Friday, January 15, 2021

পর্তুগালের অলিগলি:৫


১১.
‘এ্যাঁ, হ্যালো, হ্যালো...’। অল্প বয়সী ট্যুর গাইড ছেলেটা মাইক্রোফোন হাতে নড়েচড়ে বসেছে। এতক্ষনে তার অস্তিত্ব জানা গেল। ‘আমরা প্রায় চলে এসেছি। আর মাত্র মিনিট পনেরো। এই ফাঁকে লিসবনের টুকটাক ইতিহাস জেনে ফেললে কেমন হয়? বাই দ্যা ওয়ে, আমার নাম পেদ্রো’ পুরো রাস্তায় কোনো খবর নেই, আর এই দশ-পনেরো মিনিটে সে আমাদের পুরো লিসবনের ইতিহাস গিলিয়ে দেবে, হুঁহ্।
 
পেদ্রোকে দু’পয়সা পাত্তা না দিয়ে ঠিক আগের মতই গল্প-আড্ডায় বাস কাঁপাতে লাগলাম আমরা তাছাড়া, মাত্রই ভিভার কাছ থেকে ‘সাফল্যের সহজ পাঁচ তরিকা’ জাতীয় ক্যারিয়ার টিপস্ নেয়া শুরু করেছিলাম। তার বদলে পর্তুগালের অতীত কেচ্ছা-কাহিনী শোনার তেমন খায়েশ নেই আপাতত। ছেলেটা কিন্তু একটুও দমে না গিয়ে তার গাইডগিরি শুরু করে দিল। 
 
‘লিসবন তখন ঐশ্বর্য আর ক্ষমতায় লন্ডন-প্যারিসের কাতারে হবেই বা না কেন। ব্রাজিলে কলোনির সুবাদে সেখানকার সোনার খনির মালিকনার বদৌলতে পর্তুগীজ সাম্রাজ্য পেট মোটা সোনার কুমির সেই সময়ের কথা বলছি। সালটা ১৭৫৫।‘ পেদ্রোর অতি চতুর ধরনের কথাবার্তা বিরক্তিকর ঠেকছে। তবুও শুনছি আর কি।
 
‘পয়লা নভেম্বর। চমৎকার, রোদেলা এক শীতের সকাল। শহর জুড়ে সাজ সাজ রব। কি যেন একটা ধর্মীয় উৎসব সেদিন ওহ্, ‘অল সেইন্টস ডে’। মানে হ্যালোইনের পরের দিনটা আর কি’। মনে পড়ার ভঙ্গিতে বললো পেদ্রো। ‘বেশুমার মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে ঘরে-বাইরে আর গির্জায়। অলিগলি, রাজপথে ছেলে-বুড়োর হল্লায় টেকা দায়। ঠিক এমন সময়ে ঘটলো অদ্ভূত ঘটনা। পায়ের নিচের মাটি দুলে উঠলো আচমকাই। প্রবল ভূমিকম্প। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই গির্জার ঘন্টাগুলো আপনা থেকেই বেজে উঠলো, ঢংঢং ঢংঢং। লাল টালির বাড়িগুলোর দেয়ালে চিড়চিড় শব্দে ফাটল ধরতে লাগলো। ইট-কাঠ খসে খসে পড়লো লোকের মাথায় জ্বালিয়ে রাখা মোমবাতি-মশাল উল্টে পড়ে আগুন ধরিয়ে দিল মুহূর্তেই আতঙ্ক আর আর্ত চিৎকারে নরক নেমে এল শহরজুড়ে
 
গল্পে ডিজাস্টার মুভির এ্যাপোক্যালিপ্টিক ঘ্রান পেয়ে সবাই সোজা হয়ে বসেছি। খেয়াল করে পেদ্রো মুচকি হাসলো। সে বলেই চললো, ‘কেউ জানলো না যে লিসবনের কাছেই আটলান্টিকের গভীরে অজগরের মত ঘাপটি মেরে আছে এক ফল্ট লাইন। যেখানে মিশেছে বিশাল দু’টো টেকটোনিক প্লেট। সেদিন ঘড়ি ধরে সকাল সাড়ে নয়টায় প্লেট দু’টোর একটা আরেকটার উপর উঠে গিয়েছে। সুতরাং, লিসবনবাসীর দুঃস্বপ্ন সবে তো শুরু।‘
 
‘লোকজন দিগ্বিদিক ছুটতে ছুটতে টাগোস নদীর বন্দরে এসে ভিড় জমিয়েছেশান্ত টাগোসের তীরেই লিসবনের গড়ে ওঠা। আজকে এই নদী পেরোলেই বুঝি শহর ছেড়ে পালানো যাবে। কিন্তু শান্ত নদী থেকে ধেয়ে এল চল্লিশ ফিট উঁচু এক সুনামিমুহূর্তেই হাঁ করে গিলে নিল মানুষগুলোকে। তারপর মাটি কামড়ে ছেঁচড়ে ঘেঁষটে নিয়ে গেল সামনে আর যা কিছু পেল। দালানোকোঠা কাগজের নৌকা হয়ে ঢেউয়ের মাথায় ভাসতে লাগলোতাতে যাত্রী হল হাজারো লাশ। সুনামির ঢেউ নেমে গেলে আগুন আরো তাতিয়ে উঠলোপাঁচ দিন ধরে জ্বললো সে আগুন। তাপমাত্রা ছাড়িয়ে গেল হাজার ডিগ্রি। বাঁচার আর কোনো উপায়ই থাকলো না। জমকালো লিসবন রাতারাতি পাল্টে গেল গনগনে চারকোল আর কঙ্গালের অঙ্গারে ঝলসানো বীভৎস এক নরক কুন্ডলীতে’।
 
নরক কুন্ডলীর ধোঁয়ার ঝাঁজ যেন আমাদের নাকেও ঠেকলো মনের ভুলেই খক্খক্ কেশে উঠলাম কয়েকজন এদিকে, আলতো ঝাঁকি তুলে বাস এসে থেমেছে লিসবন সিটি সেন্টারে। পেদ্রো রাজপথের ভিড়ভাট্টা দেখিয়ে তার গল্পের ইতি টানলো, ‘কে বলবে ইউরোপের ইতিহাসে ভয়ংকরতম ভূমিকম্পের সাক্ষী এই লিসবন। এক ধাক্কায় ত্রিশ-চল্লিশহাজার মানুষ ভ্যানিশড ইনটু থিন এয়ার। ভাবা যায়?’
 
বাস থেকে নামতে গিয়ে হাত-পাগুলো ঝেড়ে নিলাম ভাল করে। এতক্ষনের নট নড়ন-চড়নে সেগুলোও চারকোলের মত শক্ত হয়ে গিয়েছে
 
১২.
পেদ্রো আমাদের হাতে দুইটা অপশন দিয়েছেশপিং অথবা ঘুরে ফিরে শহর দেখা। ইতস্তত করছি কি করবো, আর তার মাঝেই ছোকরাটা প্রায় সব্বাইকে নিয়ে লিসবনের হাই-এন্ড ফ্যাশন স্ট্রিটগুলো যেদিকে আছে, সেদিকে পা চালালো বাকি রইলাম হাতে গোনা কজন। সে কজনেরও কেউ কেউ দ্রুত হেঁটে এদিক ওদিক সটকে পড়লো নিজের মত ঘুরবে বলে এবার ডানে-বামে দাঁড়িয়ে শুধু ভিভা লামা আর মরিশিওমরিশিওর মত আমুদে লোক বাকিদের সাথে গেল না দেখে অবাকই হলাম একটু।
 
‘শপিং, না কচু! জামা-জুতোর গুষ্ঠি কিলাই। চলো, এগোই’ কারনটা বুঝলাম এবার। ভিভা আর আমি নিঃশব্দে তার পিছু নিলাম। ভিভা তার হাত ব্যাগটা খুব করে বগলে চেপে ধরেছে। আমিও কাঁধের ব্যাগটা ঘুরিয়ে সামনে নিয়ে এসেছি। অবশ্য মরিশিওর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। অথচ, পেদ্রো বিদায় নেবার আগে পঁইপঁই করে সাবধান করেছে। ‘হঠাৎ দেখবে সুশ্রী দেখতে কোনো তরুন বা তরুনী এসে রাস্তা কি দোকানের হদিস জানতে চাইবে যেই না হাতের ইশারায় দেখাতে যাবে, অমনি পেছন থেকে তার স্যাঙ্গাৎ তোমার ফোন-মানিব্যাগ-ক্যামেরা সরিয়ে চম্পট। মনে রেখো, লিসবন কিন্তু পকেটমারদের স্বর্গ 
 
কিন্তু তেনাদের দেখা আর মিললো কই। বেশ নির্বিঘ্নেই ঘুরে বেড়াচ্ছি। এর ভেতর অ্যান্টি-শপিং মরিশিওর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ভিভা এক বাক্স মামুলি টাইপ কাঁচের থালাবাটি কিনে ফেলেছে। এখন তার চোখ সুগন্ধী সাবান আর কাঁটাচামচের সেটের দিকে। পর্তুগীজ সাবান নাকি ফরাসী পারফিউমের সাথে ডুয়েল লড়তে পারে অনায়াসেআর পর্তুগালের কাটলারি শিল্পও নাকি জগদ্বিখ্যাত ছিল এককালেসেই নমুনা মিশিগান অবধি বয়ে না নিলেই নয়।
 
অ্যান্টিক চেহারার একটা ঘষামাজা চেহারার ছুরি তুলে পরখ করে দেখলাম। বাবা রে, হাতুড়ির মত ভারী আর বাটালির মত ভোতা এক টুকরো পনিরও কাটা যাবে কিনা সন্দেহ। মরিশিওর সাথে একটা চোখাচোখি হয়ে গেল। ভিভা এখন কাটলারি সেট কিনলে সেটা তাকে কিংবা আমাকেই আলগাতে হবে।
 
খানিক পরে দেখা গেল মরিশিও আর আমি মুখ ভচকে বেজার হাঁটছি পাশাপাশি। তার কোলে কাঁটাচামচের বাক্স আর আমার হাতে সুগন্ধী সাবানের বিরাট প্যাকেট। আর আগে আগে চলছে আমাদের বস। কাঁচের ঘটিবাটি হাতে ভিভা লামা।
 
সবারই যখন হাত জোড়া, ঠিক সেই মোক্ষম সময়ে আকাশ থেকে নেমে এলো ছোট্ট একটা পরীসাদা লেইসের ঝুল ফ্রকে মেয়েটাকে আসলেই ফুটফুটে পরীর মত লাগছে। এগিয়ে এসে হাসিমুখে বললো, ‘হাই, এদিকটায় কোথাও কফিশপ দেখেছো তোমরা? কিংবা স্টারবাকস্ কি ম্যাকডোনাল্ডস?। সাথে সাথে মরিশিও কাটলারির বাক্সটা আমার আরেক হাতে ধরিয়ে দিয়ে লেগে গেল কফিশপের খোঁজ দিতে। পরীর কফির তেষ্টা পেয়েছে বলে কথা!
 
