Monday, November 23, 2020

পর্তুগালের অলিগলি-১


এলোমেলো কয়েক পাক ঘুরতেই ছোট্ট লিসবন বিমানবন্দরটা ফুরিয়ে গেল। ডিউটি ফ্রি শপে কেনাকাটা করার লোক নই। তারপরও এক-দুইটা পারফিউমের বোতল টিপেটুপে দেখলাম। অতি সুগন্ধে নাক বন্ধ হয়ে আসা ছাড়া আর কোনো লাভই হল না। মাথা ধরিয়ে বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে। আরো ঘন্টাখানেক কি করে কাটাই, চিন্তা লাগছে।  

পর্তুগালের ফ্লাইট বাকিদের আগে এসে পৌঁছেছে। বাকিরা বলতে রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নানান ল্যাবের পিএইচডি ছাত্রছাত্রীরা। মিউনিখ থেকে প্রায় জনা দশেক এসেছি একটা কনফারেন্স ধরতে। সে কনফারেন্স আবার পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে অনেক দূরে। এস্তোরিল বলে কোন আরেক শহরে। ওরা এলে সবাই এক সাথে বাস বা ট্রেনে করে যাবো। তাই অনেকটা সময় হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে মাছি মারছি।

একঘেয়েমি কাটাতে শেষে এক রেস্তোরায় আশ্রয় নিতে হল। বাকি টেবিলগুলোতে অতিথি নেই। একমাত্র কাস্টমারের আগমনে ওয়েটার লোকটা তীরের মত ছুটে এল। তাকে দু’প্লেট সী ফুড আনতে পাঠিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে বসেছি। হেঁশেলে অর্ডার পৌঁছে দিয়ে ওয়েটার দেখছি আবার হাত ভাঁজ করে বিনীত দাঁড়িয়ে। অগত্যা তাকে এবার কোকাকোলার কথা বললাম। আলাদিনের দৈত্যের মত মুহূর্তেই সে বিশাল রূপালি থালায় টেলিস্কোপের মত সরু গ্লাস নিয়ে হাজির। কোক ঢেলে তাতে একটা রঙ্গীন ছাতা বসিয়ে দিল। গ্লাসের খাঁজে এক চাক লেবু বসে গেল খাপে খাপ। কারুকাজ করা কৃস্টালের বাটিতে আবার বরফ কুচিও আছে দেখছি।

আপ্যায়নের বহর দেখে অস্বস্তি লাগছে সামান্য। ‘মোমবাতি জ্বেলে দেই, ম্যাম? একটা মোলায়েম অ্যাট্মোস্ফিয়ার তৈরি হবে। বরফ শীতল পানীয়ে সুরুৎ সুরুৎ টান দিতে দিতে কোনোমতে বললাম,’উহু, ঠিক আছে, ঠিক আছে, ধন্যবাদ।‘ লোকটা এবার দৌড়ে গিয়ে পেল্লায় দু‘টো পেয়ালা নিয়ে এল। খাবার অর্ডারের হুকুম এত দ্রুত তালিম হতে আর কোথাও দেখি নি আগে। যাহোক, মাখনে হুঁটোপুটি খাওয়া চিংড়ি আর মচমচে কালামারির উষ্ণ মাতাল ঘ্রানে অলস সময়টাকে হঠাৎ খুব দরকারী মনে হল। গার্লিক সসে মুড়িয়ে গরমাগরম মুখে চালান দিতেই আবেশে চোখে বুজে এল। সময় কাটানোর এই অলস পন্থাটা নেহাত খারাপ না।

(চলবে)

Monday, November 9, 2020

আঠারো নম্বর ট্রোগার স্ট্রিট


১.

সকালের একটা রুটিন আছে। কাগজের কাপে গরম কফি আর এক টুকরো রুটি কিনতে ক্যাফেটেরিয়ায় হানা দেই। করিডোরের সেন্সর লাগানো দরজটা খুলে যায় নিচ থেকে ওপরে। গ্যারেজের দরজার আদলে। এটা হাসপাতালের ব্যাকডোর। জরুরি বিভাগের ঠিক নিচে। ঢুকলেই সাদা বিছানা চোখে পড়ে। নতুন চাদর পালটে স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে মুড়ে রাখা হয়েছে। পরের কোনো রোগীর অপেক্ষায়। হাসপাতালের বিছানাগুলোকে এক ধরনের পোর্টাল মনে হয়। এ যেন আরেক জগতের প্রবেশপথ। সুস্থতা থেকে জরায় আপনাকে স্বাগতম। রোগ-জরাকে পাশ কাটিয়ে কফির উষ্ণতায় ভর দিয়ে বেরিয়ে আসি। সকালের বিশুদ্ধ বাতাস কেটে অফিস বরাবর হাঁটতে থাকি।

রেখস্ট ডের ইজার। মিউনিখের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির নিজস্ব হাসপাতাল। খুব বেশি দিন হয় নি প্যথলজি বিভাগে কাজ করি। ডাক্তার নই, তবে গবেষক। মলিক্যুলার বায়োলজিস্ট। ক্যান্সারের মত অসুখ নিয়ে কাজ করলেও তাই রোগী আর তাদের বাস্তবতা যথেষ্ট দূরে। অন্তত এতদিন তাই ভাবতাম। কিন্তু ইদানীং প্রায়ই হকচকিয়ে যেতে হচ্ছে।  

সেক্রেটারী পেত্রা আর আমি একই অফিসে বসি। হাসিখুশি অমায়িক মানুষ পেত্রা। আজকে কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে রিভলভিং চেয়ারে গা ডুবিয়ে জাঁকিয়ে বসেছি। চোখে পড়লো পেত্রার টেবিলে মোটা প্লাস্টিকের ব্যাগ স্তুপ করে রাখা। ইমেইল পড়তে পড়তে আলপটকা জানতে চাইলাম, ‘ওগুলো আবার কি, পেত্রা?’। রহস্যময় জবাব এল, ‘এগুলো বডি ব্যাগ। লাশ পুরে চেইন টেনে দেয়া হয়, জিইইইপ্’। শুনে আমার চোয়াল ঝুলে হাঁটুতে নেমে এল। ঘাবড়ানো চেহারা দেখে পেত্রা তাড়াতাড়ি করে ধামা চাপা দেয়ার ভঙ্গিতে বলে বসল, ‘আরে ওগুলো তো অ্যানিমেল ল্যাবের জন্যে। বড় সাইজের শুকর বা কুকুর কাটাকুটির পর মুড়িয়ে নিয়ে যাবে।‘ শুনে সরল মনে বিশ্বাস করে ফেললাম। চোয়াল আবার হাঁটু থেকে জায়গামত ফেরত এল। তবে একটা ব্যাগ নাড়াচাড়া করে মনে হল, আস্ত মানুষও প্যাকেট করে ফেলা যাবে অনায়াসে। 

