Wednesday, March 25, 2020

মেহগনি কফিন


 

বছর সাতেক আগের এক বিচিত্র সকাল গির্জার ভেতরে শীত শীত করছে। অথচ রোদে ভেসে যাচ্ছে বাইরেটা। না চাইতেও ঘাড় ঘুরিয়ে চোখ চলে যাচ্ছে দরজার দিকে। পাদ্রির খুক খুক গলা পরিষ্কারের ধরন দেখে মনে হচ্ছে সামনে ভীষন লম্বা বাইবেল পাঠ আছে। কিসের ভেতর এসে যে ফেঁসে গেলাম! না এসেই বা উপায় কি। সাত কূলে ইনগ্রিডের কেউ নেই। তাই ল্যাব ঝেঁটিয়ে সবাই চলে এসেছি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের বেঢপ মাইক্রোবাসে চেপে

ইনগ্রিড আমাদের হেল্মহোল্টজ সেন্টারে কাজ করত। গবেষক। পুরো নাম ইনগ্রিড বেক-স্পিয়ার। তার ক্যান্সারের চিকিৎসা চলছিল। কেমোথেরাপির কোপে পড়ে মাঝে মাঝেই আসত না অনেকটা সময়। ব্যাপারটা নিয়মের মত হয়ে গিয়েছিল। আলাদা করে আর তার থাকা বা থাকা চোখে পড়তো না। তবে দেয়ালে টাঙ্গানো ইনগ্রিডের আঁকা ছবিগুলো প্রায়ই মনে করিয়ে দিত তার কথারক্তের লোহিত কনিকা কিংবা মস্তিষ্কের নিউরনের ছবি এমন মুন্সিয়ানা আঁকা যে বিমূর্ত কলাচিত্র বলে ভুল হবে হঠাৎ তাকালে। মনে মনে ইনগ্রিডের শিল্পীমনের তারিফ না করে পারতাম না।

তারপর একদিন ইনগ্রিড নিজেই ছবি হয়ে গেল টপ্ করে মরে গিয়েতাতে অবশ্য হাউকাউ পড়ে গেল না কারো মাঝে। আমরা শুকনো মুখে করিডোরে দাঁড়িয়ে পাড় জার্মান কায়দায় পাঁচ মিনিট আহা উহু করে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। জীবনের উৎসবে লোকের যত আগ্রহ, মৃত্যুতে ততটাই অনীহা।

কিন্তু মুশকিল বেঁধে গেল যখন জানলাম, ইনগ্রিডের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় লোক মিলছে না আত্মীয় বলতে এক বোন আছে তার, বার্লিন নাকি বন-এ থাকে। বয়সের ভারে তার মিউনিখ অবধি আসার জো নেই। স্বামীও নেই, উনি গেছেন আরো আগেই। আবার ছেলেপুলেও নেই যে সৎকারের ভার নেবে। তাই ঘুরে ফিরে শেষ দায়িত্বটুকু কাজ বর্তালো এই আমাদের ওপরে।

ল্যাবে জরুরী এক্সপেরিমেন্ট ছিল। সব লাটে উঠিয়ে রেখে এসেছি। বাকিদেরও একই অবস্থা। উশখুশ করছি আমরা। খুব এক প্রস্থ হাঁচি কাশি চুকিয়ে পাদ্রি বাইবেলের পাতা ওল্টাচ্ছে। অত্যন্ত উঁচু দরের জার্মান আমার এলেমের বাইরে বলে বোঝার চেষ্টা করছি না। পাশে দাঁড়ানো ক্যাথরিন গলার শালটা চেয়ে নিয়ে মাথায় দিয়েছে ঘোমটার মত করে। ক্যাথরিন আর আমি একই ল্যাবে পিএইচডি করি তখনপেছন থেকে আরেক ল্যাবের শেন জ্যো নামের চাইনিজ ছেলেটা জানতে চাইছে, তারও কি মাথায় কাপড় টাপড় কিছু দিতে হবে নাকি। ঠান্ডা গলায় শুনিয়ে দিয়েছি, ‘না, শুধু খুলির ভেতর ঘিলুটুকু সামলে রাখলেই চলবে আপাতত’।

