ধোঁয়া ছেড়ে সে জবাব দিল, ‘নাস্তা আর মালপাতি কিনতে গেছে’ এবার কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলাম, ‘ধোঁয়াটা বড্ড বেশি সাদা। কি টানছো, বলো তো?’ নির্লিপ্ত উত্তর এলো, ‘এই ঘাসপাতা আর কি’। মানে গাঁজার পুড়িয়া টুড়িয়া জাতীয় কিছু হবে আর নাক না গলিয়ে ‘আচ্ছা, খাও মজাসে, আসি এখন’ বলে চলেই যাচ্ছিলাম।

আবার ডাক পড়লো, ‘হেই, হেই, হঠাৎ সাইকেল কেন বললে না যে? মিউনিখের বাস-ট্রেনে কি ঠাডা-গজব পড়েছে?কথার ধরনে হাসি চেপে বললাম, ‘গজবই তো। করোনা গজব। আপিশ যেতে ভিড় এড়াতে সাইকেল নিয়ে বেড়িয়েছি। আজকেই প্রথমখাস দিলে দোয়া করে দাও তো’ দোয়ার বদলে করোনা ভাইরাসের বাবার উদ্দেশ্যে দাঁত খিঁচে সে এমন কতগুলো গা হিম করা গালি দিল যে কলিজায় রীতিমত কাঁপন ধরে গেল। অবশ্য পর মুহূর্তেই চমৎকার সহজ গলায় আশীর্বাদ করে বলল, ‘আস্তে ধীরে চালিয়ো, মেয়ে লোকে গালি দিলে দিক। ট্রামের নিচে পড়লে কিন্তু নিমিষেই চার টুকরো আর মাথা থেঁতলে গেলে তো আরো বিশ্রী কান্ডঘিলু-মিলু ছড়িয়ে একাকার, ছ্যাহ্ ছোহ্...‘

আশীর্বাদের বহর আর সেটা বলার বাহার দেখে মেরুদন্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। ‘হেঁ হেঁ, তা আর বলতে...।‘ ভাঙ্গা একটা দেঁতো হাসি আড়ালে চরম গ্রাফিক আশীর্বাদটা কপাৎ করে গিলে নিলাম। এমন শুভাকাংক্ষী আর হয় না। নার্ভাস ভঙ্গীতে আবার গিয়ে দাঁড়ালাম সিগনালে।

.
মাতালদের অন্তর্দৃষ্টি দারুন প্রখর। নইলে কি করে বললো যে লোকে গালি দেবে? এই মাত্র একজন ‘চল্, ফোট্’ বলেছে। অপমান লাগার কথা। কিন্তু লাগছে না। খানিক আগেও দুই বার গালি শুনতে হয়েছে। একবার মোড়ের সিগনালে। আরেকবার ট্রামের সামনে লাল বাতিতে। বাতি সবুজ হতেই চট্ করে প্যাডেল মেরে রওনা দিতে পারি নি। সাইকেল লগবগিয়ে এদিক সেদিক এঁকেবঁকে কাত হয়ে পড়ার যোগাড়। আর তাতেই বাকি সাইকেলওয়ালা মাইকেলরা সব রেগে টং। মাঝবয়সী এক লোক বলেছে, ‘আরে ভ্যাট! আগে বাড়তে পারে না আবার সাইকেল চালায়!’ আরেক জন গজগজিয়ে উঠেছে, ‘এ্যাই তুমি আন্ধা না লুলা?’ তারপর কিছু বুঝে ওথার আগেই সাইকেলের চাকায় ঠ্যাং দিয়ে ল্যাং মেরে ফসফসিয়ে পগাড় পার।

এ শহরের লোকজন যে এতটাই দুর্ধর্ষ, কে জানতো? এমনিতে গাড়ি চালক হিসেবে মিউনিখের লোকেদের বেশ বদনাম আছে। কারো পান থেকে চুন খসলেই এরা মিছেমিছি হর্ন চেপে ভয় দেখিয়ে মজা পায় নতুন লাইসেন্স পাওয়া নবীশ পেলে তো আরো মজা। আঙ্গুল উঁচিয়ে গালির বন্যা বইয়ে দেয় তর্জনী, মধম্যা কিছুই বাদ যায় না। ভালমানুষ চেহারার সাইকেলম্যানরাও যে একই দলের, এই সত্য জেনে কিছুটা মিইয়ে গেলাম।