প্যাকেটে মোড়ানো না হলেও আস্ত মানুষের দেখা মিললও খুব শীগগিরই। তৈরি ছিলাম না ব্যাপারটার জন্যে। এক সকালে খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়াশোনা করছি। দুপুরে একটা পেপার প্রেজেন্টেশন আছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স কাজে লাগিয়ে কিভাবে ক্যান্সার ডায়াগনোসিস করা যায়। নেচার জার্নালে ছাপা হওয়া খটোমটো পেপারটার ‘প’ও বুঝতে পারছি না। তাও দাঁত খিঁচে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। 

এমন সময়ে দরজায় আলতো টোকা। কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে দেখি কালো পোশাকে জনাকয়েক অপরিচিত নারী পুরুষ। তাদের চেহারা বিধ্বস্ত। অল্পবয়সী একটা মেয়ে আবার ফুঁপিয়ে কাঁদছেও। দলের বয়স্ক ভদ্রলোক তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেই রুমালে চোখ মুচছে বারবার। ঘটনা দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। খানিকটা ইতস্তত করে একজন প্রশ্ন করলো, ‘আমাদের আত্মীয় মারা গেছেন গতকালকে। শেষবারের মত দেখতে এসেছি। হাসপাতাল থেকে এই সময়ে আসতে বলেছে । কিন্তু কোথায় যাবো, ঠিক বুঝতে পারছি না। যদি একটু সাহায্য করতেন।‘  

মুশকিলে পড়লাম। এ ধরনের ব্যাপার আমার কাজের ভেতরে পড়ে না। একে ওকে ফোন লাগিয়ে লাভ হল না। কি কারনে যেন পুরোটা দালান খা খা করছে। পেত্রাও নেই আজকে। থাকলে সে-ই সামাল দিত। চট করে মনে পড়লো, আরে নিচে তো একটা ঘর আছে। প্রেয়ার রুম। ওখানে নিয়ে যাই এদের। অফিসের সামনে জটলা না পাকিয়ে সেখানে অপেক্ষা করলেই বরং ভাল। এর ভেতর কাউকে না কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে। 

এক পাল লোকজন নিয়ে মাইনাস টু-তে নেমে এলাম। চাবি ঘুরিয়ে পাল্লা খুলতেই জমে গেলাম মুহূর্তে। এ ঘর তো খালি নয়! শূন্য ঘরের মাঝে স্টিলের ট্রলিতে কে ওটা? চোখ সয়ে আসতেই দেখি শ্বেতশুভ্র কাপড়ে মিশরীয় মমির আদলে বুকে হাত ভাঁজ করে শুয়ে আছে সৌম্য চেহারার কে যেন। নিথর অথচ কি জীবন্ত। এতটাই জীবন্ত যে এই বুঝি ভুর কুঁচকে তাকিয়ে বলবে, ‘শান্তিতে ঘুমাতেও দেবে না দেখছি। আর ঘুমাবোই না, ধুর্’...। দৃশ্যটা একই সাথে সম্মোহনী আবার অসহনীয়। 

কি যে ভূতে ধরলো, লোকজনকে বললাম, ‘ভেতরে একজন আছেন। একবার কি দেখবেন আপনাদের আত্মীয় কিনা?’ উত্তরে চট্ করে উঁকি মেরে দেখে নিলো অল্পবয়সী মেয়েটা। তারপর প্রবল বেগে মাথা নাড়তে থাকলো। আরেক প্রস্থ কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল। ভুল লোকের কাছে  ভুল পার্টি নিয়ে এসেছি তাহলে। মারাত্মক গুবলেট হয়ে গেল দেখছি। রীতিমত বিপন্ন বোধ করলাম। হাঁচড়ে পাঁচড়ে আবার ওপরে উঠে এলাম সাহায্যের আশায়। ওদিকে পিলে টিলে চমকে গিয়ে ফুসফুস-হৃতপিন্ড যে জায়গা অদল বদল করে ফেলেছে, সেদিকে গ্রাহ্য করারও সময় পেলাম না। 

হঠাৎ দেবদূতের মত উদয় হল পরিচিত এক মুখ। তার পরনে পরিস্থিতির সাথে একদম বেমানান রকমের মেঝে ছোঁয়া পান্না সবুজ ইভিনিং গাউন। ‘কি, ওরা নিচে নাকি? বার বার বলেছি আমার সাথে আপয়েন্টমেন্ট নিতে। একটা প্রোটোকল আছে না!’ গজগজ করতে করতে পাঁচ ইঞ্চি উঁচু স্টিলেটো হিলে ঠক্ ঠক্ তুলে নিচে নেমে গেল বছর ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের ফ্রাউ ব্রাউনআইস। তার হাতে সব ছেড়ে ছুড়ে পালিয়ে বাঁচলাম। তবে নিচে দাঁড়ানো লোকজন ভদ্রমহিলার বেশভুষা দেখে ভড়কে না গেলে হয়। 

লাঞ্চের টেবিলে ঘটনা খুলে বলতেই কলিগদের চোখ কপালে উঠল। ‘এরপর থেকে এমন হলেই ফ্রাউ ব্রাউনআইসকে ফোন লাগাবে। তার কাজই হচ্ছে মৃতদেহ সাজিয়ে গুছিয়ে আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখার ব্যবস্থা করা। এর ভেতরে আর মাথা গলিয়ো না। প্রোটোকল ভাঙ্গার ক্যাঁচালে পড়ে যাবে।‘ 