পেদ্রোর হুশিয়ারি মনে পড়ে গেল হঠাৎ। কনুই দিয়ে একটা ইশারার গুঁতো দিতে চাইলাম। মরিশিও ততক্ষনে মেয়েটার সাথে দুই পা এগিয়ে গলির মাঝে। কোত্থেকে এক ঢ্যাঙা ভূত উদয় হয়েছে মরিশিও ঠিক পেছনে। লম্বা ছেলেটা দু’আঙ্গুল বাড়িয়ে যেই না ব্যাগ ছুঁয়েছে, অমনি খ্যাক্ করে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘এ্যাইইইইহ্! হচ্ছেটা কি? পুলিশ ডাকবো কিন্তু!’
 
পুলিশ ওঝার নাম নেয়ার সাথে সাথে ঢ্যাঙা ভূত এক লাফে তার সাদা পরীকে নিয়ে ভিড় ঠেলে মিলিয়ে গেল ভোজবাজির মত। লিসবন দেখছি ছিঁচকেচোরের রাজ্য। যাহোক, আপদ বিদায় দিয়ে ভিভা আর আমি হাঁপ ছাড়লাম। খালি মরিশিওকে কিছুটা মন মরা দেখাচ্ছে পরী উড়ে যাওয়ায়
 
বাক্স-পেটরা নিয়ে লিসবনের উঁচু-নিচু অলিগলি ডিঙ্গোতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এক দফা কফি-কেকের বিরতি নিয়ে বাকিটা সময় উড়িয়ে দিলাম গাছতলার বেঞ্চিগুলোতে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে। ফিরে গিয়ে বাস ধরার তাড়া আছে। নইলে ঝিরিঝিরি বাতাসে বেকার বসে থাকতে বেশ লাগছিল। এই তো আর কিছুক্ষন, তারপরই পর্তুগাল অধ্যায়ের শেষ। পৃথিবীটা আসলে একটা বিরাট বই। আর একেকটা দেশ যেন তার একেকটা পাতা। ইশ্, পাতার পর পাতা উল্টিয়ে যদি পুরো বইটা পড়ে নেয়া যেত এক বসায়, কি দুর্দান্তই না হতো!
 
চোখ ভরে আরেকবার দেখতে দেখতে ফিরতি পথ ধরলাম। ঠিক তখনি আরো একটা দৃশ্য চোখে আটকে গেল। দারুন হ্যান্ডসাম এক তরুন এসে দাঁড়িয়েছে মাঝবয়সী ভদ্রমহিলার সামনে। ছেলেটাকে বিপন্ন স্বরে বলতে শুনলাম, ‘স্টেশনটা কোনদিকে বলতে পারেন? বাস-ট্রাম যাহোক কিছু ধরতে হবে। খুব তাড়া আমার।‘ বিচলিত ভদ্রমহিলা হাতের ইশারায় রাস্তা বাতলানো শুরু করলেন। আরেকটা হাত সাফাইয়ের কেস ঘটতে যাচ্ছে বোধহয়। কিন্তু পকেটমারির মত স্বাধীন ব্যবসায় বাধা দেবার আমরা কে? তাছাড়া, পকেটটা যখন নিজের না তাই এক গাল নির্বিকার হেসে মহানন্দে রাস্তা মাপলাম। (সমাপ্ত) 

ছবি, অন্তর্জাল

পর্তুগালের অলিগলি: ৪

                                 

৯.
খুবসে এক দফা পেটপুর্তি ডিনার সেরে মেজাজ বেশ ফুরফুরে। এদের উর্দিপরা ওয়েটার ছুটোছুটি করে যে খাওয়ানো খাইয়েছে। তবে, একটা ব্যাপার। খাবার হালকা মশলার ঝাঁজ। মিষ্টি ডেসার্ট ঠিক যেন খেজুরে গুড়ের পায়েস। তাতে এলাচীর সরব আনাগোনা। ভাবলাম, যারা এককালে উত্তমাশা পেরিয়ে ওপাড় থেকে বোঁচকা বেঁধে মশলাপাতি লুটে এনেছে, তার কিছু কিছু হদিস এতকাল বাদেও যে তাদের খাবার দাবারে রয়ে যাবে-এ তো খুব স্বাভাবিক।
 
ঘড়িতে সবে রাত নয়টা। নাইট ইজ স্টিল ইয়াং-এই আপ্তবাক্য আওড়ালো দলের কেউ একজন। আপ্তবাক্য মেনে নিয়ে হোটেলে না ফিরে এক পাক ঘুরে বেড়াতে রাজি হয়ে গেলাম আমরা। একমাত্র ব্যক্তিগত বাঁধা, পেন্সিল জুতোজোড়াকে আঙ্গুলে ঝুলিয়ে খালি পায়েই চললাম। পদব্রজে ভয় কি পথিকের। তাছাড়া, ঝকঝকে রাজপথ আর তকতকে ফুটপাথে খালি পায়ে হাঁটার মজাই আলাদা।
 
ডিনারে নানান রঙের পর্তুগীজ তরল ছিল। তার খানিকটা যাদের পেটে গিয়েছে, তার অল্পতেই হেসে এর ওর কাঁধে লুটিয়ে পড়ছে। তাদেরই একজন জড়ানো গলায় বললো, ‘ঐ দেখো ক্যাসিনো রয়্যাল। জেমস্ বন্ড, জেমস্ বন্ড। বুঝলে কিছু?’ চাপা বিস্ময়ে ঘুরে তাকালাম আমরা। দূরের রঙ্গিন ফোয়ারার পেছনে দাঁড়ানো সুবিশাল দালানের গায়ে লাল আলোতে জ্বলছে নিভছে, ‘ক্যাসিনো এস্তোরিল’। যেন এক টুকরো লাস ভেগাস উড়িয়ে এনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। ডানে বামের কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মরিশিও পাক্কা ট্রাভেল গাইডের মত বলে উঠলো, ‘ইয়ান ফ্লেমিংকে চেনো তো। বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক। জেমস্ বন্ডের বাপ। বন্ড সিরিজের প্রথম উপন্যাস, ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ এই ক্যাসিনো এস্তোরিলকে ঘিরেই লেখা হয়েছিল। হুঁ  হুঁ, বুঝে দেখো কোথায় এসে পড়েছো।‘
 
এতক্ষনে বুঝলাম কাহিনী। ‘ড্যানিয়েল ক্রেগ তাহলে জেমস্ বন্ড সেজে এখানেই লাফিয়ে ঝাপিয়ে শ্যুটিং করে গিয়েছিল, তাই না?’ জিজ্ঞাসু প্রশ্নটা ছুড়তেই মরিশিও এক প্রস্থ অকারণ হেসে নিলো। তার পেটেও বেশ খানিকটা তরল গিয়েছে। ‘আরে দূর, শ্যুটিং তো হয়েছিল চেক রিপাবলিকের প্রাগ শহরের কোন সস্তা জায়গায়। এস্তোরিলে লাফাতে ঝাঁপাতে প্রচুর পয়সা লাগে। ফিল্মের লোকেরা অত বোকা না।‘ একটু দম নিয়ে সে আবার যোগ করলো, ‘তা যাবে নাকি কেউ, একটা ঢুঁ মেরে আসি গে? এক দান খেলেও ফেলতে পারি, কি বলো?‘
 
ক্যাসিনোতে গিয়ে গাঁটের পয়সা ফেলে আসতে খুব বেশি কেউ সায় দিলো না। গবেষনা লাইনের লোকদের পকেট চিরকালই বেহাল। তবুও মরিশিও কিভাবে যেন কয়েকজনকে ভজিয়ে ফেললো। ইস্কাপন-হরতন-রুইতন-চিরতন পেটাতে তাসের ঘর ক্যাসিনো এস্তোরিলের দিকে রওনা দিয়ে দিল তারা বাকিরা আমরা আরেক পাক এদিক সেদিক ঘুরে ডেরায় ফিরে গেলাম।
 
সারাদিন পোস্টার নিয়ে তঠস্থ থাকতে হয়েছে। তার উপর ঠায়ে বসে গান শোনা আর গলা অবধি খানাপিনা। ঘুম নেমে এল প্রায় ভেঙ্গে চুরে। সমস্যা একটাই। রুমের আরেক প্রান্তে ফ্রান্সি মেয়েটা তার বেড-সাইড বাতিগুলো জ্বেলে ফোন হাতে আধশোয়া। কারো সাথে রাতভর কুটুর কুটুর আলাপের প্রস্তুতি। উশখুসটা আঁচ করতে পেরে সে মিষ্টি করে হেসে বললো, ‘অসুবিধা হলে বাতি নিভিয়ে দেই? একটু গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা বলতাম।‘
 
‘মানে?‘ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চোখ গোল গোল তাকালাম। ‘আরে, বয়ফ্রেন্ডও একটা ছিল। যেই বাবা-মার সাথে দেখা করিয়ে দিলাম, অমনি ফুটুস, ভেগে গেল। ছেলেদের সাথে নতুন করে ভাব করার ধৈর্য নেই আর।‘
 
বিস্ময়ে অস্ফুট একটা ‘ওহ্!’ করে চোখ বুজলাম। এত সহজে পুরুষ জাতি থেকে নাক ঘুরিয়ে ফেলাটা কি ঠিক হল, ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেলাম।
 
১০.
শেষ দিনটা সুদে আসলে উসুল হবে মনে হচ্ছে। একট বড় আকর্ষন আছে। আধা বেলাতেই সম্মেলন শেষ। তারপর, ট্যুরিস্ট বাসে করে আমাদের নিয়ে যাবে লিসবন। সেখানে রীতিমত গাইডেড ট্যুর। ইচ্ছামত ঘুরে টুরে যে যার ফ্লাইট ধরে বিদায় নেবে। ব্যবস্থা নেহাৎ মন্দ না। ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে একবারে বেরিয়ে পড়লাম চেক আউট সেরে।  
 