মাঝপথে এসে ফিরে যাবার মানে হয় না। তাছাড়া অফিস তো যেতেই হবে। তবে সব খারাপেরই ভাল দিক আছে। খানিক আগেও হালকা তিরতিরে বাতাসে চিন্তার ঘুড়ি এদিক সেদিক হারিয়ে যাচ্ছিল। এখন সব মনোযোগ পিচ ঢালা রাস্তার সরল রেখা ধরে চলছে। এও মন্দ কি। বেরিয়েছিলাম দুরুদুরু বুকে টিকটিকি হয়ে। এখন বিশ মিনিটের মাথায় টক-ঝাল গাল-টাল খেয়ে মোটা চামড়ার কুমির বনে গেছি। কথাটা ভাবতেই লেজ দাবড়ে এঁকেবেঁকে সরসরিয়ে চলতে থাকলাম সরু পথটা ধরে।

ঘাম ছুটে গিয়েছে দেখে অল্প থেমে জ্যাকেট খুলে কাঁধের ছোট্ট ঝোলায় পুরে নিয়েছিসূতীর লাল টকটকে ফতুয়াটা সকালের নরম রোদে ঝিকিয়ে কমলা দেখাচ্ছে। নিজেকে আগুনের গোলা মনে হচ্ছে হঠাৎআবার কেউ গাল দিতে আসলে এবার আগুন লাগিয়ে দেবো। অনেক হয়েছে তোমাদের দাদাগিরি!

কিন্তু এক ফুঁয়ে আগুনের গোলা নিভিয়ে ফেলতে হলো। চোখে পড়লো, চৌরাস্তার মোড়ে খাম্বার কাছে চাকা তোবড়ানো একটা নীল সাইকেল ঠেস দিয়ে রাখা। তাতে ফটোফ্রেমের মত কি যেন ঝুলছে। পাশ কাটিয়ে যাবার সময়ে পুরোটা পড়া গেলবড় বড় হরফে লেখা ‘প্রিয় অ্যালেক্স, না বলেই চলে গেলে।  ওপারে ভাল থেকো। তোমার জন্যে প্রতিদিন তাজা ফুল।‘ তাকিয়ে দেখি সাইকেলের পায়ের কাছে এক গুচ্ছ লাল-সাদা গোলাপ। বুঝি বা এই মাত্র কেউ রেখে গেছে। কে জানে কোন দুর্ঘটনায় অ্যালেক্স মিয়ার ইহলৌকিক কম্ম সব কাবার হয়ে গিয়েছে। অজানা আতংকে ঘেমো হাতে সাইকেলের হাতলটা আরো শক্ত করে ধরলাম। চার কিলোমিটারের পথকে এখন চল্লিশ মাইল লাগছে। কি ফ্যাচাঙেই যে পড়া গেল আজকে।
৩.
সামান্য দুই চাকার সাইকেল চালাতে পারে না, এমন বলদ লোক এই শহরে নেই বললেই চলে। দুর্ভাগ্য, আমি সেই সংখ্যালঘুদের একজন। সেই বছর দুয়েক আগে অতি কষ্টে খুঁজে পেতে একটা কোর্সে ঢুকেছিলাম চার দিন প্যাডেল মারা শিখিয়ে আশি ইউরো কেড়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। আমিও ঘরে ফিরে যা যা শেখা হয়েছিল, সব ইচ্ছে করে মাথা ঝাঁকিয়ে ভুলে গেলাম। তারও এক বছর পর একরকম অনিচ্ছায় এ দোকান সে দোকানে ধর্না দিয়ে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড মাল জুটিয়ে ফেললাম এখানেই শেষ না। আলসেমির কুখ্যাতিটা আরো একবার সত্যি প্রমান করে বছর ঘুরিয়ে সাইকেলটা বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রেখে ছয় ইঞ্চি ধূলোর পরত ফেলে নিষ্ঠুর আত্মতৃপ্তি পেলাম যেন সাইকেল অধ্যায়ের ইতি প্রায় এক রকম ঘটেই গিয়েছিল।