শেন জ্যো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আবারো জানতে চাইলো, একটা ফোন করা যাবে নাকি। সে চীনে তার বাবাকে ফোন লাগাবে। চীনের চেং দ্যু অঞ্চলের এক অজ পাড়াগাঁয়ের মোড়ল তার বাপ। চোলাই মদ খাবার বদ অভ্যাস আছে। শেন জ্যোর ভয় হয়, চোলাই মদের মাত্রা ছাড়ানো মিথানল গিলে তার বাবা একদিন পটল তুলে ফেলবে। ফিসফিসিয়ে কথাগুলো বলে সে ঝুপ করে গির্জার বেঞ্চে বসে পড়ে সত্যি সত্যি চীনে ফোনে লাগিয়ে চ্যাং চোং করে কি সব বলা শুরু করল। মৃত্যুর ক্ষমতাই আলাদা। সুযোগ পেলেই মনের শংকার ডঙ্কা ঢং ঢং পিটিয়ে ছাড়ে

এদিকে গির্জায় দাঁড়িয়ে সামান্য অস্বস্তি হচ্ছে। অস্বস্তিটা হাত নিয়ে। না চাইতেও হাতদুটো মোনাজাত ধরে ফেলতে চাইছে। বাকিরা দু’পাশে হাত রেখে এ্যাটেনশন। শেষ মেষ সংকোচটা ঝেড়ে আনুবীক্ষনিক একটা মোনাজাত ধরে সুরা আউড়ে গেলাম বাকিটা সময়।

আধা ঘন্টা পর গির্জার আলো আঁধারি থেকে বেরিয়ে চোখ ঝলসে গেল মাঝ দুপুরের কড়া রোদে। এখানেই শেষ না। বরং কবরস্থান বরাবর আমাদের যাত্রার শুরু। মিছিলটা নিঃশব্দে এগোলো বসন্তের একটা দুটো কচি পাতাকে সাক্ষী রেখে। পায়ে পায়ে যান্ত্রিক চলছি আর ভাবছি, কি অদ্ভূত মানবজীবন। ঠুশ্ করে এক সময় ফুরিয়ে যায়। অথচ শীত শেষে যদি আবার বসন্ত দিয়ে জীবন শুরু করা যেতে যদি। আহা! এমন একটা বৃক্ষজীবন হলে মন্দ হত না।          

পাদ্রি সাহেব ত্রিশূলের মত কি যেন একটা ধরে রেখে হাঁটছে দলের সবার সামনে। তার জমকালো আলখাল্লা আর মাথার পাগড়ীটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি। এই প্রথম এদেশে কোনো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় আসা। কোথায় ভেবে রেখেছিলাম একবার না একবার এদের কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবো। আর ভাগ্যে ছিল ফিউনারেল!

আমাদের দলটা কেন যেন মাঝপথে থামলো। সামনের ক’জন একটা কফিন উঠিয়ে নিলো ছোট্ট একটা বেদির মতন জায়গা থেকে। মেহগনি রঙা কাঠের কফিন সোনালি রোদে শেষবারের মত ঝিকিয়ে উঠছে। নিজের অজান্তেই বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল ইনগ্রিডের জন্যে।  

চমৎকার বাগানটা দেখে কে বলবে এটা গোরস্থান। বারোমাসি কয়েক ধরনের ফুলের রাজত্বে গেল শীতের কোন ছাপ নেই। আরো কতগুলো মৌসুমী ফুল তার কুঁড়ি মেলতে ব্যস্ত। পাখিদের কিচির মিচিরে চারিদিক জীবন্ত, উচ্ছল। ইনগ্রিডকে আমরা তার মাঝে যত্ন করে নামিয়ে দিলাম।

মুঠোয় মুঠোয় মাটি পড়লো মেহগনি কফিনে। তফাতে দাঁড়িয়ে সম্মোহিতের মত দেখলাম। জীবন-মৃত্যুর মাঝে আসলে মাত্র এক হাইফেন ফারাক। তবুও আরেকটা দীর্ঘশ্বাস জোর করে বেরিয়ে যেতে চাইলে তাকে খামচে ধরে রেখে দিলাম ফিরে গিয়ে কাজে মন বসাতে হবে। চোয়াল শক্ত করে তাই পা বাড়ালাম ফিরতি পথে।