গতরাতেই অনেকে বিদায় নিয়েছে। তাই হল ঘর অর্ধেকটা ফাঁকা। শেষ দিনে লোকজনকে জ্ঞান গেলানো মুশকিল। বাকি লেকচারগুলো শেষ হলে মোটামুটি দায়সারা তাড়াহুড়োয় আয়োজনের সমাপ্তি টানা হল। মুক্তির আনন্দে লাফিয়ে বেরিয়ে এলাম। বিশালবপু কালো রঙের বাসটা আমাদের জন্যেই দাঁড়িয়ে আছে।
 
বাসের জানালায় নাক লাগিয়ে বসার ভেতর বিচিত্র সুখ। মনের শিশুটা বেরিয়ে আসে  খলবলিয়ে হেসে। যা দেখে, তাতেই সে মুগ্ধ। স্বচ্ছ কাঁচে পাঁচ-পাঁচ দশ আঙ্গুলের ছাপ ফেলে বিমোহিতের মত দেখছি এস্তোরিল-টু-লিসবনের পথঘাট। যে পথে এসেছিলাম, ফেরত যাচ্ছি নতুন আরেক পথ ধরে। দৃশ্যপটও তাই আনকোরা নতুন।
 
পর্তুগালের নীল আকাশ যেন নীলের চাইতেও নীল। তাতে পেঁজা তুলোর তুলিতে কত কি যে ক্ষনে ক্ষনে আঁকা হচ্ছে। কখনো সেখানে ফড়িং তাড়া করছে লম্বা কানের খরগোশ, কখনো বা ডানা ঝাঁপটে নামছে পঙ্খিরাজ ঘোড়া। ঘোড়া মিলিয়ে গেলে খেলতে এল ছোট্ট হাতির ছানা। শূড়ের ডগায় বলটা বুঝি তার এই পড়ে যায় যায়। এই যাহ্, বল যে পড়েই গেল। কিন্তু কি কান্ড! কোত্থেকে ভুশ্ করে বল মাথায় ভেসে উঠল একটা ডলফিন! আরেক কোনে দেখি ইয়া বড় এক ড্রাগন ওঁত পেতে দাঁড়িয়ে। পূব থেকে উড়ে আসা একটা উড়োজাহাজকে সে হাঁ  করে গিলে নিল কপাৎ। প্লেনটাও কম চালাক না। সুড়ুৎ করে ড্রাগনের কানের ফুটো দিয়ে পালিয়ে ফুড়ুৎ। আকাশের পর্দায় মেঘেদের ছায়াছবি চলতেই থাকলো। আর আমাদের বাসের জানালাটা যেন বায়োস্কোপ। কি চমৎকার দেখা গেল!
 
হায়, সাথে না আছে ক্যামেরা, না একটা যুতসই ফোন। ‘কি, আফসোস হচ্ছে বুঝি খুব?’ পাশের সহযাত্রীকে এই প্রথম খেয়াল হল। সৌখিন নাইকন ক্যামেরা কোলের ওপর নামিয়ে রেখে বছর চল্লিশের ভারতীয় চেহারার ভদ্রমহিলা হাত বাড়িয়ে দিলেন, ‘আমি ভিভা, ভিভা লামা। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছি। পালমোনারি মেডিসিনের প্রফেসর।‘
 
খুব দ্রুত চিন্তা করছি। ভদ্রমহিলা কি মাফিয়া প্রফেসর নাকি ফ্রেন্ডলি প্রফেসর?তার অল্প বয়স আর কথার সহজ ভঙ্গী দেখে তো মাফিয়া বলে মনে হচ্ছে না। সামান্য রিস্ক নিয়ে ফেললাম। ফিরতি হাত বাড়িয়ে জানতে চাইলাম, ‘তোমার নামের অর্থ কি ‘আলো’ বা ‘কিরণ’- এই জাতীয় কিছু?’ খুশি খুশি গলায় উত্তর এল, ‘আরে, জানলে কি করে? তুমি কি ইন্ডিয়ান?’ রহস্য করে বললাম, ‘না, বাংলাদেশী। তবে, আন্দাজ করে নিয়েছি ‘ভিভা’ নামের বাংলা উচ্চারন ‘বিভা’। আর বিভা মানে যে আলো, তা জানতে ক্লাস ফাইভের ব্যাকরণ বই-ই যথেষ্ট। ভেবো না, তোমাকে তোমার উচ্চারনেই ডাকবো, হাহা...।‘ ভিভাও হাসিতে যোগ দিল গালে হালকা টোল ফেলে। বাঁচলাম, সে ডন-মাফিয়া গোছের কিছু নয়। 
 
কিন্তু এই হাসি কই যেন আগে দেখেছি। চট্ করে মনে পড়লো। সেদিন রাতে মরিশিওর মুঠোফোনে। পাঁজি ইঁদুরটা এই ভিভার থালা থেকেই পিজ্জা সরাচ্ছিল। সেই খবর কি ভিভাকে জানানো ঠিক হবে? নাহ্, ঘাবড়ে দিয়ে ফায়দা কি। (চলবে)

 
 

Thursday, December 31, 2020

পর্তুগালের অলিগলি: ৩


৭.
দ্বিতীয় দিন। গ্যাঁট হয়ে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা লেকচার শুনে প্রায় ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। পাশের কারো ধাক্কায় ধড়ফড় করে উঠলাম। পোস্টার সেশনে ছুট দিতে হল। সেখানে গোল আলুর মত কেৎরে থাকার জো নেই। বরং ভুট্টার খই হয়ে ফুটতে হবে। সুতরাং, যত প্রকারে হাত-পা নেড়ে, ঘাড়-মাথা ঝাঁকিয়ে, কথার তুবড়ি ছুটিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেললাম। অতি আগ্রহের বনামে বুড়ো বুড়ো বিজ্ঞ প্রফেসররা মুচকি হাসলো। এতটুকু দমে না গিয়ে শূন্য কলসির মত বাজতেই থাকলাম। অল্প বিদ্যার এমনই তেজ। 

একটা ভয় কাজ করছে আসলে। পর্তুগাল আসার আগে বাজখাঁই তুর্কি সুপারভাইজার ডক্টর ইলদ্রিম হাসতে হাসতে গলায় পোঁচ দেয়ার ভঙ্গী করে ছেড়ে দিয়েছে। রিসার্চের কাজ তুখোড়ভাবে মেলে ধরতে না পারলে এক কোপে কল্লা কেটে নেবে। নিজে না এলেও কনফারেন্সের আসরে তার অনেক ‘কান’ আছে। ভাল-মন্দ সব সে শুনতে পায়। ভজঘট পাকিয়ে মিউনিখ ফিরে গেলে গর্দান সে নিতেও পারে। আতঙ্ক আর ত্রাসের অপর নাম ডক্টর আলী ইলদ্রিমের অসাধ্য কিছুই নেই। 

যাহোক, সব ভালোয় ভালোয় সেরে হোটেলে ফিরে গেলাম বিকাল নাগাদ। তৈরি হয়ে নেবার তাড়া আছে। রাতে গালা ডিনার। জাঁকজমক পার্টি হবে। সেখানে ছাত্র-প্রফেসর সবার সেজেগুজে আসার রেওয়াজ। গতবার ডক্টর মেলানি ক্যোনিগসহফ তাক লাগিয়ে দিয়েছিল ঘেরওয়ালা গাউন পরে। গম্ভীর, রাশভারী প্রফেসর আইকেলবার্গও নাকি চরম স্যুটেড-বুটেড হয়ে নারীমহলের কলিজা কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ডিস্কো বাতি জ্বেলে ম্যারম্যারে কনফারেন্স হল বদলে গিয়েছিল ঝলমলে বল রুমে। সে এক দেখার মত দৃশ্য। 

গল্পগুলো মিউনিখে বসে ভারতীয় বান্ধবী বার্খার কাছ থেকে শুনেছিলাম। বার্খা পোস্টডক্টরাল ফেলো। গতবারের কনফারেন্সে সে এসেছিল। সেবার কেন যে স্যুটকেসে ঢুকিয়ে একখানা শাড়ি নিয়ে যায় নি-এই আফসোসের তার শেষ নেই। বার্খার জবরদস্তিতে ব্যাকপ্যাকে একখানা নীল শাড়ি পুরে এনেছি। সেটা এখন হোটেলের সফেদ বিছানায় এলোমেলো পরে আছে। এই তেরোহাতি কাপড় নিয়ে বিরাট দ্বিধায় পড়ে গেছি। 

কখন যে ফ্রান্সি এসে পাশে দাঁড়িয়েছে, টের পাই নি। নীল জমিনে রুপালি সুতোর মিহি কারুকাজ দেখে তার মুখে কথা সরে না। ‘আরেব্ববাহ, শাড়ি দেখছি। তুমি পরতে জানো?’। ফ্রান্সির গলায় বেজায় কৌতূহল। কোন ফাঁকে সে চট্ জলদি তৈরি হয়ে নিয়েছে। তার বেশভূষাও বেশ ইন্টারেস্টিং। কালো স্ট্রাইপ ট্রাইজার, ফর্মাল সাদা শার্ট আর ব্যাক ব্রাশ চুলে ফ্রান্সিকে পুরো টমবয় লাগছে। ‘দেখো, বেশি সময় নিয়ো না, আমরা নিচে অপেক্ষা করছি। তাড়াতাড়ি নেমে এসো।‘ তাগাদা দিয়ে বাদামী ড্রেস স্যু মচমচিয়ে ফ্রান্সি চলে গেল। 

মিনিট পনেরো পর। শাড়ি পেঁচিয়ে জড়ভরত সেজে সিড়ির হাতল ধরে ধরে খুব সাবধানে নেমে এলাম। পেন্সিল হিলটা এই বুঝি একদিকে টশ্কে গেল। টালটামাল দৃশ্য দেখে সাথের মেয়েগুলো আমোদ পাচ্ছে। তাদের পরনে ফর্মাল মিডি স্কার্ট আর হালকা রঙের টপ। গলায় বড়জোর রঙ্গীন শাল। ছিমছাম সাজ। টাল সামলে রওনা দিলাম ওদের সাথে। কিন্তু শাড়ির কুঁচি পায়ের তলে পড়ে ঠিকই টশ্কে গেলাম। 