তাই ভাবছি, কোনো রকম টেস্ট ট্রায়াল ছাড়াই আজকে এমন ফটাৎ করে রাস্তায় নেমে যাওয়া কি ঠিক হল। করোনার এমন দুর্দিনে বাস-ট্রেনের ভিড়-ভাড়াক্কা আর হাঁচি-কাশির ছোঁয়াচ এড়ানো যাচ্ছে বটে কিন্তু অ্যালেক্স ভাইয়ের মত বেখেয়ালে একটা অঘটন ঘটলে তখন কি হবে? হঠাৎ সম্বিত কেড়ে কে যেন পেছন থেকে বলে উঠলো, ‘গো, গো, গো। থেমে গেলেই চিৎপটাং।‘ বুঝে ওঠার আগেই লোকটা দারুন গতিতে ওভারটেক করে উধাও হয়ে গেল। সে লোক মিলিয়ে গেলেও কথাটা মাথায় ঘুরতেই থাকলো, ‘থেমে গেলেই চিৎপটাং’।  আগেও কোথায় যেন শুনেছি। আইনস্টাইন বা তেমন তাবড় কেউ বলেছিলেন। ‘জীবন আর সাইকেল একই রকম। তাল রাখতে ছুটে চলার বিকল্প নেই।‘ নইলে নাকি পপাৎ ধরনীতল।

কিন্তু আইনস্টাইন তো ওভার অ্যাচিভার টাইপ লোক ছিল। জীবন নিয়ে অমন উচ্চাশা টুচ্চাশা কিচ্ছু নেই আমার। নিতান্তই এলেবেলে ম্যাংগো পাবলিক। নাহ্, পা দু’টো টনটনিয়ে উঠছে। রাস্তাটা সামান্য ঢালু হতেই আইনস্টাইনের অমৃত বাণীর নিকুচি করে প্যাডেল ঘোরানোতে আলাব্বু দিলাম। সাইকেল দেখি আপনা আপনি বাতাসে শিস্ তুলে দুপেয়ে পংক্ষীরাজ হয়ে ছুটে চলছে। আইন্সটাইনের কথায় আসলে গলদ আছে। জীবনের সাইকেল শুধু গাধার মত চালিয়ে গেলেই হবে না। মাঝে মাঝে সুযোগ খুঁজে খানিকটা জিরিয়ে নিতে হয় এত ইঁদুর দৌড়ের আছেটা কি? তাছাড়া, কোথায় আইন্সটাইন আর আমি কোথাকার কোন আইন-গাইন-ফা-কাফ-ক্বাফ। বড় মানুষের বড় কথা ছোট মানুষের ছোট জীবনে খাটে না সব সময়।

৪.   
রাস্তাটা গাছের ছায়ায় ছাওয়া। সবুজ পাতার ফোকর গলে রোদ হানা দিয়ে চোখ অন্ধ করে দিতে চাইছে যেন। হুশিয়ার হয়ে চাকা ঘোরাচ্ছি। ফুটপাতের সমান্তরালে মসৃন পথ। সাইকেল ছাড়া আর কিছুর চলা নিষেধ। গাড়ি ঘোড়ার সাধ্যি নেই গাছের বেড়া ডিঙ্গিয়ে হামলে পড়ে সামনে। নিরিবিলি পথটায় উঠে এসে বেশ নির্ভয় লাগছে। ঢং ঢং শব্দ ভেসে আসছে পুরানো গির্জার চূড়া থেকে। চিরকালের খা খা করা চার্চটার সামনে আজকে দেখি ফুলের তোড়া আর মোমবাতির ভিড়। মহামারীর অদ্ভুতুড়ে পৃথিবীতে ভরসার জায়গা হারিয়ে লোকে আবার শিকড়ে ফিরে আসছে।

গির্জার পাশে সারি সারি পুরানো দালান। মিউনিখ শহরটা বেশ পুরানো। দারুন একটা বনেদী ভাব আছে সেকেলে ইট কাঠের চেহারায়। লাল টালির গায়ে গায়ে জোড়া লাগানো কাঠামোতে খাঁটি ইউরোপীয় ট্রেডমার্ক আভিজাত্য। গোঁড়া ক্যাথলিক ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে অনেক দালানের খাঁজে আবার সাধু সন্তদের মূর্তি সাজানো। সেগুলোর কোনোটা সযত্নে ধাতব তারের জাল দিয়ে ঘিরে রাখা। কিন্তু কোনোভাবে একটা সাধু বাবাও যদি হুরুমুড়িয়ে ঘাড়ে পড়ে, তাহলে আর রক্ষা নেই। সাথে সাথে ভবলীলা সাঙ্গ করে স্বর্গপানে রওনা দিতে হবে। সাধু বাবাদের থেকে বেশ খানিকটা তফাতে চলছি দেখে নিশ্চিন্ত লাগছে।