এক মনে শুনে গেলাম কথাগুলো। ফ্রাউ ব্রাউনআইসের পোশাক-রহস্যও বুঝলাম খানিকটা। পাতালঘরের মৃত্যুপুরীতে যার নিত্যদিনের কাজ, তাকে মনে প্রানে বেঁচে থাকতে হলে বর্ম পরে নিতে হয়। আপাদমস্তক ঢাকা জাঁকালো পোশাকগুলো আসলে তার বর্ম। ধূসর মৃত্যুর বনামে দুর্ভেদ্য রঙ্গীন ঢাল।
 
যাহোক, এক ঢোকে প্লেটের খাবার গিলে দারুন এক শিক্ষা নিয়ে ফিরে এলাম অফিসে। শিক্ষাটা হল, আঠারো নম্বর ট্রোগার স্ট্রিটের এই দালানে জীবিতদের সমান্তরালে নীরবে নিভৃতে মৃতরাও বাস করে। যেখানটায় বসে আছি, তার ঠিক দুই তলা নিচেই হাত ভাঁজ করে কেউ একজন শুয়ে আছে প্রিয়জনদের শেষ দেখার আশায়। সে বেলার মত কাজে মন বসানো দায় হয়ে গেল। 

২.
তারপর কেটে গেছে বেশ কয়েক মাস। ঢাকনি চাপানো লম্বা ট্রলিগুলো দেখে আর ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের ট্রলি ভেবে ভুল করি না। এই গাড়িতে চেপে হাসপাতাল-টু-মর্গ আর মর্গ-টু-প্রেয়ার রুমে চুপচাপ কাদের যাওয়া-আসা, সেটাও জেনে গেছি এতদিনে। মোট কথা, মোটা দাগের একটা নির্বিকার ভাব চলে এসেছে। 

এক মাঝ দুপুরে সেই নির্বিকারত্ব জলে ভেসে গেল। সিড়ি ভাঙবো না বলে আলসেমি করে লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। চার তলায় কাজ আছে একটা। এমন সময়ে এক ভদ্রলোক পায়ে পায়ে এগিয়ে এলেন। ‘অমুক নম্বর রুমটা কোথায় বলতে পারেন?’ চট্ করে হাত চলে গেল ফোনে। ফ্রাউ ব্রাউনআইস কেস। ওপাশ থেকে জবাব এল, ‘রিসেপশনে বসতে বলবে একটু? এক্ষুনি আসছি। পাঁচ মিনিট, ওকে?’

একই কথা আবার তোতাপাখির মত আউড়ে লিফটের বোতাম চাপলাম। ভদ্রলোক বাধ্য ছেলের মত সোফার এক কোনে বসে পড়লো। বয়স চল্লিশ কি বেয়াল্লিশ। ছ’ফুটের ওপরে সুপুরুষ চেহারা। মাথা ঝুঁকিয়ে বসায় কোঁকড়ানো চুল কপাল বেয়ে নেমে পড়েছে। কোলের ওপর বাদামী লেদার ব্যাগ। কি ভেবে ব্যাগটার দিকে তাকালাম। যেনতেন ভাবে কাপড় ঠেসে জোর করে চেইন টেনে দিয়েছে কেউ যেন। অলক্ষ্যে এক টুকরো স্কার্ফ বেরিয়ে পড়েছে। তাতে বেগুনি রঙ্গে হালকা ফুলেল ছোপ। 

‘আমার ওয়াইফের ব্যাগ। হাসপাতাল থেকে ফেরত দিল।‘ অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম। কিন্তু জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নামাতে গিয়ে জিজ্ঞাসা যেন আরো বেড়ে গেল। লোকটা বুঝতে পেরে বলেই চললো, ‘ওকেই আরেকবার দেখতে এসেছি।‘ এই দেখতে আসার কারন বুঝিয়ে বলতে হয় না আমাকে। 

বেগুনি স্কার্ফ হাতের মুঠোয় উঠে এসেছে লোকটার। তাকে কূলহারা নিঃস্বের মত লাগছে। অস্ফুট একটা স্বরে চারপাশটা ভারি হয়ে উঠছে ক্রমশ। আশেপাশে লোকজন যে যার মত আসছে-যাচ্ছে; রুটিন কাজের ফাঁকে ডানে বামে ভ্রূক্ষেপ নেই কারো। শুধু আমিই যেন অচল দাঁড়িয়ে রইলাম। ফ্রাউ ব্রাউনআইসের পাঁচ মিনিট বুঝি আর ফুরোয় না। 

৩.
সপ্তাহ খানেক হল এক তলার অফিসে ছেড়ে তিন তলার নতুন অফিসে ঠাঁই নিয়েছি। ভালই হয়েছে। কালো স্যুট-স্কার্ট পরা লোকজনের হানা থেকে বেঁচে গেছি। শুধু একটাই সমস্যা। হেলিকপ্টারের শব্দে কানে তালা লাগার যোগাড় হয় প্রায়ই। এই শব্দ মানেই কেউ একজন ভয়ানক অসুস্থ বা মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা। তাকে কোন দূর দূরান্ত থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে হাসপাতালের ছাদে।

এইমাত্র কটকটে হলুদ রঙের আরেকটা হেলিকপ্টার নামছে। এই নিয়ে দিনের তিন নম্বর। জানালা বন্ধ করে হেন্ডফোন কানে লাগিয়ে বসলাম। একটা অনলাইন ক্লাস নিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি অল্প কিছু দিন। নেশাটা রয়ে গেছে। কালেভদ্রে সুযোগ পেলে তাই ছাড়ি না। নানান বিভাগের পিএইচডি ছাত্রদের বাড়তি ক্রেডিটের ক্লাস। করোনাকালের এই নতুন স্বাভাবিকে ছাত্রদের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। তারপরও টানা দেড় ঘন্টা ডিজিটাল প্যাথলজির উপর বকবক করে সময় ভালই উড়িয়ে দেয়া গেল। 

ক্লাস শেষে আমার মুক্তি মিললেও ছেলেমেয়েগুলো চারকোনা স্ক্রিনে বন্দী রয়ে গেল। একটা প্র্যাক্টিকাল আছে। ল্যাব ডেমোন্সট্রেশন। নিচের ডিসেকশন রুমের ছবি ভেসে উঠলো পর্দায়। স্টেইনলেস স্টিলের ধাতব টেবিলে ফুটবলের মত কি যেন রাখা। কৌতূহল জাগলো। লাঞ্চে যাচ্ছিলাম। বাদ দিয়ে আবার বসে পড়লাম। ক্যান্টিনের অখাদ্য একদিন নাই বা খেলাম।

