Wednesday, August 28, 2019

মিউনিখের তপোবনে

মিউনিখ (গুগল থেকে)


বাইরে মিউনিখের মেঘলা দিন। যত্ন করে সাজানো গোছানো এই শহরটা সুন্দর। কিন্তু কেনো যেন আমার মন পড়ে থাকে আরেকখানে। বহুদূরের এলোমেলো আরেকটা শহরে। আমার প্রিয় শহর ঢাকায়। মিউনিখে আমার নিজেকে নির্বাসিত নির্বাসিত লাগে। রাম সীতাকে তপোবনে নির্বাসন দিয়েছিল। আর আমি পিএইচডি নামের এক গোলমেলে বস্তুকে উপলক্ষ বানিয়ে মিউনিখ তপোবনে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছি। আর নিয়েই বুঝতে পারলাম যে দূরত্ব ব্যাপারটা কত অদ্ভূত। দূরত্ব আর মায়া-এদের সম্পর্ক নাকি ব্যাস্তানুপাতিক। যত দূরে যাওয়া হবে, মমতার টান তত গাড় হবে। কথাটা বোধহয় সত্য। কারণ এই দুইয়ের প্যাঁচে পড়ে আমি কিছুটা হতবিহ্বল। কিন্তু এরকম তো হবার কথা না। 
ঢাকার কোটি মানুষের ভিড় থেকে বের হয়ে ইউরোপের একটা সেই রকম ঝকঝকে জায়গায় এসে দম ছেড়ে বাঁচার কথা। আমার বেলায় কেন যেন উল্টোটা হল। দম তো ছাড়তেই পারলাম না, বরং ইলিশ মাছের কাঁটার মত দম গলায় ভালোভাবে আটকে গিয়ে বসে থাকল। এখানে বাতাসে সীসা নেই, আকাশে ভারি কালো রঙের ধোঁয়া নেই। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম যে আমি আর শ্বাস নিতে পারছি না। মনে হল ঢাকার বাতাস ফুসফুসে নিতে না পারলে যেকোন সময়ে হাত-পা বাঁকা হয়ে যেখানে সেখানে পড়ে গাঁক গাঁক করতে থাকব। প্রায়ই আফসোস হতে থাকল কেন প্লাস্টিকের ব্যাগে গিট্টু দিয়ে একটু ঢাকার বাতাস নিয়ে আসলাম না। আজকের মত এরকম এক একটা মেঘ মেঘ দিনে যখন দম বন্ধ লাগে, তখন আস্তে করে প্লাস্টিকের ব্যাগটা খুলে প্রাণভরে শ্বাস নিয়ে আবার ব্যাগটা গিট্টু মেরে সযত্নে রেখে দিতাম ঘরের কোনায়। শুধু ঢাকা না, পুরো দেশের জন্যে বিচিত্র এক অঘোম মায়ার ঘোরে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আছি আজকে বছর দেড়েক ধরে। বেশ ভালো যন্ত্রণা!


গত নভেম্বরের কথা। রাত তখন চারটা। কাছের স্টেশন থেকে ট্রেন নিয়ে ঠিক পাঁচটায় পৌঁছাতে হবে সেন্ট্রাল স্টেশনে। নইলে বাকিরা আমাকে রেখেই রওনা দিয়ে দিতে পারে। আশ্চর্যের কিছু না। জার্মানদের সময়জ্ঞান বলে কথা। যাচ্ছি হমবুর্গ। হামবুর্গ না কিন্তু। সেখানের একটা ছোটখাট কনফারেন্সে। জায়গাটা যে জার্মানির বিখ্যাত হামবুর্গ শহর না, বরং তার থেকে অনেক ছোট মোটামুটি অখ্যাত একটা মফস্বল টাইপের জায়গা-এটা জানার পর আমার উতসাহে ভাটা পড়ে গেল। সেদিন এটা জানার পর সুপারভাইজারের দিকে এমনভাবে তাকালাম যেনো আমার সাথে সূক্ষ্ একটা প্রতারণা করা হয়েছে। সে জাতিতে তুর্কি। আমার আশাহত চেহারা দেখে বিরাট খুশি হয়ে ল্যাব কাঁপিয়ে হাসতে হাসতে অ্যাবস্ট্রাক্ট সাবমিশনের তাগাদা দিয়ে আমাকে তুর্কি নাচনের উপর রেখে গেল। আরো মিইয়ে গেলাম শুনে যে বেশিরভাগ প্রেজেন্টেশন হবে জার্মান ভাষায়, যেহেতু এটা একটা ন্যাশনাল কনফারেন্স। 