সময়টা বেশ নিরুপদ্রুবই কাটছিল। নতুন এক উপদ্রুব উদয় হল। উল্টো দিক থেকে বাঁই বাঁই শাঁই শাঁই সাইকেল আসছে। তবে আসল উপদ্রুব দ্বি চক্রযানগুলো না। বরং তার সওয়ারী। তাদের আঁটোশাঁটো টিশার্টের ভেতর থেকে সিক্স প্যাক তেড়ে ফুড়ে বেরোচ্ছে আর তাতেই এই নবীশের সাইকেলের হ্যান্ডেল বিগড়ে যাচ্ছে। প্রতি ছয় জনের পাঁচ জনেরই সিক্স প্যাক থাকলে এই জার্মান দেশে সব মিলিয়ে এমন কত লক্ষ গ্রীক দেবতা আছে, ভাবতেই মাথা চক্কর দিয়ে উঠল।

শুধু কি তাই? ভাল করে ফুটপাথ বরাবর তাকিয়ে দেখি, লোকজন সেখানে উসাই বোল্টের বেগে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। পুরুষেরা যেমন সুঠাম, নারীরা তেমনি সুগঠিত, সুললিত। বিন্দু বিন্দু ঘামে সামর্থ্য আর সৌন্দর্য্য মিশে একাকার। শহরের সব ভাস্কর্যগুলো কি আজকে আড়মোড়া ভেঙ্গে পথে নেমে আসলো? আর একটা দেশের গড়পড়তা সবার শরীর সৈনিকের মত পেটানো হলে হাজার ঝড়-ঝঞ্জা আসলেও সামলে নেবার ক্ষমতা আপনা থেকেই তৈরি হয়। তাই বুঝি করোনাযুদ্ধটা সবাই মিলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে জিতে নিল এবার।  

মোড়ের কাছে এসে পথ বেঁকে গেছে। এবার পার্কের কোল ঘেঁষে যেতে হবে। এই পথ জনশূন্য। কতগুলো বেরসিক হোৎকা দাঁড়কাক কর্কশ ডেকে চলছে, ‘ক্রা ক্রা...’। একেবারে লোক নেই বললে ভুল হবে। অল্পবয়সী মায়েরা বাচ্চাদের সকালের রোদ খাওয়াতে স্ট্রলার নিয়ে বেরিয়েছে। পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে তেমনি এক রোদখেকোকে আড়চোখে হালকা ভেঙচি কেটে দুষ্ট হাসলাম মিটমিটিয়ে। বেচারা দুষ্টুমিটা ঠিক ধরতে পারলো না। তার বদলে এমন চিল চিৎকার জুড়ে দিল যে কাকগুলো ডানা ঝাপটিয়ে হুটপুটিয়ে পালালো। বাচ্চাকে কোন বেয়াদপ ভয় দেখিয়েছে, তাকে খুঁজতে মাকে চারপাশটা দ্রুত স্ক্যান করতে দেখা গেল। জোরসে প্যাডেল মেরে কালপ্রিট আমি ফুড়ুৎ করে উড়ে গেলাম। ছোট শিশুর মায়ের হাতে কিল খেলে আজকে সাইকেল চালানো বীরত্ব ঠুশ্ করে ফুটে যাবে।    

৫.
সব পথেরই শেষ আছে-এই আপ্তবাক্য প্রমান করে ম্যাক্স ওয়েবার প্লাৎজ-এর ক্যাম্পাসটা ভেসে উঠলো চোখের সামনে। ছোট্ট একটা মুশকিল। নিরিবিলি রাস্তাটা ফুরিয়ে গিয়ে গাড়িঘোড়ার ব্যস্তসমস্ত রাজপথে গিয়ে পড়েছে। জোরে একটা দম নিয়ে নেমে পড়লাম। সাথে সাথেই আলাদিনের দৈত্য আকারের এক লরি ‘প্যাঁওও...’ করে ভেঁপু বাজিয়ে কান ঘেঁষে চলে গেল। এক মুহূর্তের জন্যে জমে কাঠ হয়ে গেলাম। জার্মান ‘মান’ কম্পানির সুবিশাল এই লরিগুলো সেই রকম মরদ এক একটা। তার পাশে লিকলিকে আওরাত আমি তেমনি তুচ্ছ আর ক্ষুদ্র। এই ক্ষুদ্র, ভীতু, ক্যাবলাকান্ত আমিই যে গরিয়ে গড়িয়ে কিভাবে চলে এসেছি সেকেন্ডহ্যান্ড সাইকেলে সওয়ার হয়ে, সে-ই এক বিস্ময়। বিচিত্র একটা হাসি ফুটিয়ে অজান্তেই নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিলাম।