মিউনিখ, জার্মানি
২১.০৩.২০

  





Thursday, March 19, 2020

আল্পবাখের বাঁকে


১ 
হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বাস ধরলাম। সোনালি মোচওয়ালা ড্রাইভার ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে‘এই বাদামী ছেলে-মেয়েগুলোর কোন সময়জ্ঞান নেই, ধুর!’ তার মনের ভাব কপালের ভাঁজে অতি স্পষ্ট। অথচ সকাল আটটা বাজতে আরো মিনিট পাঁচেক বাকি। ঘড়িবিহীন কব্জিটা কায়দা করে তাই যেন বোঝাতে চাইলাম। অনিচ্ছায় হার মেনে ভদ্রলোক মোচে একটা তিনশো ষাট ডিগ্রি মোচড় মেরে আমার ছোট লাল স্যুটকেসটা বাসের পেটে ঢুকিয়ে দিল। বিরক্তিটা আরো চাগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আমি কি এক ছুটে গিয়ে অফিস থেকে জরুরী একটা জিনিস নিয়ে আসতে পারি? কয়েকগজ দূরের প্যাথলজি ভবনটা দেখে সে এক সেকেন্ড কি ভেবে সায় দিয়ে দিল। আমিও পড়িমরি করে ছুট।

কপাল ভাল, হাঁচড়ে পাচড়ে সিড়ি ভাঙ্গতে হল না। কলিগ পেত্রাকে জানালায় দেখে আকার-ইঙ্গিতে বোঝাতেই সে অফিসে রাখা পেন ড্রাইভটা এনে ছুড়ে দিল। আনাড়ি হাতে লুফে নিতে ব্যর্থ হয়ে কুড়িয়ে তুলে ভোঁ দৌড়ে বাসের কাছে ফিরে এলাম। আটটা তখনো বেজে সারে নি। যদিও বাস ড্রাইভার সত্যিকারের এক লেট লতিফের অপেক্ষায় দাঁত কিড়মিড়াচ্ছে।

মিউনিখ থেকে অস্ট্রিয়া। অস্ট্রিয়ার আল্পবাখ বলে এক পাহাড়ী গন্তব্যে যাচ্ছি সবাই। সবাই বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানসার রিসার্চ কন্সোর্টিয়ামের লোকজন। আল্পবাখে আমাদের বার্ষিক সম্মেলন। সেখানে যে যার গবেষনার খতিয়ান দেবে আর কি। এই খতিয়ান তৈরিতে টানা দুই সপ্তাহ দারুন খাটা-খাটুনি গেছে। শেষ মুহূর্তে আরো কিছু যোগ করতে হতে পারে ভেবে পেন ড্রাইভটা নেয়াতবে সামনের ক’টা দিন কনফারেন্সের ফাঁকে প্রচুর খেয়ে দেয়ে এই খাটুনি সুদে-আসলে পুষিয়ে নেবো। আপাতত এটাই ফন্দি।

জার্মান নিয়মানুবর্তিতাকে কাঁচকলা দেখিয়ে আটটার বাস সোয়া আটটায় আস্তে ধীরে ছাড়া হল কোনো লতিফ আদৌ বাদ গেছে কিনা কে জানেতোয়াক্কা না করে জোড়া আসন দখলে নিয়ে আরাম আয়েশে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।

২.
জানুয়ারির শেষ প্রায়। মিউনিখ এখনো তুষারশূন্য। অবশ্য শহর ছাড়িয়ে আধা ঘন্টার মাথায় জানালার বাইরেটা তুষারশুভ্র হয়ে গেল। তার মানে আল্পবাখ হতাশ করবে না। ইচ্ছেমত বরফে হুটোপুটি করা যাবে। অনু কাব্যের আদলে বেশ কয়েকটা অনু ঘুম ঘুমিয়ে সময়টা ফুশ্ করে উড়ে গেল। খালি রাস্তা পেয়ে দুই ঘন্টার পথ অনায়াসে দেড় ঘন্টায় পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম তুষাররাজ্য আল্পবাখ