খিদে অবশ্য এমনিতেও মিটে গেল। নিউরো-প্যাথলজির ডক্টর ক্লেয়ার ডেলব্রিজ স্বভাবসুল্ভ অমায়িক হেসে আলতো হাতে যে বস্তুটা তুলে নিয়েছে সেটা দেখছি আস্ত মানুষের ঘিলু! ফর্মালিনে চুবিয়ে রাখায় কিছুটা ইলাস্টিক ভাব চলে এসেছে। ছাত্রদের একজন বনে গিয়ে হাঁ করে দেখতে থাকলাম। ভৌতিক-হরর সিনেমার পর্দা থেকে যেমন চাইলেও চোখ সরানো যায় না, তেমন একটা চুম্বক আকর্ষন কাজ করছে। 

ডক্টর ক্লেয়ার বলে চলছে, ‘বয়স আশি পেরোনো। মৃত্যুর কারন, কোভিড ১৯ সংক্রান্ত জটিলতা। গবেষনার কাজে পরিবারের অনুমতি নিতে মৃতদেহ সংরক্ষন করা হয়েছে। আসো, আমরা এবার পুরো মস্তিষ্ক কেটে দেখাবো...।‘ পরের আধা ঘন্টা ছুড়ি, স্কালপেল আর ফরসেপে চড়ে মানুষের মাথার সেরিবেলাম, সেরিব্রাল কর্টেক্স ইত্যাদি ইত্যাদি যত খোপ-খোপর আছে, গোল গোল হতভম্ব চোখে সব ঘুরে এলাম। টেবিলের ওপর চাক চাক করে কাটা স্লাইসের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। 

‘দেখলে, বয়স কিংবা করোনার আঘাত ছাপিয়েও ঘিলুটা দারুন রকমের অক্ষত রয়ে গেছে।‘ ডক্টর ক্লেয়ারের গলায় সরল উচ্ছ্বাস। ওদিকে, কান্ড দেখে আমার গলা শুকিয়ে গেছে। মাথা তো আমরা কেটেকুটে খতম করে দিলাম। মুন্ডুবিহীন ধড়টা তাহলে কোথায়? রোমহর্ষক চিন্তাটা বাকি দিনের মত খিদে-টিদে একদম ঘুঁচিয়ে দিলো।   

৪.
আরেকদিন। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ফিরে যাবো। ভাবলাম, পেত্রাকে বিদায় বলে যাই। তিনতলায় চলে যাবার পর আলাপ হয় না আর আগের মতন। দেখি, সে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ফোনে কথা বলছে উঁচু গলায়। কি যেন হারিয়ে গেছে। ফোন রেখে দিলে শুধালাম, ‘কি হারালো আবার? কোনো কাজে আসলে বলো না, হাত লাগাই।‘ পেত্রা ফোশ্ করে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, ‘আর বলো না, ডেথ সার্টিফিকেট মিসিং। একটু আগে একজন আত্মহত্যা করেছে। হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল। সার্টিফিকেট সমেত এখন লাশ আরেকখানে যাবে। অপঘাতে মৃত্যু, তাই ময়নাতদন্ত হবে হয়তো। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার পর প্যারামেডিক দেখলো, আরে কাগজ কই? মাত্রই তো চাদরে ঢাকা স্ট্রেচারে রাখা ছিল।’ 

ছোট্ট একটা ভিমড়ি খেলাম শুনে। ওদিকে, পেত্রা রাগে দুঃখে রীতিমত গজগজ করছে, ‘গবেট একটা। পঞ্চাশ বছর বয়স মাত্র। হাতে আরো কত বছর ছিল। কই রিটায়ার করে দেশ-বিদেশ বেড়াবে, তা না ফটাশ্ করে মরতেই হবে...?‘ শুনে টুনে আমি চলেই যেতে পারতাম। কোনো কাজে আসবো না এখানে। কিন্তু কি কারনে যেন যেতে পারছি না। পেত্রার ফোন আসছে একের পর এক। ইতস্তত দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছু একটা শোনার আশায়। ট্রোগারস্ট্রাসের অতি পুরানো প্যাথলজী ভবনের বাইরে বৃষ্টি নেমেছে। এমন দিনে দেখছি মরেও শান্তি নেই।

এদিকে, ডেথ সার্টিফিকেট বাতাসে উড়ে গেল কিনা খোঁজার জন্যে লোকজনের একদল বৃষ্টির ভেতর রাস্তায় নেমেছে। আরেকদল জরুরি বিভাগের কোনা-কাঞ্চি খুঁজছে, যেখানে লোকটাকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছিল। আর তৃতীয় এক দল রোগীর বিছানা-চাদর ধোয়ার যে লন্ড্রী আছে হাসপাতালে, বুদ্ধি করে সেখানে গিয়েছে। 

আরো পাঁচটা ফোন চালাচালির পর পেত্রার ঠোঁটে স্বস্তির হাসি ফুটলো। লন্ড্রীর চাদরের ভাঁজে লুকিয়ে ছিল কাগজগুলো। আমিও হাঁপ ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। 

ট্রেন সেটেশন বরাবর হাঁটছি। হঠাৎ এক তাড়া কাগজ উঁচিয়ে ইউরেকা কায়দায় দু‘জন ছুটে আসতে দেখলাম। অ্যাম্বুলেন্সের কাছে দাঁড়ানো বাকি দু’জন হাতের বিড়ি ছুড়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে গাড়ির দরজা খুলে দিল তাদের জন্যে। সেই সুইসাইড খাওয়া লোকের গাড়ি নয় তো? হালকা উঁকি দেবার আগেই সশব্দে অ্যাম্বুলেন্সের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। প্যাঁ পোঁ বিকট সাইরেন বাজিয়ে গাড়ি ছুটল পংখিরাজের গতিতে। 