যাই হোক, শীতের রাতের আরামের ঘুম হারাম করে পিঠের বোঁচকায় তিন দিনের কাপড়-চোপড় নিয়ে বেরোলাম ঘর থেকে। বোঁচকার নিজের ওজনই হবে দেড় কেজির মত। তার উপর কাপড়ের ভাঁজে আছে ল্যাপটপ, চার্জার ইত্যাদি। হাঁটতে গিয়ে মন হল এভারেস্ট বেয়ে উঠছি। এভারেস্টে ওঠার পথে যাত্রাবিরতি দিতে হয়। বাসা থেকে স্টেশন পর্যন্ত বিশ মিনিটের হাঁটা পথে মিনিট দশেক পর হ্যাংলা পটকা আমিও একটা যাত্রাবিরতি দিব দিব ভাবছি। রাস্তায় মানুষ তো দূরের কথা, একটা ভুতের বাচ্চাও নেই। 

আচমকা খেয়াল করলাম চারিদিকে একটা মায়াবী ঘোলাটে আলো। দেশে থাকতে পূর্ণিমা রাতে কারেন্ট চলে গেলে আমাদের ফুলার রোডের ক্যাম্পাস এলাকাটাকে ঠিক এরকম লাগত। মিউনিখ আর ঢাকা। একই চাঁদ। একই আলো। কিন্তু আমার কাছে বিরাট পার্থক্য লাগে। এখানের চাঁদের আলো সুন্দর ঠিকই, কিন্তু ল্যাম্পপোস্টের আলোর মত তীব্র। ল্যাম্পপোস্ট মার্কা চাঁদের আলোর প্রতি আমার তেমন আগ্রহ কাজ করে না। আমার ভাল লাগে রহস্য রহস্য গন্ধওয়ালা ঘোলাটে স্নিগ্ধ চাঁদ। এখানে আসার পর তাই আর পূর্ণিমার হিসেব রাখা হয় না। কিন্তু আজকে আকাশের দিকে না তাকিয়ে পারলাম না। অদ্ভূত ব্যাপার। সুকান্তের রুটির মত চাঁদ! একদম বাংলাদেশের চাঁদ! সাথে বোনাস হিসেবে হীরার কুচির মত ছড়ানো অসংখ্য তারা-নক্ষত্র। দেখে-শুনে আমি চন্দ্রাহত, নক্ষত্রাহত-সব কিছু হয়ে গেলাম। ক্লান্তি ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। বাকিটা পথ হেঁটে যেতে থাকলাম প্রায় উড়ে উড়ে। পায়ের নিচে মিউনিখের পথ, কিন্তু আকাশে আজকে বাংলাদেশের চাঁদ। আমার নিজের দেশের চাঁদ!

২ আগস্ট, ২0১২
- ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: মিউনিখ, জার্মানি

বিচিত্র উন্মাদ


                         
তখন আমি কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। নীলক্ষেত। রিকশায় বসে আছি। আব্বা কি যেন কিনতে গিয়েছে। চারপাশের মানুষগুলো দেখছি। একটাইটালিয়ানহোটেল এর সামনে বেশ বড় করে সাইনবোর্ড টাঙ্গানোঃসংগ্রাম হোটেল এ্যান্ড রেস্তোরা-দেশীয় যেকোনো খাবার অর্ডার নেওয়া সরবরাহ করা হয়ে থাকে লেখাটার দুই পাশে যথারীতি হাস্যময়ী ছাগল আর মোরগের ছবি। মোরগটাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছে। মোরগের আর্টিস্ট মনে হয় বউয়ের সাথে ঝগড়া করে কাজে এসেছিল। আনমনা থাকায় মোরগ আকারে ছাগলের প্রায় আড়াই গুন হয়ে গেছে। ছাগলটার আবার দাড়িও আছে। ইন্টারেস্টিং!