বাস থেকে নেমেই বরফে হোঁচট খেয়ে বুঝলাম, কেন ডরোথি সাথে করে ভাল জাতের হাইকিং শ্যু আনতে বলেছিলডরোথি আমাদের রিসার্চ কন্সোর্টিয়ামের কো-অর্ডিনেটর। জুতা সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ-সব কাজে সে এক নম্বর। এই সম্মেলনের সমস্ত বন্দোবস্ত সে করেছে। তার প্ল্যান মোতাবেক একদিন আমাদের হাইকিংয়ে নেয়া হবে। আর আরেকদিন নিয়ে যাওয়া হবে স্নো-শ্যু হাইকিংয়ে। এমন চৌদ্দ পদের হাইকিং দিয়ে কি হবে, সেটা আমার মাথায় ঠিক খেলছে না। কলিগদের কাছে বুদ্ধি-শুদ্ধি নিয়ে বনেদী জার্মান ব্র্যান্ড জ্যাক উলফ্স্কিনের দামী এক জোড়া হাইকিং শ্যু কিনে এনেছি। এখন জুতা তার কোম্পানির মান রাখে কিনা দেখার বিষয়।

সময়ের আগে আল্পবাখ চলে এসেছি। কনফারেন্স হলের বাইরে সবাই যে যার মত উশখুশ বেকার ঘুরছেপর্দার আড়ালে চা-কফি সাজানো ছিল চা-বিরতির জন্যেএতগুলো লোকের হট্টগোল সামাল দিতে সেগুলোকে আগেই সামনে আনা হল। আমরাও হামলে পড়ে চো চো করে কফি টানতে থাকলাম। পরিপাটি বেশভুষার ওয়েটার মুচকে হাসছে। বুঝে গিয়েছে যে মিউনিখ থেকে এক দঙ্গল হাভাতে বিজ্ঞানী এসেছে। এরা যা পাবে, তাই খেয়ে ফেলবে।

৩.
কথা জমাতে না পারা মুখচোরা স্বভাবের আমি কফি হাতে এক টেবিলের চারপাশে উগ্রহের মত ঘুরপাক খাচ্ছি। জনাদুয়েককে চিনি। একজনের সাথে একটা প্রজেক্টও চলছে। কিন্তু অস্বস্তির খোলসটা খুলে এগিয়ে গিয়ে একটা ‘হ্যালো’ বলতে পর্যন্ত পারলাম নাএই অসুখের দাওয়াই কি জানা নেই। এই স্বভাব নিয়ে কবি-সাহিত্যিক হওয়া চলে, কিন্তু গবেষক-বিজ্ঞানী একেবারেই না। ঘরের চিপায় চুপকে বসে তাড়া তাড়া কাগজ লিখে ভরিয়ে ফেলার একটা বিনে বেতনের চাকরি করলে এভাবে টেবিলের চারকূলে ঘুরে গনসংযোগের ব্যর্থ চেষ্টা করতে হত না।

কথাটা মনে হতেই মাথায় ষাট ওয়াটের বাতি জ্বলে উঠলো হাতের সময়টা কাজে লাগাতে নিরিবিলি এক কোন খুঁজে ল্যাপটপ খুলে বসলাম। বইয়ের ফ্ল্যাপ লিখে শেষ করতে হবে।

টুকটাক ইতং বিতং লেখালিখির অভ্যাস আছে। এই কাছেপিঠে কোথাও ঘুরতে গেলাম। ফিরে এসে সপ্তাহান্তের অবসরে তাতেই রং চড়িয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লিখে ফেললাম কাঁচা হাতের ভ্রমন কাহিনী। যেটা আদতে ভ্রমন কাহিনীর ‘ভ’ও হয় না। ক’দিন আগে কি ভূত চেপেছিল, এক শুভাকাঙ্খীর জবরদস্তিতে পড়ে তেমনি কতগুলো লেখার সাথে আরো কিছু নড়বড়ে গল্প জুড়ে একটা পান্ডুলিপি পাঠিয়েছিলাম এক প্রকাশক বরাবর ঝড়ে যে টুপ করে বক মরে যাবে, ভাবি নি। মাতৃভাষা প্রকাশ থেকে প্রকাশক অতি তুরন্ত বইয়ের ফ্ল্যাপ লিখে পাঠাতে বলেছেন। বইমেলায় বই আসবে। বইয়ের একটা যুতসই নামও পাঠাতে বলছেন। শতভাগ হতবাক আমি কথাটা বন্ধু কি পরিবার, কাউকেই বলতে পারছি না। সবাই পেট চেপে হ্যা হ্যা করে হাসবে। গাঁটের পয়সা খরচ নেই, কিচ্ছু নেই, এত সহজে নবীশ লোকের বই ছাপা হয়- এমন তো ইদানীংকালে শুনি নি।