কত কি যে ঘটে এই আঠারো নম্বর ট্রোগার স্ট্রিটে। এখানে যা ঘটে, শহরের আর কেউ তা জানে না। সে কাহিনী প্যাথলজি ভবনের দেয়ালে লেখা থাকে চুনকামের কলমে। সাদা চোখে তার কিছুই দেখা যায় না। শুধু কান পাততে হয় খুব সন্তর্পনে। তাহলেই শোনা যায়, প্রার্থনা ঘরের অনুচ্চ ফিসফিস, ডিসেকশন রুমের ছুড়ি-স্কালপেলের সঙ্গত কিংবা কি শোকে মরে যাওয়া বিষন্ন লোকটার অন্তিম ছাড়পত্রের জন্যে অদ্ভূত অপেক্ষা। 

-মিউনিখ, জার্মানি 

Saturday, September 19, 2020

লেডিস ডে আউট


১.
আজকে লেডিস ডে আউট তবে সাথে ফেউ জুটে গেছে ছাও পাও ঘরে রেখে আসা যায় নি তারা যথারীতি ট্রেন কাঁপিয়ে ফেলেছে তাও ভাল, কামরার এদিকটায় লোকজন কম দুই সিট পেছনে শুধু দুই তরুন বসে আছে তারাও জোরসে গান ছেড়ে চুক্ চুক্ করে বিয়ার টানছে হল্লাহাটির অভাব নেই এর মাঝেই আমরা জন বঙ্গ ললনা আধবোজা চোখে আধ-গরম সমুচা চিবোচ্ছি

গরমের এই সময়টায় কিন্ডারগার্টেন-স্কুল ছুটি থাকে তার সাথে মিলিয়ে দিন কতক ছুটি নিতে হয়েছে সময়টা শুয়ে বসে কাটিয়ে দেবো-এই ছিল আলসে ফন্দি। সে ফন্দির ফানুস পিন দিয়ে ফুটিয়ে আমাকে টেনে বের করা হয়েছে ভুলিয়ে ভালিয়ে এমন ঝটিকা সফরের আয়োজন খুব পাকা হাতের কাজ মুখোমুখি সিটে গা এলিয়ে বসে মৌরি আপুর মুখে বিজয়ীর হাসিকি, কেমন লাগছে?’ ঠান্ডা কমলার জুসে চুমুক দিতে দিতে একান ওকান হেসে উত্তরটা দেয়া হয়ে গেল পথে যেতে যেতে সমুচা-সিঙ্গারা, অদেখা শহরতলির অলিগলিতে এলোমেলো হেঁটে বেড়ানো, লেকের পাড়ে পিকনিক, ব্যাস-আর কিছু বলতে হয় নি হাতের কাছে জামা-জুতো যা পেয়েছি, হাতে-পায়ে গলিয়ে এক ছুটে এই বব গাড়ি ধরেছি

বব গাড়িই তো ট্রেনের গায়ে বড় বড় করে লেখা আছে, BOB বায়েরিশা ওবারল্যান্ডবান-এর সংক্ষেপ। জার্মান ঢং আর এমন কি, শুনেছি সুইস রঙ নাকি আরেক কাঠি সরেস তাদের কোন এক ট্রেন সার্ভিসের নাম, ফ্লার্ট খটমটে বারো হাত নাম ‘Fast Light Inter-city & Regional Train’। ছোট্ট হয়ে গিয়ে দারুন দুষ্ট FLIRT হয়ে গেছে অমন ট্রেনে চেপে কাজ নেই তার চেয়ে বব ভাইয়াই ভাল

শহরের দালানকোঠাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ট্রেন ছুটে চলছে সারি সারি ভুট্টা ক্ষেতের মাঝ দিয়ে এমন ঘন ক্ষেতের আড়ালে অনায়াসে এক আধটা ইউএফও লুকিয়ে থাকতে পারে হঠাৎ কচু পাতা রঙের কোনো হ্যান্ডসাম এলিয়েনের দেখা পেলে মন্দ হত না আজকে লেডিস ডে বলে কথা ঝাড়া হাত-পা হা করে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছি দেখে তুনা প্রশ্ন ছুড়লো, ‘আপু বোধহয় খুব একটা বেড়াতে বের হন না?’ এলিয়েন খোঁজা বাদ দিয়ে অল্পবয়সী বাচ্চা মেয়েটার দিকে তাকালাম
 
হালকা পাতলা ছিপছিপে তুনাকে দেখে বুয়েট পাশ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মনেই হয় না তার সাথে ইদানীং যোগ হয়েছে একটা জার্মান এম.এস. আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই পিএইচডি পাশ ফ্রাউ ডক্টর মৌরি আপু যোগ করলো, ‘ওর আসলেদেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়াঅবস্থা যে দেশে বাস, সেটাই দেখা হয় নিব্যাপারটা মাথা নেড়ে সলজ্জে স্বীকার করতেই হল কড়ে গুনলে প্রায় বছর আষ্টেক আছি এই প্রবাসে কিন্তু জার্মানি বলতে ঐ মিউনিখই বুঝি কুয়ার ব্যাঙ যাকে বলে তবে ব্যাঙটা আজকে এই বিদ্যাবতী বিদুষীদের সাথে ঘুরে ঘুরে মানুষ হবার একটা ট্রাই মেরে দেখবে   


 ২.
গল্পে আড্ডায় সময় কর্পূরের মত উধাও মাঠ-ঘাট, পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পাতার ফাঁকে নীল জল ঝিলিক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে ট্রেন এসে অবশেষে থামলো টেগের্নসী স্টেশনে নামের সাথেসীথাকা মানেই এখানে একটা লেক আছে ইংরেজিতে যাহাই লেক, জার্মানে তাহাইসী সমতল থেকে প্রায় সাড়ে সাতশো মিটার উঁচুতে বাভারিয়ান আলপ্স ঘেরা টেগের্নসী নাকি জার্মানির টপ টেন লিস্টে থাকা লেক আজকে তাহলে সৌন্দর্য পরীক্ষা হয়ে যাক সত্য হলে আরে ওয়াহ্, ওয়াহ্বলে খৈয়াম কিংবা গালীবের রোমান্টিক দুএকটা শের-শায়েরী ঝেড়ে দেবো আর মিথ্যে হলে লেক পাড়ের কোনো গাছের ডাল ভেঙ্গে রেখে যাব বহুত খতরনাক লোক আমরা
 