নেতা গোছের ফ্রান্সি এগিয়ে এল মুশকিল আসান হয়ে। ‘এ্যাই, সোজা হয়ে দাঁড়াও তো। পড়ে গিয়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলবে আর তোমাকে কাঁধে নিয়ে ঘুরবো আমরা? ধ্যাত্ততেরি!’ গজগজ করতে করতেই জার্মান মেয়েটা পকেট থেকে সেফটিপিন বের করে ভীষন দ্রুততায় অবাধ্য শাড়ির ভাঁজগুলোকে দারুন শাসনে নিয়ে এল। এই মেয়ের জন্ম বাংলাদেশে হওয়া উচিত ছিল। শাড়ি-টিপে কি সুন্দর টিএসসি, কার্জন হল ঘুরে বেড়াতো। তা না, খামোখাই জার্মান দেশে জন্মে শার্ট-প্যান্ট চাপিয়ে শুষ্কং কাষ্ঠং টমবয় সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে।    

৮.
কোথায় গালা ডিনার? আমাদের ছোট্ট দলটা বাদে বাকি সবাই দিনের বেলার সেই একই কাপড় পরে চলে এসেছে। পোশাকের ভাঁজে সারাদিনের স্পষ্ট ক্লান্তি। তার মাঝে নিজেকে নিদারুন বেখাপ্পা লাগছে। বার্খার কথা শুনে এমন সঙ সেজে এখন হাসির পাত্র হতে যাচ্ছি মনে হচ্ছে। 

শাড়ি নামক এই উপমহাদেশীয় বস্ত্রের জেল্লা একবার চাক্ষুষ দেখতে অনেকেই উৎসুক এগিয়ে আসছে। কোনোমতে সামনের সারির আসনে পালিয়ে বাঁচলাম। সম্মেলনগুলোতে প্রথম সারি চিরকাল ফাঁকা পড়ে থাকে। ঘুমিয়ে গেলে ধরা পড়ার ভয়ে।

ডিস্কো বাতি জ্বলে ওঠার বদলে হতাশ করে দিয়ে মোচওয়ালা এক প্রৌঢ় মঞ্চে উঠে এল। পোশাকের প্রতি লোকজনের উদাসীনতার কারন বোঝা গেল এতক্ষনে। কিসের নৃত্য সন্ধ্যা, আজকে হবে সঙ্গীত রজনী। পর্তুগালের ঐতিহ্যবাহী ফাদো সঙ্গীত। ভদ্রলোক ছোট্ট করে গলা খাঁকরি দিয়ে কথা শুরু করলেন। ‘ফাদো মানে ভাগ্য বা পরিনতি। বয়ে চলা সময়ের পরিনতিকে এই গানে বেঁধে ফেলা হয় এক মনোটোনিক সুরের বাঁধনে...’।  ফাদো সঙ্গীতের বিশাল ইতিহাসের বনামে বোয়াল মাছের হাঁ মেলে আমিও বিশালতর এক হাই তুলে ফেললাম। 

অপ্রয়োজনীয় ইতিহাস কপচানোর পর এবার শুরু হল গান। অপেরা সঙ্গীতের স্টাইলে উঁচু তানে সুরের নামে অসুর ধরলো শক্তিশালী মোটাসোটা মাঝবয়সী গায়ক। কি গান বাবা রে। দু’কানে ভয়ংকর অত্যাচার ঠেকছে। কি ভুল করেই যে প্রথম সারিতে বসেছি। কানের পর্দা ফেটে চৌচির হবার যোগাড়। ওদিকে, গায়কের সবুজ রগ গলা থেকে কপাল অবধি চড়ে গিয়েছে। নিরুপায়ের মত এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম।

পাঁচ মিনিটের মাথায় আমাদের সবাইকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে রগ ফুলানো গায়ক বড় একটা বাউ করে বিদায় নিল। নিঃশব্দে হাঁপ ছাড়লাম, ‘ফিউউহ্!’।  মঞ্চে এবার এল কালো গাউন পরা এক নারী। আধো আলোতে তার বয়স ঠাহর হয় না। গাঢ় মাশকারায় ঢাকা চোখ দু’টো আধবোজা। স্পানিশ গিটার আর তানপুরার আদলে গড়া পর্তুগীজ গিটার হাতে উঠে এল আরো দু’জন। ধীর লয়ে শুরু হল অপূর্ব সুরের রিনঝিন। না জ্যাজ, না, ব্লুজ, না ফোক। সঙ্গীতের জানাশোনা কোনো ধারাতে তাকে ফেলা গেল না। উশখুস করা এক হল লোক যেন আচমকাই শান্ত হয়ে বসলো। 

কেউ যেন সুরেলা গলায় গল্প বলে চলেছে। দেশ দেশান্তর ঘুরে আসা বোহেমিয়ানের ভ্রমন, ঘাটে ঘাটে নোঙর ফেলা নাবিকের যাত্রা, আটপৌরে মানুষের সরল গল্প। কিন্তু কাহিনীগুলো যেন দুঃখ দিয়ে গাঁথা। সম্মোহনী ভঙ্গিতে গেয়েই চলছে গায়িকা। তার কাঁধে কেউ যেন সেই সব মানুষের দুঃখের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। বেদনাকে ধারন করে এমন করে গাইতে কাউকে আর দেখি নি। 

গান শেষ হল এক সময়ে। শিল্পী নিচু গলায় কি যেন বলছে। আশ্চর্য হয়ে শুনলাম, ফাদো গানের আদি শিল্পীরা কেউ ছিল পেশায় নাবিক, কেউ বা পর্যটক। গানের যে ভাষার দরকার নেই, আরেকবার স্বীকার করতেই হল। (চলবে)



Friday, December 25, 2020

পর্তুগালের অলিগলি: ২


৪.
সস্তা হোটেলের ছবি মাথায় নিয়ে এসেছিলাম। পুরু কার্পেটের মেঝে, সুউচ্চ সিলিং আর দেয়ালের ক্লাসিক পেইন্টিংগুলো দেখে উল্টো ভিমড়ি খাবার যোগাড়। হোটেল কোথায়, এ যে রাজবাড়ি। তবদা ভাঙতে না ভাঙতেই চোস্ত জার্মান জানা রিসেপশনিস্ট এসে উদয় হল। কাগজপত্র দেখেদুখে দুই মিনিটেই চাবি বুঝিয়ে দিল। চাবি তো না যেন পাথরের চাঁই। আধা কিলো ওজনের পিতলের চাবিটা হাতে নেবো নাকি পকেটে পুরবো, ভেবে না পেয়ে শেষে বিড়ালের ঘন্টার মত গলায় ঝুলিয়ে ঘর খুঁজতে রওনা দিলাম। নম্বর মিলিয়ে নব ঘোরাতেই পনেরো শতকের দরজা খুলে গেল যেন। কারুকাজ করা কাঠের পালঙ্ক, গদি আঁটা মখমলের সোফা আর বেলজিয়াম কাঁচের দেয়ালজোড়া আয়না-সব মিলিয়ে আলিশান রয়্যাল স্যুট। দেখে ইতস্তত করছি, ঠিক জায়গায় এসেছি তো?

‘হাঁ করে দেখছো কি, সরে জায়গা দাও তো আগে’। হেভি ডিউটি সুইসগিয়ার স্যুটকেসটা হাতে ফ্রান্সিসকা ঠেলেঠুলে ঘরে ঢুকে পড়লো। বুঝলাম, এই প্রাসাদ কক্ষের সেও একজন শরীক। ফ্রান্সিসকাকে আমরা ছোট করে ফ্রান্সি বলে ডাকি। লম্বা-চওড়া, নেতা গোছের ডাকাবুকো মেয়ে। ‘পর্তুগালটা একেবারে খারাপ না, কি বলো? ‘তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও, ওপেনিং সেশন ধরতে হবে’। জুতো জোড়ার দু’পাটি দু’দিকে ছুড়ে মেরে খোশমেজাজে বললো ফ্রান্সি। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ফ্রান্সির দেখাদেখি মোজা খুলে ডানে আর বামে ক্রিকেট বলের মত পাকিয়ে উড়িয়ে দিলাম। ‘পরিপাটি জার্মান মেয়ে’র বদলে নিজের মতই আগোছালো আর ছন্নছাড়া কাউকে পেয়ে অস্বস্তি হঠিয়ে মনে মনে বেশ একটা স্বস্তি পেলাম।

এলোপাথাড়ি জামা-জুতো, টুপি-মোজার প্রবল বর্ষনে একটু আগের রয়্যাল স্যুটের বারোটা বাজাতে ঠিক পাঁচ মিনিট লাগলো আমাদের। সফেদ বিছানায় এক গড়ান দিয়ে টানটান চাদরটা কুঁচকে তারও তেরোটা বাজাতে ভুললাম না। তারপর, আধখোলা ব্যাগপ্যাক আর লন্ডভন্ড স্য্যুটকেস ডিঙ্গিয়ে বগলে ল্যাপটপ, কাঁধে পোস্টার নিয়ে দু’জন দিলাম ছুট কনফারেন্স হল বরাবর।

 
৫.
হল ঘরের মঞ্চে বিশাল ব্যানারঃ ‘লাং সায়েন্স কনফারেন্স ২০১২’। বিজ্ঞান সম্মেলনগুলোতে উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত একটা ব্যাপার আছে। সেটা প্রকট হয় চা-বিরতিতে। হোমরা চোমরা বিজ্ঞানীদের দল তখন ইটালিয়ান মাফিয়াদের মত ঘোট পাকিয়ে ঘুরবে, চুকচুক করে কফি খাবে আর পিএইচডি ছাত্র দেখলে নাক কুঁচকে আরেকদিকে হাঁটা দিবে। মাঝেমাঝে অবশ্য বাড়াবাড়ি রকমের ইন্টালেকচুয়াল এক আধটা পিএইচডি-পোস্টডক ভাব নিয়ে মাফিয়া দলে ঝুলে থাকে। অতটা ধৈর্য্য বা শৌর্য কোনোটাই না থাকায় আমচু মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছি। দলের বাকিরা যথারীতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। আবছা আলোর সারি সারি আসনের ভিড়ে তাদের ঠাহর করা মুশকিল। সুতরাং, সেই তো আবার দলছুট।
 
ঠিক এই সময়ে ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এল প্রফেসর মরিশিও রোয়াস। ‘এ্যাই, কি খবর? ডঃ ইলদ্রিমের ছাত্র না তুমি?’ হকচকিয়ে গেলাম। মরিশিও রোয়াস আমেরিকার পিটসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পালমোনারি মেডিসিনের নামকরা অধ্যাপক। পঞ্চাশ পেড়োনো অমায়িক চেহারা। মিউনিখে আমাদের রিসার্চ স্কুলে কিছুদিন আগে লেকচার দিয়ে গেছে। তখন প্রস্ন-উত্তর সেশনে সামান্য আলাপ হয়েছিল। তবুও মাফিয়াদের একজন এগিয়ে এসে হ্যালো বললে সংশয় জাগে বই কি।
 