যাহোক, ঘাড়ের রগ ফুলিয়ে হাতে থাকা বিশ মিনিটের ভেতর ফ্ল্যাপ লেখার কাজ কিছুটা এগিয়ে আবার গা ঝাড়া দিয়ে ভোল পাল্টে বসলাম। লেখক স্বত্তাটাকে এক রকম খ্যাক্ খ্যাক্ করে খেদিয়ে প্লাস পয়েন্ট টু ফাইভ পাওয়ারের রিডিং গ্লাসটা নাকে চাপিয়ে আবার বিজ্ঞানীর ভেক ধরলাম। এই শ’খানেক তাবড় তাবড় বাঘের পালের ভেতর আমি যে একটা বাঘডাসা সেটা লুকাতে এই ভেকটুকুর দরকার হয় বই কি 

গুরুগম্ভীর আলোচনা চলছে অনেকগুলো প্রেজেন্টেশন। কোথায় যেন পড়েছিলাম, মানুষের মনোযোগের মাত্রা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মতন। সকাল সাড়ে দশটায় শুরু হওয়া জ্ঞানগর্ভ আলোচনা বেলা দেড়টায় এসে মাথায় আর না ঢুকে শিস্ কেটে কানের পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে যাওয়া শুরু করেছে ক্যান্সারের উপর দীর্ঘ আলাপ শুনে নিজেরও কেমন অসুখ অসুখ লাগছে।

পাশে বসা পিএইচডি সুডেন্ট মেয়েটা নিরুপায় বড় বড় হাই তুলছে। আর আমার পেয়েছে খিদে। সম্মেলন শুরুর আগে হামলে পড়ে চা-কফি মেরে দিয়েছিলাম বলে চা-পর্বের পাট চুকিয়ে দেয়া হয়েছে। দু’টোর দিকে নাকি একবারে লাইট লাঞ্চ হয়ে যাবে।
দু’টোর দিকে টেবিল লাগানো হল আমরা তড়াক করে লাফিয়ে চলে এলাম ধোঁয়া ওঠা খাবারগুলোর কাছে প্লেট কে প্লেট লাইট লাঞ্চ গলা দিয়ে নামিয়ে হেভি হয়ে যেতে সময় লাগলো না।

খানিকবাদে তৃপ্তি নিয়ে সন্তুষ্টচিত্তে ফিরে যাচ্ছি। কে যেন পিছু ডাকলো, ঘুরে তাকালাম ‘হাই, আমি দীপ্তি, দীপ্তি আগড়ওয়াল।‘ তার পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠলো, ‘আর আমি মনিকা’। তাদের আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসা দেখে ইতস্তত করলাম। অনেক জোর করে জড়তা কাটিয়ে ফিরতি জবাব দিলাম ,’হ্যালো, আমি সাবরিনা। পোস্টডক। ডক্টর কাতিয়া ষ্টাইগারের ল্যাবে আছি’।

তাদের সাথে বাৎচিত যা হল, তার বিষয়বস্তু আজকে রাতের হাইকিং। পাহাড় চূড়ায় রেস্তোরা আছে। সেখানে আজকের ডিনারের আয়োজন। মেয়ে দু’টো একটু ধন্দে আছে, এক হাঁটু তুষার ঠেঙ্গিয়ে ঘোর অন্ধকার পথে ঘন্টা খানেক হেঁটে যাওয়া তাদের ভারতীয় জানে কুলাবে কিনা। তাই এই বঙ্গসন্তানকে পেয়ে তারা দল ভারী করতে চায়। জার্মান আর বাকি ইউরোপীয়গুলো তো বরফ ডিঙ্গিয়ে খরগোশের মত লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাবে। পিছিয়ে পড়া দুয়েকটা কচ্ছপের দিকে যে ফিরেও তাকাবে না-এতো চোখ বুজে বলে দেয়া যায়।