বাচ্চাওয়ালা ভদ্রমহিলা বলতেই যে সাদাকালো ম্যাট্ম্যাটে ছবিটা ভেসে ওঠে, সেটাকে দুআঙ্গুলে টশকে দিয়ে বাচ্চা আর ভদ্রমহিলা আমরা ট্রেনের উঁচু সিড়ি টপকে লাফিয়ে নেমে মাঝ দুপুরের কড়া রোদকে বাঁকা হেসে কোমরে হাত রেখে দাঁড়ালাম আমাদের চৌকস ল্যান্ডিং দেখে আরো দশ সেকেন্ড আগে নেমে পড়া টগবগে তরুনী তুনাকুমারী খাপখোলা সামুরাই সোর্ডের মত ঝনঝনিয়ে হাসছে 
 
প্রথমেই লেক-টেকের তোয়াক্কা না করে ঘষামাজা সাইনবোর্ড ঝোলানো দুই নম্বরি চেহারার এক চাইনিজ রেস্তোরাঁ বরাবর পা চালালাম ক্ষুধাই আসল বেড়ানো নকল সৌন্দর্য গিলে কবে কার পেট ভরেছে ঠিক মনে পড়ছে না তবে স্টির ফ্রাই ভেজিটেবল উইথ স্টিমড রাইস খেলে পেট, মন দুটোই যে সমান তালে ভরবে, তা কি আর বলে দিতে হয় সয়া সস ছিটিয়ে সাদা ভাত কালো করে দিতে দিতে আলাপ এগোতে থাকলোঠিক হল, ছক বেঁধে কিছু করা যাবে না। যেদিকে দু’চোখ যায় সেদিকে হাঁটবো ঘুরঘুর লাটিম লাটিম একটা দিন আর, পা বাড়ালে পথ নাকি আপনা থেকেই তৈরি হয়ে যায়।
 
বিল চুকিয়ে শুরু হল আমাদের দিগ্বিদিক হন্টন। এই খেয়ালখুশির এলোমেলো হাঁটাকে অবশ্য পাঁচ মিনিটে লাইনে নিয়ে আসলো মৌরি আপু। সে আজকের রাখাল। বার দুই দাবড়ানি খেয়ে ভেড়ার পাল আমরা রীতিমত রাস্তার নাম ধরে ধরে এগোচ্ছি। কোথায় গেলে কতক্ষনে যে একটু জাবর কাটার অবসর মিলবে, কে জানে। আয়েশী চিন্তাটার সাথে দুপুরের রোদটা মিশে গিয়ে আরামদায়ক আবেশে চোখ বুজিয়ে দিতে চাইছে।
 

৩.
পথটা নেহাৎ কম না। একঘেয়েমি লাগছে না যদিও। পথের ধারে বাহারি বাড়িগুলো দেখার মতএগুলো ছোট ছোট গেস্টহাউস। কাঠের দেয়ালগুলোতে হোটেল হোটেল কমার্শিয়াল গন্ধ নেইতার বদলে আছে বারান্দা উপচে পড়া ফুলের সুবাস। ফুলের থোকাগুলো যেন বাড়ির মালিকের রুচির সার্টিফিকেট হয়ে ঝুলে আছে ব্যালকনির ফোঁকর গলে। কোথাও বারান্দার এধার থেকে ওধার জুড়ে শুধুই রক্ত লাল গোলাপ কোনো বা বাড়ির ফুল হালকা গোলাপি থেকে গাঢ় হতে হতে বেগুনি বনে গিয়ে একেবারে লতিয়ে সদর দরজায়ে নেমে এসেছে। এমন জায়গায় দিন দুই কাটাতে পারলে জব্বর হতো কিন্তু।
  
উঁচু নিচু পাহাড়ি রাস্তায় এখন রীতিমত হাঁপ ধরে যাচ্ছে। আরেকটু এগোলেই নাকি পৌঁছে যাব। মৌরি আপুর মন ভুলানো কথাও হতে পারে। তাও সরল মনে পা চালিয়ে যাচ্ছি। খানিক বাদেই  বামের অদ্ভূত পথটা দেখে থামতে হলো। ঢালু হয়ে নেমে কই যে মিশেছে, বোঝার উপায় নেইদু’পাশে নেই বাড়িঘর, নেই গাড়িঘোড়াশুধু গাছগাছালি। সবুজ ডিঙ্গিয়ে চোখ চলে যায় দূরের পাহাড়চূড়ার মরীচিকায় যেন হাত বাড়ালেই নাগাল মিলবেকোত্থেকে হঠাৎ এক বুনো বাদামী খরগোশ লাফিয়ে উঠে মিলিয়ে গেল। কৌতূহলে এগিয়ে গেলাম এক পা যাবো নাকি এই পথে? হারিয়ে যাবার হাতছানিটা মায়াবী সুরে ডাকছে ‘আয় আয়’। ওদিকে বাকিরাও যে ডাকছে খুব। নাহ্, হাতছানিটা ফিরিয়ে দিতে হলখরগোশের পিছু নেয়া আর হল না।
 

৪.
কাঠের সাঁকো এঁকেবেঁকে চলে গেছে লেকের পাড় ঘেঁষে। ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তুলে চলছি। স্বচ্ছ জলে এক আধটা মাছ উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। মনের ভেতরের বড়শিটাও তৈরি হতে চাইছে টোপ লাগিয়ে। ভাজা মাছের মচমচে ঘ্রান কল্পনা করে নিতে একটুও বেগ পেতে হল না। পানির বাতাস খিদে চাগিয়ে দিতে দারুন ওস্তাদ
 
চারিদিকে শুধু পাহাড় আর পর্বততারই ঠিক মাঝখানে কাক চক্ষু জল টেগের্নসী। আকাশের আঙ্গিনায় ঘাসফুল মেঘ এখানে ওখানে ছন্নছাড়া ভবঘুরের মত ভেসে বেড়াচ্ছে। ছোট্ট ফেরি যাত্রী নিয়ে খুব ধীরে এগোচ্ছে। কারোই কোনো তাড়া নেই। তবে আজকে বাতাসের খুব তাড়া। জলে ঢেউ ভাঙ্গিয়ে ছাড়ছে সাগরের আদলে। উইন্ডসার্ফিং করতে আসা লোকজনের পোয়াবারো। বাতাস ফুড়ে উজ্জ্বল লাল-নীল পাল উড়িয়ে ছুটছে তারা। টেগের্নসী জায়গাটা আসলেই সুন্দর।
 