ঢাকায় পাগলের সংখ্যা বাড়ছে এই ব্যাপারটা কি কেউ খেয়াল করেছে? শেরাটনের সামনে এই ধরনের কয়েকজনের দেখা মেলে। আর শাহবাগের চারুকলা তো এদের কাছে মোটামুটি তীর্থস্থান বলা যায়। এখানে আমি একজনকে চোখাচোখা কাটাওয়ালা মোটা এক লাঠি হাতে ঘুড়ে বেড়াতে দেখেছি। উদাস উদাস চেহারা। ভয়ংকর দর্শন লাঠিটা বাদ দিলে তাকে মোটামুটি নিরীহই দেখায়। আবার পান্থপথের রাস্তায় একজনকে বেশ রাশভারী সাজে দেখা যায়। সাদা ধুতি হাটু পর্যন্ত। চকচকে পিতলের শিকল তার কাঁধ থেকে নেমে এসেছে। সেখান থেকে ততোধিক চকচকে একটা ঘটি ঝুলছে। দামী মানইজ্জতওয়ালা ঘটি। বোধহয় টাকা পয়সা রাখা হয় তার ভেতর। লোকটার বা হাতে লম্বা বেতের লাঠি। সব মিলিয়ে রামকৃষ্ণ রামকৃষ্ণ একটা ভাব আছে। যদিও শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস শেকল দেয়া ঘটি নিয়ে ঘুড়ে বেড়াতেন কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আবার বেড়াতেও পারেন। গান্ধী যদি ছাগল নিয়ে ঘুড়তে পারেন তাহলে রামকৃষ্ণের ঘটি থাকলে দোষ কোথায়?

সাইন্স ল্যাবের মোড়ে কদিন আগে এক আর্কিমিডিসকে দেখলাম নির্বিঘ্নচিত্তে রাস্তা পার হচ্ছেন। আমি একটু দূরে ছিলাম। তাই ওনারইউরেকাকানে এসে পৌঁছায় নি। তবে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। সবাই বেশ সম্ভ্রমের সাথে তাকে পথ ছেড়ে দিলো। এর আগেও দেখেছি নাঙাবাবাদের প্রতি পাবলিকের একধরনের শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে। হাইকোর্টের গেটের সামনে এক ভদ্রলোককে দেখি মাঝে মাঝে। বস্ত্রসম্ভারের দিক থেকে ইনি আর্কিমিডিসের থেকে উচ্চপর্যায়ের। কতটা উচ্চপর্যায়ের সেটা প্রমান করার জন্যে জৈষ্ঠ্যের গরমেও আধময়লা ফুলহাতা শার্টের ওপর কমলা সোয়েটার আর তার ওপর একটা স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে দিয়ে বসে থাকেন। পুরো ব্যাপারটা আলাদা মাত্রা পায় যেদিন উনি এর সাথে শিয়াল রঙের চাদর আর গামছাটা যোগ করেন। ভদ্রলোকের বোধহয় কোনো মাফলার নেই। থাকলে নির্ঘাত গলায় পেঁচিয়ে জৈষ্ঠ্যের কাটফাটা দুপুরে ঠোঁটের কোনে একটা অপার্থিব শান্তি ফুটিয়ে বসে থাকতেন। 

আমার ধারনা ঢাকা শহরে উন্মাদের সংখ্যা বাড়ার পেছনে কয়েকটা গূঢ় কারন আছে। এক, হতে পারে এরা সাদা পোশাকধারী পুলিশ। আমরা ছিনতাইকারীর খপ্পরে পড়লে শিয়াল চাদর ফেলে দৌড়ে আসবে সাহায্য করতে। আবার হতে পারে এরা আমাদের দেশের মাননীয় মন্ত্রীবর্গ। মহান শাসক হযরত ওমর ফারুক যেমন প্রজাদের দুঃখ-কষ্টের খোঁজ নিতে ফকির মিসকিনের ছদ্মবেশে মহল্লায় মহল্লায় ঘুড়তেন, তেমনি দেশের মানুষের অবস্থা জানার জন্যে মন্ত্রীরাও উন্মাদের ভেক ধরতে পারেন। আবার বাংলা সিনেমার প্রযোজকও এরা হতে পারেন।ফায়ারটাইপের দুইনম্বরী ছবি করে ধরা খেয়ে চাট্টি বাট্টি গোল করে সবশেষে উন্মাদের মহান পেশায়ে আবির্ভূত হয়েছেন।

যাইহোক, বিচিত্র মানুষের প্রতি আমার অপার কৌতুহল। আমি উন্মাদপ্রিয় বটে কিন্তু নিজে উন্মাদ না। তবে হতে কতক্ষণ? 

- ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: মিউনিখ, জার্মানী