দিন যে কোথা দিয়ে উড়ে গেল হাজারটা কাজে কর্মে, খেয়ালই ছিল না। ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে মনের ভুলে পাতাল রেলের স্টেশন বরাবর পা চালিয়েই আবার ঘুরে দাঁড়ালাম। ছাউনিতে সাইকেলটা ঠায়ে দাঁড়িয়ে। কালো ধাতব শরীরটাকে এক পলকের জন্যে কালো পশমে ঢাকা টগবগে ঘোড়া বলে ভুল হল যেন। আহ্, নিজের একটা বাহন! আনন্দটাই অন্য রকম। এক লাফে উঠে বসলাম কালো ঘোড়ার পিঠে। পিচ ঢালা মেঘ কেটে প্রায় উড়ে চললাম ফিরতি পথে। দুই চাকায় ভর দিয়ে নতুন এক স্বাধীনতার টিকেট কিনলাম যেন আজকে।

কখন যে বাড়ির কাছে পৌঁছে গেছি, খেয়ালই হয় নি। উদগ্রীব একটা কন্ঠ ডাক দিয়ে থামালো হঠাৎ, ‘সব ঠিক ছিল তো?’। তাকিয়ে দেখি সকালের সেই পাড়াতুতো মাতাল ভদ্রমহিলা। ঘোর লাগা লাল টকটকে রক্তজবা চোখ আগ্রহে চকচক করছে। অন্য সময় হলে হয়তো দূড় থেকে হাত নেড়েই এড়িয়ে যেতাম। বেসামাল অবস্থা বলে কথা। কিন্তু এখন দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট এসে ভর করেছে কাঁধে। খুব উৎসাহে এগিয়ে গেলাম, ‘হ্যাঁ ঠিক তো ঠিক, একেবারে ঠিকের বাপ ছিল‘। তবুও সন্দিগ্ধ প্রশ্ন শোনা গেল, ‘ঘিলু-টিলু বেরিয়ে যায় নি বলছো তাহলে?’।

প্রমান দিতে এক ঝটকায় হেলমেট খুলে ফেললাম। তারপর মাথা হাতড়ে চুঁইয়ে পড়া ঘিলুর সন্ধান না পেয়ে ফিক্ করে হেসে জানালাম, ‘না, খুলির ভেতরেই সব আছে দেখছি’। উত্তরে পাড়াতুতো পাড় মাতাল ফোশ্ করে হাঁপ ছেড়ে হাতের বোতলটা দেখিয়ে বলে বসলো, ‘জানো, তোমার চিন্তায় বাড়তি এই বোতলটা শেষ করেছি। খালি ভেবেছি হাবাগোবা বিদেশী মেয়েটা জ্যান্ত ফিরতে পারবে তো। ভালোয় ভালোয় এসেছো। এখন এই খুশিতে আরেকবার হয়ে যাক।‘ তাকে ব্যস্ত ভঙ্গিতে হাতের পুটলি থেকে সবুজ আরেকটা মাল বার করতে দেখা গেল।      

বিচিত্র পৃথিবীর মমতার ধরনগুলোও বিচিত্র। পড়ন্ত বিকালে উষ্ণ মায়ার রেশ নিয়ে ফুটপাঠ ধরে হাঁটতে থাকলাম। বোকাসোকা বিদেশী মেয়েটা আর তার হাতে ধরা সাইকেলের ছায়াটা আস্তে আস্তে বড় হতে থাকলো যেন। কোথায় যেন কোন সবুজ বোতলের ছিপি গড়িয়ে পড়লো টুংটাং শব্দে।

মিউনিখ, জার্মানি
২৮.০৬.২০২০