আলো ছায়া লুকোচুরি খেলছে, এমন জায়গা খুঁজে চাদর বিছিয়ে বসে পড়লামসাথে সাথে শক্তিশালী আলসেমিটা ছেঁকে ধরলো। মনে হল, বনবন্ না ঘুরে আজকের দিন শুয়ে বসে এখানেই গড়িয়ে দেই নামাথার ওপর চড়া সূর্যটাও যেন সায় দিয়ে বললো, ‘চিল ম্যান, চিল। এই রোদ্দুরে ঘুরে কাজ নেই।‘ মাঝ দুপুরের রোদকে ‘কুল ডুড’ মেনে তার উপদেশ মাথা পেতে নিলাম 
 
জায়গাটা নিরিবিলি। যদিও লোকজন একেবারে কম না। পাশেই এক বিকিনি সুন্দরী ফিতাবিহীন পিঠ মেলে রোদ পোহাচ্ছেতার হাতে মেলে ধরা কোনো পেপারব্যাক এমন ভঙ্গিমায় পড়লে ছাইপাশ র‍্যান্ডম বইও পাঠক টানতে বাধ্য। ঘটছেও তাই। কতগুলো বছর আঠারো-বিশের ছেলে-ছোকরা কাছেই তাস পেটাচ্ছে আর অস্থির চোখ তুলে বইয়ের নাম পড়তে চাইছে। কি আর করা, বয়সটাই যে জ্ঞান আহরনের।

 
.
ব্যাগ থেকে এক বাক্স আঙ্গুর উঁকি দিচ্ছে ভরপেট থাকায় সেটা কারো নেক নজরে পড়লো না বাক্সটা কাছে টেনে নিলাম আলপটকা গাছের সুশীতল মৃদুমন্দ ছায়ায় কাৎ হয়ে শুয়ে একটা একটা করে আঙ্গুর মুখে পুরে দেবার মাঝে বেশ একটা আভিজাত্য টের পাচ্ছি। নিজেকে হঠাৎ টেগের্নসীর সুলতানা ভাবতে ইচ্ছে করছে। মনে মনে অত্র অঞ্চলকে মুলক্--টেগের্নসী ঘোষনা করলাম এত বড় সালতানাত চালানো সহজ কথা নয় পরিশ্রমের কাজ প্রচুর আঙ্গুর খেতে হয় দ্রুত চোয়াল চালাতে থাকলাম
 
টলটলে পানির হাতছানি উপেক্ষা করা মুশকিল। মৌরি আপু আর তুনা গিয়ে দু’টো ঝপাং ডুব দিয়ে এসে হি হি করে কাঁপছে। কোন ফাঁকে যে গুনগুনিয়ে ভ্রমর এসে হাজির কেউ টের পেলাম না। তবে মানুষের তৃতীয় নয়নটা বোধহয় মাথার ঠিক পেছনে থাকে। তাতে ধরা পড়ে গেল কেউ একজন ড্যাবড্যাবিয়ে এদিকেই চেয়ে আছে ঘাড় ঘোরাতেই তামিল চেহারার কালপ্রিট ধরা পড়ে গেল। লেকময় সাদা চামড়ার অমল ধবল রমনীদের জলকেলি রেখে আধভেজা ফতুয়া-তোয়ালে জড়ানো জবুথবু বঙ্গ ললনায় মজে যাবার কারন কি, ঠিক বোঝা গেল না। তামিলদের দক্ষিনে কি দুর্ভিক্ষ চলছে নাকি। কোথাও তো পড়ি নি যে, ‘চেন্নাই শহরে নারীদের সংখ্যা আশংকাজনক হারে কমে যাচ্ছেতামিল পুরুষরা দক্ষিন ছেড়ে উত্তরের বঙ্গ ললনার সন্ধানে দলে দলে দেশে ছাড়ছে। তাদের অবস্থা ‘যেইখানে পাইবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই’ ধরনের শোচনীয়...ইত্যাদি’  
 
এই পাজি রজনীকান্তের কি মা-বউ কেউ নেই নাকি ভেবে চারিদিক রেকি করতেই লোকটার পাশ থেকে মোচওয়ালা এক তাগড়া মহিলা খুনে চাহনি হানলো। বাবারে, কাজ নেই আর অভিযোগ জানিয়ে সাক্ষাৎ বউয়ের পারমিশন নিয়ে ‘মিশন ড্যাবড্যাব’-এ নেমেছে এই তামিল হিরো তাকে থামায় সাধ্যি কার। অতএব আমরাই পাততাড়ি গুটিয়ে কেটে পড়লাম।     
 
অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায়ে যায়-কথাটার ভেতর ঘাপলা আছে। নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে উল্টো রসের সমুদ্দুরে এসে পড়েছি। এক যুগল খুবসে ভাব বিনিময় চালিয়ে যাচ্ছে। একটু আগে যে ক’টা আঙ্গুর খেয়েছি এই নর-নারী পাঁচ মিনিটেই তার চেয়ে বেশি চুমু খেয়ে ফেলেছে তারপর, আচমকাই চুমুবিদ্যার সর্ব-ইউরোপীয় কেতা বাদ দিয়ে বিশেষায়িত ফ্রেঞ্চ কায়দার দিকে ঝুঁকে পড়ল দু’জন তিন হাত দূরের এই লাইভ দৃশ্য তো আর টিভি পর্দার এইচবিও নয় যে রিমোট চেপে বিবিসি, সিএনএন এর জলবায়ু বিষয়ক খবরে লাফ দেবো। তাই দুর্বল হৃৎপিন্ড চেপে লেকের পাড়ে পালিয়ে এলাম লাফিয়ে। ছায়াবিথী তলে শুয়ে দু’লাইন কবিতাও চলে এসেছিল মাথায়। নটঘট তান্ডবে সেটুকুও গেল
 