জড়তা জড়িয়ে এগিয়ে গেলাম। নকল, দুই নম্বর আঁতেল সেজে হড়বড় করে বলে ফেললাম, ‘স্টেম সেল নিয়ে সেবার তোমার লেকচারটা খুব ভাল লেগেছিল। নাইস টু মিট ইউ এগেইন, প্রফেসর মরিশিও’। চওড়া হাসির সাথে জবাব এল, ‘আরে রাখো তো ওসব প্রসেফর-টফেসর। শুধু মরিশিওতেই চলবে। তা তোমার থিসিসের কাজ কেমন চলছে আর ক’টা ইঁদুর মারলে এ পর্যন্ত? হাহাহা...‘। এরপর কথা জমে যেতে আর সময় লাগলো না। মনে মনে ঠিক করলাম, বিজ্ঞানের কাঠখড় পুড়িয়ে একদিন যদি মাফিয়া বিজ্ঞানী বনেই যাই, তো মরিশিওর মত  ফ্রেন্ডলি মাফিয়া হতে হবে। কুটিল, গ্যাংস্টার মাফিয়া হয়ে কাজ নেই।

৬.
এস্তোরিলের সন্ধ্যাটা টুপ করে নেমে গেল। আমাদের কনফারেন্সের পর্দাও সে বেলার মত গুটিয়ে ফেলা হল। আগামীকালের সেশনের জন্যে পোস্টার টাঙিয়ে বাকিদের সাথে ডিনারে বেরিয়ে পড়লাম। এই প্রথম চোখ মেলে এস্তোরিল দেখার ফুরসত পেলাম। কিন্তু সন্ধ্যার ঘুটুঘুটে আঁধার আর টিমটিমে ল্যাম্পপোস্ট সে আশায় জল ঢেলে দিল। শুধু বোঝা গেল, লিসবনের সাথে এস্তোরিলের একশো আশি ডিগ্রি ফারাক। অভিজাত হোটেল-দালানের ভিড় রাস্তার দু’পাশে। সাঁ সাঁই চলে যাওয়া কালো কাঁচে ঢাকা গাড়িগুলোর মডেল আন্দাজ করা যায় না এমনই সব দামী স্পোর্টস কার সেগুলো।
 
সব কৃত্রিমতা ছাপিয়ে অকৃত্রিম একটা নোনা বাতাস হানা দিচ্ছে হঠাৎ হঠাৎ। জিজ্ঞেস করতে জানা গেল, সামান্য দূরেই সৈকত আছে। কোস্টা ডি এস্তোরিল। আফসোস, সেখানে যাবার সময় হবে না সামনের দুই দিন। কনফারেন্সের শিডিউল ভোর থেকে রাত। তাই সমুদ্রের ঘ্রান নিয়েই খুশি থাকতে হলো।
 
বড় রাস্তা ছেড়ে সরু গলিতে ঢুকে পড়লাম। নোনা বাতাস তবুও পিছু ছাড়ে নি। আরো যোগ হয়েছে নীড়ে ফেরা পাখিদের কিচির মিচির। গাছে গাছে কচি পাতার নূপুর। পাতার ফাঁকে এক ফালি চাঁদ উঁকি দিয়ে বোহেমিয়ান মনটা উদাস করে দিতে চাইছে খুব। অলিগলিতে না ঢুকলে বোধহয় শহর চেনা যায় না। এখানে শহর কিছুটা ‘অফ-গার্ড’ থাকে। এখানে হিসেব করে বসানো ইটকাঠের আড়ম্বর নেই, জৌলুস দেখিয়ে ভোঁ গাড়ি হাঁকানোর সুযোগ নেই। নিরিবিলির সুযোগে সন্ধ্যাটা তখন পাতার ফাঁকে চুপটি করে নেমে এসে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।  
 
যাহোক, অনেক খুঁজে এক মাঝারি দামের পিজ্জারিয়া আবিষ্কার করে হল। হরেক রকমের পিজ্জা আর সালাদ চলে আসতে সময় লাগলো না। মুহূর্তেই বুভুক্ষের দল ঝাঁপিয়ে পড়লাম। তবে জায়গাটা বড্ড অন্ধকার। আলোর ব্যাপারে এরা এত কৃপণ কেন। কি ঘরে, কি বাইরে। আর থেকে থেকে টেবিল-চেয়ারের নিচে কিসের যেন হুটোপুটির শব্দ ভেসে আসছে। বিড়াল টিড়াল হবেও বা-এই ভেবে পাত্তা দিলাম না। এদেশে এদের যথেচ্ছা ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। কিন্তু যেখানে বিড়াল, সেখানে যে ইঁদুরেরও আনাগোনা, তা কে জানতো।
 
খেয়ে দেয়ে তৃপ্তি নিয়ে ক্লান্ত পায়ে ফিরে যাচ্ছি। হঠাৎ মরিশিও চাপা উচ্ছ্বাসে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। সে বরাবরই আমাদের দলে মিশে ছিল। মরিশিওর মেলে ধরা মুঠো ফোনের অস্পষ্ট ছবিতে একটু আগের হুটোপুটি রহস্য পরিষ্কার হল। ছোট্ট কিন্তু গাট্টাগোট্টা এক ইঁদুর মশাই মুখে কামড়ে আর হাতে টেনে পাশের টেবিল থেকে রসালো এক টুকরো পিজ্জা সরাতে ব্যস্ত। অল্প আলোতে তার গোলাপি হাত দু’টো মেমপুতুলের হাত বলে ভুল হতে চায়। আর চোখ যেন কালো মুক্তার পুঁতি বসানো। সন্ধ্যা তারার মত ঝিঁকিয়ে উঠছে। ছবি তোলায় ভড়কে গিয়ে বাঁকাচোরা একটা হাসিও দিয়েছি দেখছি। ভীষন কিউট পিজ্জা চোরের রূপে সবাই একযোগে মাখনের মত গলে গেলাম। গলার সহজ কারনও আছে। দলের দশ জনের নয় জনই যে মেয়ে। দুষ্ট প্রফেসর মরিশিও বেশ দেখেশুনেই দলে ভিড়েছে। (চলবে)

Wednesday, December 16, 2020

(A not so serious) Letter of Interest


(Back in 2016, I wrote this application (!) on behalf of my son to get him a daycare place. Things you do while in Germany.)

Dear everyone,

Hallo, I am a little angel named Tafseer Ahmed (see me in photo below). I came down to the planet earth on 9th June, 2015. Life among humans is going pretty good since then. Mama queen and papa king call me their prince charming. 

Do you know my parents? My papa is Shamsuddin Ahmed and my mama is Rim Sabrina Jahan Sarker. Her name is so long that sometimes I forget it.. haha. Papa works as an engineer at funny company called Freescale where he works all day and makes sensors for cars (don't ask me more :S). So, I stay with mama at home and I love it. My mama completed her PhD on lungs disease at LMU in August, 2015 when I was just 3 months old! You won't believe how I helped her studies by being such a nice and quiet baby. 

Now she wants do more science and looks for a new job. I am very very worried thinking who will be with me if all go to work? I need to someone to play with. I heard that you have a very beautiful place for kids like me where I can make new friends and play and laugh and sing and dance all day long. It sounds like a fairytale to me. Will you please let me join you? I promise you will also like me because I am cheeky monkey to be around!

Please let me know if you can make some space for me. I can't wait to play with you. Lots of love and a big hug and kiss and lots of sunshine.

Yours lovable,

Tafseer the tiny tot

P.S. my mama (A1) can speak a little German and papa (B1) can speak a lot more but none writes good German. My plan is to teach them the language once I start to learn from you . Isn't that a great idea? Yes, that's me!

----

Munich, Germany

2016

Monday, November 23, 2020

পর্তুগালের অলিগলি: ১

১.

এলোমেলো কয়েক পাক ঘুরতেই ছোট্ট লিসবন বিমানবন্দরটা ফুরিয়ে গেল। ডিউটি-ফ্রি শপে কেনাকাটা করার লোক নই। তারপরও এক-দুইটা পারফিউমের বোতল টিপেটুপে দেখলাম। অতি সুগন্ধে নাক বন্ধ হয়ে আসা ছাড়া আর কোনো লাভই হল না। মাথা ধরিয়ে বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে। ভাবছি, আরো ঘন্টাখানেক কি করে যে কাটাই। 

যেখানেই যাই, কি ভাবে যেন দলছুট হয়ে যাই। বাকিদের সাথে এক ফ্লাইটে টিকেট মেলে নি। আরেক ফ্লাইটে বাকিদের আগে এসে পৌঁছেছি। বাকিরা বলতে রিসার্চ ইন্সটিটিউটের পিএইচডি ছাত্রছাত্রীরা। মিউনিখ থেকে প্রায় জনা দশেক এসেছি একটা কনফারেন্স ধরতেসে কনফারেন্স আবার পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে অনেক দূরে। এস্তোরিল বলে কোন আরেক শহরেওরা এলে সবাই এক সাথে বাস বা ট্রেনে করে যাবো। তাই হাতের সময়টাকে সাথে নিয়ে ঘুরে ঘুরে মাছি মারছি।

একঘেয়েমি কাটাতে শেষে এক রেস্তোরায় আশ্রয় নিতে হল। বাকি টেবিলগুলোতে অতিথি নেই। একমাত্র কাস্টমারের আগমনে ওয়েটার লোকটা তীরের মত ছুটে এল। তাকে দু’প্লেট সী- ফুড আনতে পাঠিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে বসেছি। হেঁশেলে খবর পৌঁছে দিয়ে লোকটা  দেখছি আবার হাত ভাঁজ করে বিনীত দাঁড়িয়ে। অগত্যা এবার তাকে ঠান্ডা কোকাকোলার অনুরোধ জানালামআলাদিনের দৈত্যের মত মুহূর্তেই সে বিশাল রূপালি থালায় টেলিস্কোপের মত সরু গ্লাস নিয়ে হাজির হল কোক ঢেলে তাতে আবার রঙ্গীন একটা ছাতা বসিয়ে দিল। গ্লাসের খাঁজে এক চাক লেবুও বসে গেল খাপে খাপ। কারুকাজ করা কৃস্টালের বাটিতে বরফ কুচিও আছে দেখছি।  

আপ্যায়নের বহর দেখে অস্বস্তি খচখচ্ করছে সামান্য। ‘মোমবাতি জ্বেলে দেই, ম্যাম? একটা মোলায়েম অ্যাট্মোস্ফিয়ার তৈরি হবে। বরফ শীতল পানীয়ে সুরুৎ সুরুৎ টান দিতে দিতে কোনোমতে বললাম,’উহু, ঠিক আছে, ঠিক আছে, ধন্যবাদ‘...বলতে না বলতেই লোকটা দৌড়ে গিয়ে ধোয়াঁ ওঠা পেল্লায় এক থালা নিয়ে এল। মাখনে হুঁটোপুটি খাওয়া চিংড়ি আর মচমচে কালামারির উষ্ণ মাতাল ঘ্রানে নড়ে চড়ে বসলাম। এত দ্রুত খাবারের হুকুম তালিম হতে আর দেখি নি। গার্লিক সসে মুড়িয়ে গরমাগরম মুখে চালান দিতেই আবেশে চোখে বুজে এল। সময় কাটানোর এই অলস পন্থাটা নেহাত খারাপ না।

২.