নাম মনে না থাকার রোগ আছে। দীপ্তি আর মনিকা-নাম দু’টো তাই ইষ্ট নামের মত জপতে জপতে লেকচার হলে বসলাম। একটানা সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা ম্যারাথন কয়েকটা সেশন শেষ হবার পর দুইজনকে খুঁজে নিয়ে হাসিমুখে বললাম, ‘হাই দীপা, হাই মারিয়া’ দুজনই মুখ চাওয়া করছে দেখে চলে গেল ওদের গলায় ঝোলানো আইডি কার্ডে। চট করে নাম শুধরে নিয়ে বললাম, ‘কি দীপ্তি, প্ল্যান ঠিক আছে তো? হোটেলে চেক-ইন করে ঠিক আটটায় দেখা হচ্ছে তাহলে, মনিকা’। আধা ঘন্টার একটা সংক্ষিপ্ত বিদায় নিয়ে কাতিয়ার গাড়িতে চেপে বসলাম। তাকে আর আমাকে একই হোটেল দেয়া হয়েছে।

কাঠের দোতলা মচমচিয়ে ভাঙতে গিয়ে নাকে চন্দনের চমৎকার ঘ্রান ভেসে আসলো। এই শীতের রাজ্যে চন্দন এলো কোত্থেকে। কাউকে যে জিজ্ঞেস করবো, তার উপায় নেই। এক অতি বয়স্কা বৃদ্ধা একলা থাকেন নিচ তলায়। তাকে ঘাটানো বারণ। দোতলার বাড়তি ঘর দু’টো ভাড়া দেয়া হয় আল্পবাখে স্কি করতে আসা পর্যটকের কাছে। তাদের দেখভালের জন্যে দিনে একবার কেয়ার টেকার আসেআশেপাশের হোটেলগুলোও নাকি এমনি। লোকজন নিজের ঘর ভাড়া দিয়ে রেখেছে। স্থানীয়দের অনেকেরই নাকি এই ব্যবসা। ব্যাপারটা খারাপ লাগলো না। ঘরোয়া ভাব আছে। চন্দনের উদাসী ঘ্রানটা টেনে নিয়ে ঘরের চাবি ঘোরালাম।

হাতে সময় কম। তবুও ছোট্ট বারান্দাটা কি সম্মোহনে ডেকে নিয়ে গেল। হালকা ঝিরি ঝিরি তুষারে কাঠের মেঝে ঢেকে গিয়েছে। তাতে খালি পায়ের ছাপ এঁকে চারপাশটা অবাক চোখে দেখছি। মেঘে ঢাকা আকাশে সন্ধ্যাতারা নামে নি। তার বদলে পেঁজা তুলোর মত ঝরছে অযুত তুষার কনা। আকাশ থেকে তারাদের দল আলতো হয়ে খসে পড়ে পড়লে বোধহয় এমনি দেখাতো। আঁধারের বদলে নীলাভ আলোয় ছেয়ে গেছে সন্ধ্যাটা।

বিমূঢ় দাঁড়িয়ে কতক্ষন কেটে যেত বলা মুশকিল। মুঠোফোনটা একবার বেজে উঠে ঘোর কাটিয়ে দিল। দীপ্তি, মনিকারা বেরোচ্ছে। সাধের হাইকিং শ্যু পায়ে গলিয়ে আমিও কাতিয়ার সাথে বেরিয়ে পড়লাম। কাতিয়া চুপচাপ স্বভাবের। আর আমি চুপচাপের বাপ। সুতরাং, নিঃশব্দে চলছি দু’জন। পথের পাশে স্কিয়িং-এর সরঞ্জামের দোকান। রাইফেলের দোকানও দেখছি সারি সারি। স্কি করতে এসে এত বন্দুকবাজির কি দরকার বুঝলাম না।