.
আঠালো জুটির ফরাসী ক্লাইমেক্সের খপ্পর থেকে বেরিয়ে ভালই হয়েছে। ইচ্ছেমত পানিতে নুড়ি ছুড়ে তোলপাড় ফেলে দিচ্ছি। একটা যুক্তিহীন আনন্দ কাজ করছে। মনের শিশু কিভাবে যেন ছাড়া পেয়ে বেরিয়ে এসেছে। এগিয়ে এসে তার সাথে জুটেছে দু’টো আসল শিশু। আর আমাদের পায় কেচিৎকার-চ্যাঁচামেচিতে এলাকা কাঁপিয়ে ফেলেছি পাথর ছোড়া ব্যাপারটা দেখলাম বেশ থেরাপিউটিক। শহুরে শ্রান্তি পাথরে পেঁচিয়ে ছুড়ে মারলে তারা দেখছি উধাও যাচ্ছে পটাপটক্লান্তি জেঁকে ধরা না পর্যন্ত চলল বিনে পয়সার থেরাপি পর্ব।  
 
তারপর ক্লান্তিটা ক্যাঁক করে চেপে ধরার সাথে সাথে নুড়ি খেলায় ইস্তফা দিয়ে ধপ্ করে বসে পড়লাম ঘাসে। মৌরি আপু আর তুনা ততক্ষনে রোদে শুকিয়ে খটখট। তারা প্রস্তাব তুললো, এক দফা গানের কলি খেলা যাক প্রস্তাব শুনে মাঝারি সাইজের ঢোক গিললাম। দুইজনেরই গানের সাথে ওঠাবসা আছে বেশ। কিন্তু এই শর্মা তাতে যোগ দিলে গান আর সঙ্গীত থাকবে না। ইমোশোনাল অত্যাচারে গিয়ে ঠেকবে। শিল্পের এই কলায় আমি একদম কাঁচকলাদেখা গেল, এমন গান গাইলাম যে বিকিনি সুন্দরী পিঠের ফিতা না বেঁধেই পালিয়ে গেল, ছোকরাগুলোও তাস ফেলে ছুটলো তার পিছু পিছু। আর লোলুপ রজনীকান্ত তার রমনীদর্শন বাদ দিয়ে কান চেপে দৌড় লাগালোরাসলীলায় ব্যস্ত যুগলও রাগে দুঃখে বিলা হয়ে রওনা দিল আরেক দিক
 
এত অঘটনের সাক্ষী হতে পারবো না। তাই স্রেফ শ্রোতা বনে বাকিদের উৎসাহ দিয়ে অনুরোধের আসর শুরু করে দিলাম। জোর বাতাসের তোড়ে ঢেউ ভাঙ্গা টেগের্নসীর পাড়ে খুব জমে উঠলো ‘ওরে নীল দরিয়া’ তারপরের গানগুলো কিভাবে যেন আরো ব্যাক গিয়ার দিয়ে কয়েক দশক পিছিয়ে উত্তম-সুচিত্রার যুগে ঘুরে গেল। হেমন্তের ‘এই পথ যদি না শেষ হয়‘ দিয়ে শুরু করে কিশোরকুমার ছুঁয়ে, শেষে সন্ধ্যা নামিয়ে দিলাম সন্ধ্যা মুখার্জিতেএ শুধু গানের দিন, এ লগন গান শোনাবার...। বাংলা ভাষা আসলে শার্টের বুকপকেটের মত। গায়ে চাপিয়ে যতদূরেই যাই না কেন, সুর হয়ে সে থেকে যায় বুকের ভেতর।    
 

হেলে পড়া সূর্যটার তাড়ায় লটবহর গুছিয়ে অনেকখানি পা চালিয়ে বব গাড়ি ধরেছি আবার। বাচ্চারাও পুরানো মেজাজে ফিরে গেছে। গলা সপ্তকে চড়িয়ে শেয়ালের হুক্কা হুয়া তান ধরেছে তারা। ট্রেনের শেষ মাথা থেকে আরো কতগুলো শেয়ালের ছাও একই রবে তাদের অস্তিত্ব জানান দিল। এটা তাদের নিজস্ব মোর্স কোড বাকি পথ এই টরে টক্কা সিগনাল চালাচালির মাঝে বসে যেতে হবে ভেবেই মাথা ধরে গেল চিং করে।  
 
সব কিছু উপেক্ষা করে চোখ বুজে গা এলিয়ে দিলাম। টেগের্নসীময় টই টই না ঘুরেও মন আজকে তৃপ্তিতে টইটুম্বুর। কাছেপিঠে কোথাও বেরিয়ে পড়ে পাটি বিছিয়ে আকাশ দেখাটাও দেখছি একধরনের ভ্রমন। কে জানতো, দুই পয়সার বাজেট ঘোরাঘুরিতেও যে দশ পয়সার আনন্দ আর রোমাঞ্চ মিলতে পারেএই না হলে ইকোনমিক লেডিস বুদ্ধি!
 
নতুন একটা ফন্দি উঁকি দিল হঠাৎমিউনিখের বাঙালি প্রমীলা সমাজকে এক করে একটা ক্লাব খুলে ফেললে কেমন হয়। ক্লাবের নাম হবে, ‘লেডিস স্যু ক্লাব’। মাঝে মাঝেই আমরা দল বেঁধে এক-আধ বেলার ঝটিকা সফরে চলে যাবো। আর দিন শেষে সব ক’জোড়া জুতো নানান ঢঙে জড়ো করে অ্যাস্থেটিক এক ফটো খিঁচে বাড়ি ফিরে আসবো। সম্ভাব্য আরেকটা মিনি ভ্রমনের প্রস্তাব তুলে আমরা লেডিস স্যু ক্লাবের প্রথম সদস্যরা আলাপে মশগুল হয়ে পড়লাম। শিশুদের হুক্কা হুয়া ছাপিয়ে আমাদের গল্প আড্ডা আর হাসিতে বব গাড়ির কামরা তরল হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে(সমাপ্ত)
 


মিউনিখ, জার্মানি
সেপ্টেম্বর, ২০২০

পর্তুগালের অলিগলি-১

১ এলোমেলো কয়েক পাক ঘুরতেই ছোট্ট লিসবন বিমানবন্দরটা ফুরিয়ে গেল। ডিউটি ফ্রি শপে কেনাকাটা করার লোক নই। তারপরও এক-দুইটা পারফিউমের বোতল টিপেটুপে ...