ওদের আসার সময় হয়ে এসেছে প্রায়। বিল চুকিয়ে আর দরাজ হাতে বখশিস মিটিয়ে উঠে পড়লাম। উত্তরে ওয়েটার লোকটা সাবেকি কায়দায় একটা ‘বাউ’ ঠুকে দিল। নতুন দেশে নেমেই এমন ভিআইপি আদর পেয়ে নিজেকে ভারিক্কী গোছের কেউকেটা মনে হচ্ছে। হৃষ্টচিত্তে বাকিদের খুঁজতে ‘অ্যারাইভাল‘ গেটে দাঁড়ালাম। একে একে আট-নয়জনের দলটা বেরিয়ে এল। গরমে তারা ঘেমে নেয়ে হদ্দক্লান্ত। খেয়ে দেয়ে নধর, চিকচিকে চেহারার আমাকে দেখে প্রথমেই তারা ভারি ভারি পোস্টারের খাপ দু’টো গছিয়ে দিল। আপত্তি না করে সানন্দেই সেগুলো কাঁধে তুলে নিয়ে বেরিয়ে এলাম সবার সাথে।

এয়ারপোর্টের ভেতরটা যেমন বদ্ধ, বাইরেটা তেমনি খোলা। কচি পাতার ফাঁকে মৃদুমন্দ বাতাসে চারিদিক ভেসে যাচ্ছে। বসন্ত এসে গেছে এদেশে। মার্চ মাসের মোলায়েম পর্তুগীজ রোদ যেন এক গাল হেসে বরন করে নিল আমাদের।

আমাদের দলের তুখর  চটপটে মেয়ে ফ্রান্সিসকা কোন ফাঁকে টিকিট বুথের বোতাম চেপে এক রাশ টিকিট কেটে জনে জনে হাতে ধরিয়ে দিল। দামের হিসাব পরে হবে। এখন সময়ের ভেতর এস্তোরিল পৌঁছাতে পারলে হয়। স্টেশনে বাস এসে দাঁড়াতেই হুড়ুমুড়িয়ে চেপে বসলাম। পয়সা দিয়ে টিকিট কাটলেও বাসে তিল ধারণের জায়গা নেই। অগত্যা বাদুড়ঝোলাই ভরসা।

অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে পুরানো মডেলের মেড-ইন-জার্মানি মার্সিডিস বাসটা ক্যাঁচকোঁচ আর্তনাদ তুলে এগিয়ে চললো। চওড়া রাস্তা আর অট্টালিকা ফুরিয়ে যেতে সময় লাগলো নাবাকি রইল অলি গলি আর গায়ে গা ঘেঁষা ঘিঞ্জি বাড়ির সারিআর দশটা ইউরোপীয় শহরের আভিজাত্য নেই তাতে।

তবে আভিজাত্য নিয়ে মনে হয় এদেশের লোকের তেমন মাথাব্যথাও নেই। যে যার মত উঁচু গলায় কথা বলছে বিরতিহীন। শিশুরা চ্যাঁওভ্যাও কাঁদছে তো মায়েরা কপট রাগ দেখিয়েই গল্পে ডুবে যাচ্ছে। কিশোরের দঙ্গল হাহা করে হাসছে তো বুড়োরা মোড়ের ক্যাফেগুলোতে হল্লা করে চুরুট টানছেসব মিলিয়ে কথার কলেবরে আর হাসির কলোরবে দীনহীন পর্তুগালের অলিগলি ভীষন রকমের উজ্জ্বলকোন দেশের ট্যাঁকে কত কাগুজে নোট আছে, তা দিয়ে যে উন্নতি মাপা হয়, সেই হিসেবে পর্তুগাল ঠিক পড়ে না। তবে মাপকাঠিটা যদি পয়সা-কড়ির বদলে লোকের মুখের হাসি হত, তাহলে পর্তুগাল নিখুঁত পেনাল্টি খেলে গোল দিয়ে জিতে যেতঅন্তত বিলবোর্ডে ফুটবল বগলে রোনালদোর দুষ্ট হাসি তো তা-ই বলছে।

৩.  

বাসের দুলুনিতে চোখ লেগে এসেছে। ঘুম তাড়াতে চোখ কচলে বাইরে তাকালাম। কিন্তু একি, কোথায় গেল সরু সরু অলিগলি? এ তো দেখছি সমুদ্দুরের কাছে এসে পড়েছি। কোনো এক বন্দর বলে মনে হচ্ছে যেন। ঝাঁকি তুলে কষে এক ব্রেক চেপে বাস থেমে গেল। ঘোরের ভেতর নেমে এলাম। সামনেই নোঙ্গর করা অতিকায় কাঠের জাহা, যার মাস্তুল যেন আকাশ ফুড়ে শূন্যে চলে যাবার ফঁন্দি আঁটছে। ব্যস্ত সমস্ত লোকেরা মাথায় করে মসলিন আর রেশমি কাপড়ের গাঁট্টি নামাচ্ছে। কেউ বা বিশাল বিশাল পিপে গড়িয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। বাতাসে দারচনি, এলাচ, লবঙ্গের মিষ্টি ঝাঁঝালো ভারী সুবাস। অবাক চোখে হাঁ করে দেখছি দৃশ্যপট। কথা আর সরছে না। টাইম ট্রাভেলের মত কিছু ঘটলো না তো? সাথের মেয়েগুলো কই উধাও হল?

হঠাৎ জাহাজের কাপ্তান মত লোকটা বিদঘুটে এক টুপি চাপিয়ে বেজায় হাঁকাহাঁকি জুড়ে দিল। ভাল করে তাকাতেই দেখি, ও মা, এ যে ভাস্কো ডা গামা! উত্তমাশা অন্তরীপ পেরিয়ে ভারত ঘুরে পর্তুগাল ফিরে এসেছে। মশলা আর মসলিন সে-ই সাথে করে এনেছে। তাহলে এই সেই লোক! ইশকুলে সমাজ বইয়ের পাতায় পাতায় কি জ্বালানোটাই না জ্বালিয়েছে। ‘ইউরোপ থেকে কে?? পর্তুগীজ নাবিক ভাস্কো ডা গামা কত সালে ভারতে আসার কোন জলপথ আবিষ্কার করে ভারতের কোন বন্দরে প্রথম পদার্পন করেন?’... ইত্যাদি। সমাজ বইটা এই মুহূর্তে হাতের কাছে পেলে নির্ঘাত টুপি বরাবর ছুড়ে বদলা নিয়ে নিতাম।

কিন্তু না, বই ছোড়াটা ঠিক হবে না। ভাস্কো ডা গামার টুপি খামচে বসে আছে ছোট্ট এক বাঁনর। চট করে ইতহাসের পাতায় চোখ বোলালাম মনে মনে। কোথাও দেখলাম না যে লেখা আছে, ‘বিখ্যাত পর্যটক ভাস্কো ডা গামা বানর ঘাঁড়ে ঘুরে বেড়াতেন। বানরটা ছিল তার সার্বক্ষনিক ভ্রমনসঙ্গী। ২৪,০০০ মাইলের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সেও গিয়েছিল ভারতে।‘

ধাঁধাঁয় পড়ে গেলাম। কোথাও গোলমাল হচ্ছে। এই ফাঁকে বানরটা লাফিয়ে উড়ে এল। পালটা লাফিয়ে সরে পড়তে চাইলাম, কিন্তু তার আগেই কে যেন জোরসে দু’টো ঝাঁকি মেরে হুংকার ছাড়লো, ‘এ্যাই, এ্যাই, পৌঁছে গেছি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুব ঘুমাচ্ছো। তুমি কি ঘোড়া নাকি?’ যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ে ঘুমিয়ে নিতে ঘোড়া নামের প্রানীটার নাকি জুড়ি নেই। ঘুম ভাঙ্গানোর প্রতিবাদে খুর খামচে  চিঁ হিঁ করে ডাক ছাড়ার বদলে চি চি করে শুধালাম, ‘এত তাড়াতাড়ি চলে এসেছি? মাত্র না বাসে উঠলাম।‘ জবাব এল, ‘কি যে বলো, পাক্কা দেড় ঘন্টা পেরিয়ে গেছে’। ঐতিহাসিক স্বপ্নটা ছুটে যাওয়াতে সামান্য আফসোস হল। তবে বানরের খামচি থেকে বেঁচে গিয়ে খুশিই হলাম এক রকম। (চলবে)

ছবি, অন্তর্জাল

Monday, November 9, 2020

আঠারো নম্বর ট্রোগার স্ট্রিট


১.