পাহাড়ি উঁচু ঢালু পথঘাট যেন ভুলভুলাইয়া। একই রকম তুষারস্নাত চেহারা সব অলিগলির। সাহস করে একাও বেরোনো যেত। নতুন শহরে নিজের সাথে ঘুরে বেড়ানোর রোমাঞ্চ অন্যরকম। একটা ‘চলে মুসাফির’ ভাব আছে। তবে এই গুড়ি গুড়ি তুষারের আবছায়া সাঁঝে পথ হারিয়ে হাঙ্গামা হুজ্জত বাঁধানোর কি দরকার। আর আজকে হারালেও কেউ খুঁজতে আসবে না। পাহাড় চূড়ার রেস্তোরাটায় পেটপূজোর পর গেলাস গেলাস পাগলা পানি গিলে টাল হয়ে থাকা কেউ খেয়ালই করবে না তাদেরই একজন আল্পবাখের কোনো বাঁকে হারিয়ে গিয়ে খাবি খাচ্ছে



৪.
কংগ্রেস সেন্টার আল্পবাখের সামনে গিজগিজে ভিড়। প্রফেসর, পোস্টডক, পিএইচডি ছাত্ররা মিলে মোরব্বা অবস্থা। ভারি জ্যাকেট-টুপি-মাফলার, যে যা পেরেছে জড়িয়ে পেঁচিয়ে এস্কিমো সেজে এসেছে। সেই এস্কিমোদের ভিড়ে আলাদা করে কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সে চেষ্টা না করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তোড়জোড় দেখছি। প্রায় মশাল সাইজের কতগুলো মোমবাতি হাতে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে কয়েকজন। একটু পরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে এগুলোই পথের দিশা। একটা মোমবাতি সাধলে বিনয়ের সাথে মাথা নেড়ে পাশে দাঁড়ানো প্রফেসর ক্লাউসের হাতে গুঁজে দিলাম। বুড়ো প্রফেসর শিশুর মত খুশি হয়ে আগুন জ্বালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। নইলে আমার হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি মানেই বেখায়ালে নিজের জ্যাকেট জ্বালিয়ে দিয়ে সেই আগুন আরো দু’চারজনের গায়ে ছড়িয়ে বিতিকিচ্ছিরি একটা কান্ড বাঁধিয়ে দেয়া। হাজারো ভীতি আর ফোবিয়া নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আমার এই আরেক আগুনভীতি।

রওনা দেবো দেবো, এমন সময় ঘড়ির কাটার উপমহাদেশীয় কেতা মেনে একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে হাজির দীপ্তি আর মনিকা। ভুরু না কুঁচকে বরং মুচকি হাসলাম হাত নেড়ে সাথে কোত্থেকে একটা চাইনিজ মেয়েও জুটে গেল। তার নাম পিং মিং। এই চৈনিক নাম মুখে মুখে ঘুরে পাঁচ মিনিটের মাথায় গিয়ে পিং পং, দশ মিনিটের মাথায় পিং পিং আর পনেরোর মাথায় আশ্চর্যরকমভাবে শুধরে সেই পিং মিং-এই ফিরে এল।

বিরক্তি ধরিয়ে দেয়া রকমের ধীর গতিতে চলছে আমাদের চারজনের দলটা। কাছেই মোমের মশাল নিয়ে পাঁচ নম্বর একজন পাশে হাঁটছিলশামুক গতির সাথে আর না পেরে মশালটা পিং মিংয়ের হাতে ধরিয়ে বেচারা দুড়দাড় পা চালিয়ে উধাও হয়ে গেল। পথটা এখনো ঘোর অন্ধকার হয়ে সারে নি। দুই পাশে বাড়িগুলোর উঠানে ঝোঁপে জড়ানো মরিচ বাতি টিমটিমে আলো দিয়ে যাচ্ছে। তুষারের ভারে নুয়ে পড়া ক্রিসমাস ট্রিগুলোর পাশে স্নো ম্যানও বানানো হয়েছে কোনো বা বাড়ির সদরে। বোতাম চোখ, গাজর নাক আর উল্টো বালতি মাথায় স্নো ম্যান ঠাঁয়ে দাঁড়িয়ে নির্বিকার। বেচারা স্নো ম্যানের শান্তি নষ্ট করে নয়া দিল্লির নয়া জমানার মেয়ে দীপ্তি পটাপট কিছু সেলফি তুলে নিল।