সকালের একটা রুটিন আছে। কাগজের কাপে গরম কফি আর এক টুকরো রুটি কিনতে ক্যাফেটেরিয়ায় হানা দেই। করিডোরের সেন্সর লাগানো দরজটা খুলে যায় নিচ থেকে ওপরে। গ্যারেজের দরজার আদলে। এটা হাসপাতালের ব্যাকডোর। জরুরি বিভাগের ঠিক নিচে। ঢুকলেই সাদা বিছানা চোখে পড়ে। নতুন চাদর পালটে স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে মুড়ে রাখা হয়েছে। পরের কোনো রোগীর অপেক্ষায়। হাসপাতালের বিছানাগুলোকে এক ধরনের পোর্টাল মনে হয়। এ যেন আরেক জগতের প্রবেশপথ। সুস্থতা থেকে জরায় আপনাকে স্বাগতম। রোগ-জরাকে পাশ কাটিয়ে কফির উষ্ণতায় ভর দিয়ে বেরিয়ে আসি। সকালের বিশুদ্ধ বাতাস কেটে অফিস বরাবর হাঁটতে থাকি।

রেখস্ট ডের ইজার। মিউনিখের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির নিজস্ব হাসপাতাল। খুব বেশি দিন হয় নি প্যথলজি বিভাগে কাজ করি। ডাক্তার নই, তবে গবেষক। মলিক্যুলার বায়োলজিস্ট। ক্যান্সারের মত অসুখ নিয়ে কাজ করলেও তাই রোগী আর তাদের বাস্তবতা যথেষ্ট দূরে। অন্তত এতদিন তাই ভাবতাম। কিন্তু ইদানীং প্রায়ই হকচকিয়ে যেতে হচ্ছে।  

সেক্রেটারী পেত্রা আর আমি একই অফিসে বসি। হাসিখুশি অমায়িক মানুষ পেত্রা। আজকে কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে রিভলভিং চেয়ারে গা ডুবিয়ে জাঁকিয়ে বসেছি। চোখে পড়লো পেত্রার টেবিলে মোটা প্লাস্টিকের ব্যাগ স্তুপ করে রাখা। ইমেইল পড়তে পড়তে আলপটকা জানতে চাইলাম, ‘ওগুলো আবার কি, পেত্রা?’। রহস্যময় জবাব এল, ‘এগুলো বডি ব্যাগ। লাশ পুরে চেইন টেনে দেয়া হয়, জিইইইপ্’। শুনে আমার চোয়াল ঝুলে হাঁটুতে নেমে এল। ঘাবড়ানো চেহারা দেখে পেত্রা তাড়াতাড়ি করে ধামা চাপা দেয়ার ভঙ্গিতে বলে বসল, ‘আরে ওগুলো তো অ্যানিমেল ল্যাবের জন্যে। বড় সাইজের শুকর বা কুকুর কাটাকুটির পর মুড়িয়ে নিয়ে যাবে।‘ শুনে সরল মনে বিশ্বাস করে ফেললাম। চোয়াল আবার হাঁটু থেকে জায়গামত ফেরত এল। তবে একটা ব্যাগ নাড়াচাড়া করে মনে হল, আস্ত মানুষও প্যাকেট করে ফেলা যাবে অনায়াসে। 

প্যাকেটে মোড়ানো না হলেও আস্ত মানুষের দেখা মিললও খুব শীগগিরই। তৈরি ছিলাম না ব্যাপারটার জন্যে। এক সকালে খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়াশোনা করছি। দুপুরে একটা পেপার প্রেজেন্টেশন আছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স কাজে লাগিয়ে কিভাবে ক্যান্সার ডায়াগনোসিস করা যায়। নেচার জার্নালে ছাপা হওয়া খটোমটো পেপারটার ‘প’ও বুঝতে পারছি না। তাও দাঁত খিঁচে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। 

এমন সময়ে দরজায় আলতো টোকা। কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে দেখি কালো পোশাকে জনাকয়েক অপরিচিত নারী পুরুষ। তাদের চেহারা বিধ্বস্ত। অল্পবয়সী একটা মেয়ে আবার ফুঁপিয়ে কাঁদছেও। দলের বয়স্ক ভদ্রলোক তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেই রুমালে চোখ মুচছে বারবার। ঘটনা দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। খানিকটা ইতস্তত করে একজন প্রশ্ন করলো, ‘আমাদের আত্মীয় মারা গেছেন গতকালকে। শেষবারের মত দেখতে এসেছি। হাসপাতাল থেকে এই সময়ে আসতে বলেছে । কিন্তু কোথায় যাবো, ঠিক বুঝতে পারছি না। যদি একটু সাহায্য করতেন।‘  

মুশকিলে পড়লাম। এ ধরনের ব্যাপার আমার কাজের ভেতরে পড়ে না। একে ওকে ফোন লাগিয়ে লাভ হল না। কি কারনে যেন পুরোটা দালান খা খা করছে। পেত্রাও নেই আজকে। থাকলে সে-ই সামাল দিত। চট করে মনে পড়লো, আরে নিচে তো একটা ঘর আছে। প্রেয়ার রুম। ওখানে নিয়ে যাই এদের। অফিসের সামনে জটলা না পাকিয়ে সেখানে অপেক্ষা করলেই বরং ভাল। এর ভেতর কাউকে না কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে। 

এক পাল লোকজন নিয়ে মাইনাস টু-তে নেমে এলাম। চাবি ঘুরিয়ে পাল্লা খুলতেই জমে গেলাম মুহূর্তে। এ ঘর তো খালি নয়! শূন্য ঘরের মাঝে স্টিলের ট্রলিতে কে ওটা? চোখ সয়ে আসতেই দেখি শ্বেতশুভ্র কাপড়ে মিশরীয় মমির আদলে বুকে হাত ভাঁজ করে শুয়ে আছে সৌম্য চেহারার কে যেন। নিথর অথচ কি জীবন্ত। এতটাই জীবন্ত যে এই বুঝি ভুর কুঁচকে তাকিয়ে বলবে, ‘শান্তিতে ঘুমাতেও দেবে না দেখছি। আর ঘুমাবোই না, ধুর্’...। দৃশ্যটা একই সাথে সম্মোহনী আবার অসহনীয়। 

কি যে ভূতে ধরলো, লোকজনকে বললাম, ‘ভেতরে একজন আছেন। একবার কি দেখবেন আপনাদের আত্মীয় কিনা?’ উত্তরে চট্ করে উঁকি মেরে দেখে নিলো অল্পবয়সী মেয়েটা। তারপর প্রবল বেগে মাথা নাড়তে থাকলো। আরেক প্রস্থ কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল। ভুল লোকের কাছে  ভুল পার্টি নিয়ে এসেছি তাহলে। মারাত্মক গুবলেট হয়ে গেল দেখছি। রীতিমত বিপন্ন বোধ করলাম। হাঁচড়ে পাঁচড়ে আবার ওপরে উঠে এলাম সাহায্যের আশায়। ওদিকে পিলে টিলে চমকে গিয়ে ফুসফুস-হৃতপিন্ড যে জায়গা অদল বদল করে ফেলেছে, সেদিকে গ্রাহ্য করারও সময় পেলাম না। 

হঠাৎ দেবদূতের মত উদয় হল পরিচিত এক মুখ। তার পরনে পরিস্থিতির সাথে একদম বেমানান রকমের মেঝে ছোঁয়া পান্না সবুজ ইভিনিং গাউন। ‘কি, ওরা নিচে নাকি? বার বার বলেছি আমার সাথে আপয়েন্টমেন্ট নিতে। একটা প্রোটোকল আছে না!’ গজগজ করতে করতে পাঁচ ইঞ্চি উঁচু স্টিলেটো হিলে ঠক্ ঠক্ তুলে নিচে নেমে গেল বছর ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের ফ্রাউ ব্রাউনআইস। তার হাতে সব ছেড়ে ছুড়ে পালিয়ে বাঁচলাম। তবে নিচে দাঁড়ানো লোকজন ভদ্রমহিলার বেশভুষা দেখে ভড়কে না গেলে হয়। 

লাঞ্চের টেবিলে ঘটনা খুলে বলতেই কলিগদের চোখ কপালে উঠল। ‘এরপর থেকে এমন হলেই ফ্রাউ ব্রাউনআইসকে ফোন লাগাবে। তার কাজই হচ্ছে মৃতদেহ সাজিয়ে গুছিয়ে আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখার ব্যবস্থা করা। এর ভেতরে আর মাথা গলিয়ো না। প্রোটোকল ভাঙ্গার ক্যাঁচালে পড়ে যাবে।‘ 

এক মনে শুনে গেলাম কথাগুলো। ফ্রাউ ব্রাউনআইসের পোশাক-রহস্যও বুঝলাম খানিকটা। পাতালঘরের মৃত্যুপুরীতে যার নিত্যদিনের কাজ, তাকে মনে প্রানে বেঁচে থাকতে হলে বর্ম পরে নিতে হয়। আপাদমস্তক ঢাকা জাঁকালো পোশাকগুলো আসলে তার বর্ম। ধূসর মৃত্যুর বনামে দুর্ভেদ্য রঙ্গীন ঢাল।
 
যাহোক, এক ঢোকে প্লেটের খাবার গিলে দারুন এক শিক্ষা নিয়ে ফিরে এলাম অফিসে। শিক্ষাটা হল, আঠারো নম্বর ট্রোগার স্ট্রিটের এই দালানে জীবিতদের সমান্তরালে নীরবে নিভৃতে মৃতরাও বাস করে। যেখানটায় বসে আছি, তার ঠিক দুই তলা নিচেই হাত ভাঁজ করে কেউ একজন শুয়ে আছে প্রিয়জনদের শেষ দেখার আশায়। সে বেলার মত কাজে মন বসানো দায় হয়ে গেল। 

২.
তারপর কেটে গেছে বেশ কয়েক মাস। ঢাকনি চাপানো লম্বা ট্রলিগুলো দেখে আর ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের ট্রলি ভেবে ভুল করি না। এই গাড়িতে চেপে হাসপাতাল-টু-মর্গ আর মর্গ-টু-প্রেয়ার রুমে চুপচাপ কাদের যাওয়া-আসা, সেটাও জেনে গেছি এতদিনে। মোট কথা, মোটা দাগের একটা নির্বিকার ভাব চলে এসেছে। 

এক মাঝ দুপুরে সেই নির্বিকারত্ব জলে ভেসে গেল। সিড়ি ভাঙবো না বলে আলসেমি করে লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। চার তলায় কাজ আছে একটা। এমন সময়ে এক ভদ্রলোক পায়ে পায়ে এগিয়ে এলেন। ‘অমুক নম্বর রুমটা কোথায় বলতে পারেন?’ চট্ করে হাত চলে গেল ফোনে। ফ্রাউ ব্রাউনআইস কেস। ওপাশ থেকে জবাব এল, ‘রিসেপশনে বসতে বলবে একটু? এক্ষুনি আসছি। পাঁচ মিনিট, ওকে?’

একই কথা আবার তোতাপাখির মত আউড়ে লিফটের বোতাম চাপলাম। ভদ্রলোক বাধ্য ছেলের মত সোফার এক কোনে বসে পড়লো। বয়স চল্লিশ কি বেয়াল্লিশ। ছ’ফুটের ওপরে সুপুরুষ চেহারা। মাথা ঝুঁকিয়ে বসায় কোঁকড়ানো চুল কপাল বেয়ে নেমে পড়েছে। কোলের ওপর বাদামী লেদার ব্যাগ। কি ভেবে ব্যাগটার দিকে তাকালাম। যেনতেন ভাবে কাপড় ঠেসে জোর করে চেইন টেনে দিয়েছে কেউ যেন। অলক্ষ্যে এক টুকরো স্কার্ফ বেরিয়ে পড়েছে। তাতে বেগুনি রঙ্গে হালকা ফুলেল ছোপ। 

‘আমার ওয়াইফের ব্যাগ। হাসপাতাল থেকে ফেরত দিল।‘ অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম। কিন্তু জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নামাতে গিয়ে জিজ্ঞাসা যেন আরো বেড়ে গেল। লোকটা বুঝতে পেরে বলেই চললো, ‘ওকেই আরেকবার দেখতে এসেছি।‘ এই দেখতে আসার কারন বুঝিয়ে বলতে হয় না আমাকে। 

বেগুনি স্কার্ফ হাতের মুঠোয় উঠে এসেছে লোকটার। তাকে কূলহারা নিঃস্বের মত লাগছে। অস্ফুট একটা স্বরে চারপাশটা ভারি হয়ে উঠছে ক্রমশ। আশেপাশে লোকজন যে যার মত আসছে-যাচ্ছে; রুটিন কাজের ফাঁকে ডানে বামে ভ্রূক্ষেপ নেই কারো। শুধু আমিই যেন অচল দাঁড়িয়ে রইলাম। ফ্রাউ ব্রাউনআইসের পাঁচ মিনিট বুঝি আর ফুরোয় না। 

৩.
সপ্তাহ খানেক হল এক তলার অফিসে ছেড়ে তিন তলার নতুন অফিসে ঠাঁই নিয়েছি। ভালই হয়েছে। কালো স্যুট-স্কার্ট পরা লোকজনের হানা থেকে বেঁচে গেছি। শুধু একটাই সমস্যা। হেলিকপ্টারের শব্দে কানে তালা লাগার যোগাড় হয় প্রায়ই। এই শব্দ মানেই কেউ একজন ভয়ানক অসুস্থ বা মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা। তাকে কোন দূর দূরান্ত থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে হাসপাতালের ছাদে।

এইমাত্র কটকটে হলুদ রঙের আরেকটা হেলিকপ্টার নামছে। এই নিয়ে দিনের তিন নম্বর। জানালা বন্ধ করে হেন্ডফোন কানে লাগিয়ে বসলাম। একটা অনলাইন ক্লাস নিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি অল্প কিছু দিন। নেশাটা রয়ে গেছে। কালেভদ্রে সুযোগ পেলে তাই ছাড়ি না। নানান বিভাগের পিএইচডি ছাত্রদের বাড়তি ক্রেডিটের ক্লাস। করোনাকালের এই নতুন স্বাভাবিকে ছাত্রদের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। তারপরও টানা দেড় ঘন্টা ডিজিটাল প্যাথলজির উপর বকবক করে সময় ভালই উড়িয়ে দেয়া গেল। 

ক্লাস শেষে আমার মুক্তি মিললেও ছেলেমেয়েগুলো চারকোনা স্ক্রিনে বন্দী রয়ে গেল। একটা প্র্যাক্টিকাল আছে। ল্যাব ডেমোন্সট্রেশন। নিচের ডিসেকশন রুমের ছবি ভেসে উঠলো পর্দায়। স্টেইনলেস স্টিলের ধাতব টেবিলে ফুটবলের মত কি যেন রাখা। কৌতূহল জাগলো। লাঞ্চে যাচ্ছিলাম। বাদ দিয়ে আবার বসে পড়লাম। ক্যান্টিনের অখাদ্য একদিন নাই বা খেলাম।

খিদে অবশ্য এমনিতেও মিটে গেল। নিউরো-প্যাথলজির ডক্টর ক্লেয়ার ডেলব্রিজ স্বভাবসুল্ভ অমায়িক হেসে আলতো হাতে যে বস্তুটা তুলে নিয়েছে সেটা দেখছি আস্ত মানুষের ঘিলু! ফর্মালিনে চুবিয়ে রাখায় কিছুটা ইলাস্টিক ভাব চলে এসেছে। ছাত্রদের একজন বনে গিয়ে হাঁ করে দেখতে থাকলাম। ভৌতিক-হরর সিনেমার পর্দা থেকে যেমন চাইলেও চোখ সরানো যায় না, তেমন একটা চুম্বক আকর্ষন কাজ করছে। 

ডক্টর ক্লেয়ার বলে চলছে, ‘বয়স আশি পেরোনো। মৃত্যুর কারন, কোভিড ১৯ সংক্রান্ত জটিলতা। গবেষনার কাজে পরিবারের অনুমতি নিতে মৃতদেহ সংরক্ষন করা হয়েছে। আসো, আমরা এবার পুরো মস্তিষ্ক কেটে দেখাবো...।‘ পরের আধা ঘন্টা ছুড়ি, স্কালপেল আর ফরসেপে চড়ে মানুষের মাথার সেরিবেলাম, সেরিব্রাল কর্টেক্স ইত্যাদি ইত্যাদি যত খোপ-খোপর আছে, গোল গোল হতভম্ব চোখে সব ঘুরে এলাম। টেবিলের ওপর চাক চাক করে কাটা স্লাইসের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। 

‘দেখলে, বয়স কিংবা করোনার আঘাত ছাপিয়েও ঘিলুটা দারুন রকমের অক্ষত রয়ে গেছে।‘ ডক্টর ক্লেয়ারের গলায় সরল উচ্ছ্বাস। ওদিকে, কান্ড দেখে আমার গলা শুকিয়ে গেছে। মাথা তো আমরা কেটেকুটে খতম করে দিলাম। মুন্ডুবিহীন ধড়টা তাহলে কোথায়? রোমহর্ষক চিন্তাটা বাকি দিনের মত খিদে-টিদে একদম ঘুঁচিয়ে দিলো।   

৪.
আরেকদিন। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ফিরে যাবো। ভাবলাম, পেত্রাকে বিদায় বলে যাই। তিনতলায় চলে যাবার পর আলাপ হয় না আর আগের মতন। দেখি, সে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ফোনে কথা বলছে উঁচু গলায়। কি যেন হারিয়ে গেছে। ফোন রেখে দিলে শুধালাম, ‘কি হারালো আবার? কোনো কাজে আসলে বলো না, হাত লাগাই।‘ পেত্রা ফোশ্ করে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, ‘আর বলো না, ডেথ সার্টিফিকেট মিসিং। একটু আগে একজন আত্মহত্যা করেছে। হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল। সার্টিফিকেট সমেত এখন লাশ আরেকখানে যাবে। অপঘাতে মৃত্যু, তাই ময়নাতদন্ত হবে হয়তো। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার পর প্যারামেডিক দেখলো, আরে কাগজ কই? মাত্রই তো চাদরে ঢাকা স্ট্রেচারে রাখা ছিল।’ 

ছোট্ট একটা ভিমড়ি খেলাম শুনে। ওদিকে, পেত্রা রাগে দুঃখে রীতিমত গজগজ করছে, ‘গবেট একটা। পঞ্চাশ বছর বয়স মাত্র। হাতে আরো কত বছর ছিল। কই রিটায়ার করে দেশ-বিদেশ বেড়াবে, তা না ফটাশ্ করে মরতেই হবে...?‘ শুনে টুনে আমি চলেই যেতে পারতাম। কোনো কাজে আসবো না এখানে। কিন্তু কি কারনে যেন যেতে পারছি না। পেত্রার ফোন আসছে একের পর এক। ইতস্তত দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছু একটা শোনার আশায়। ট্রোগারস্ট্রাসের অতি পুরানো প্যাথলজী ভবনের বাইরে বৃষ্টি নেমেছে। এমন দিনে দেখছি মরেও শান্তি নেই।

এদিকে, ডেথ সার্টিফিকেট বাতাসে উড়ে গেল কিনা খোঁজার জন্যে লোকজনের একদল বৃষ্টির ভেতর রাস্তায় নেমেছে। আরেকদল জরুরি বিভাগের কোনা-কাঞ্চি খুঁজছে, যেখানে লোকটাকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছিল। আর তৃতীয় এক দল রোগীর বিছানা-চাদর ধোয়ার যে লন্ড্রী আছে হাসপাতালে, বুদ্ধি করে সেখানে গিয়েছে। 

আরো পাঁচটা ফোন চালাচালির পর পেত্রার ঠোঁটে স্বস্তির হাসি ফুটলো। লন্ড্রীর চাদরের ভাঁজে লুকিয়ে ছিল কাগজগুলো। আমিও হাঁপ ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। 

ট্রেন সেটেশন বরাবর হাঁটছি। হঠাৎ এক তাড়া কাগজ উঁচিয়ে ইউরেকা কায়দায় দু‘জন ছুটে আসতে দেখলাম। অ্যাম্বুলেন্সের কাছে দাঁড়ানো বাকি দু’জন হাতের বিড়ি ছুড়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে গাড়ির দরজা খুলে দিল তাদের জন্যে। সেই সুইসাইড খাওয়া লোকের গাড়ি নয় তো? হালকা উঁকি দেবার আগেই সশব্দে অ্যাম্বুলেন্সের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। প্যাঁ পোঁ বিকট সাইরেন বাজিয়ে গাড়ি ছুটল পংখিরাজের গতিতে। 

কত কি যে ঘটে এই আঠারো নম্বর ট্রোগার স্ট্রিটে। এখানে যা ঘটে, শহরের আর কেউ তা জানে না। সে কাহিনী প্যাথলজি ভবনের দেয়ালে লেখা থাকে চুনকামের কলমে। সাদা চোখে তার কিছুই দেখা যায় না। শুধু কান পাততে হয় খুব সন্তর্পনে। তাহলেই শোনা যায়, প্রার্থনা ঘরের অনুচ্চ ফিসফিস, ডিসেকশন রুমের ছুড়ি-স্কালপেলের সঙ্গত কিংবা কি শোকে মরে যাওয়া বিষন্ন লোকটার অন্তিম ছাড়পত্রের জন্যে অদ্ভূত অপেক্ষা। 

-মিউনিখ, জার্মানি 

পর্তুগালের অলিগলি:৫

১১. ‘এ্যাঁ, হ্যালো, হ্যালো...’। অল্প বয়সী ট্যুর গাইড ছেলেটা মাইক্রোফোন হাতে নড়েচড়ে বসেছে। এতক্ষনে তার অস্তিত্ব জানা গেল। ‘আমরা প্রায় চলে এসে...