৫.
বাড়িগুলো যেন হঠাৎ করে ফুরিয়ে গেল। আশে পাশের ছোট দলগুলোও কোন দূরে সরে গেছে। রাস্তাটাও দেখি বেমক্কা খাড়া হয়ে যাচ্ছে। ধীমে তালের ওয়াকিং এখন বাধ্য হয়ে হাইকিংয়ের চেহারা নিয়েছে। আর আরেকটু পর দেখা গেলো, রাস্তাই ফুরিয়ে গেছে। বাঁকানো বাঁকটা দেখতে না পেয়ে খাদ বরাবর এগিয়ে গিয়েছিলাম একটু হলেই। ভুল করে ভীষন খাড়া ঢালে পা দিয়ে ফেললে আর দেখতে হত না। চীন, ভারত আর বাংলাদেশের বেভুল মেয়েগুলো হুড়মুড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে এই শুনশান রাতে ত্রি-দেশীয় অ্যাভালেঞ্চ বইয়ে দিতাম। যাহোক, নেভিগেশন ব্যাপারটা যে মেয়েদের ঠিক আসে না, সেটা স্বীকার করে নিয়ে ঠিক পথে নেমে এলাম। ফিরতি পথে কোনো এক ছেলেকে ভুলিয়ে ভালিয়ে দলে টেনে নেবো, এই ফিঁচেল ফন্দিও আঁটা হল এক জোট হয়ে।

ধাক্কাটা সামলে নিঃশব্দে সাবধানে হাঁটছি। একটু আগের ছেড়ে আসা হোটেল, দোকানপাট সব পাহাড়ের পায়ের কাছে মিট্মিটিয়ে জ্বলছে জোনাক পোকার মতন। বেয়ে বেয়ে কতখানি উঠে গেলে প্রমান আকারের ঘরবাড়ি বিন্দু হয়ে যায়!

বেঙ্গালুরুর মেয়ে মনিকা আর পারছে না। স্যুপ দিয়ে রুটি খাবার জন্যে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ের ডগায় হাইকিং করে যাওয়াটা তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। বেচারা পিএইচডি করতে এসেছে সবে তিন মাস। ইউরোপীয় মৌজ-মাস্তির ধারা বুঝতে তার আরো সময় লাগবে। বরফের দেশের মানুষগুলোর আসল আনন্দই হচ্ছে শীতের ভেতর ঘেমে নেয়ে পাহাড় বাওয়া আর তুষারের ভেতর গড়াগড়ি খাওয়া।

দলে থাকবার একটা সুবিধা আছে। এ ওকে ঠেলে নিয়ে বিরতিহীন এগোতেই থাকে। তাই হাঁপিয়ে হেদিয়ে জিভ বেরিয়ে গেলেও ঠিকঠাক পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।



৬.
রেস্তোরার সামনে কাঠ জ্বালানো হয়েছে। সবাই গোল হয়ে ওম নিতে ব্যস্ত। হাতে হাতে গ্লুভাইন। রেড ওয়াইনের সাথে আর কি সব মিশিয়ে ক্রিসমাসের আগে-পরের সময়টায় খুব চলে এই পানীয়। আমাদের যেমন শীতে খেজুরের রস একটা বিলাসের জিনিস, এদেরও তেমনি আয়েশের বস্তু এই গ্লুভাইনের শরাব। গ্লুভাইনের নন-অ্যালকোহলিক ছোট এক ভাই আছে, নাম যার ‘পুঞ্চ’ বা ইংরেজি উচ্চারনে ‘পাঞ্চ’। আজকের আয়োজনে সেই ছোট ভাইকে খুঁজে পাওয়া গেল না তার মানে ডিনারেও একপেশে মেন্যু রাখা হয়েছে তিন পদের মাংস থাকবে, কিন্তু মাছ-সবজির বালাই নেই হতাশ হয়ে এক মুঠ বরফ মুখে পুরে কচ কচ চিবোতে থাকলাম। মনে মনে বেশুমার গজ গজও চলছে।

‘এ্যাই মেয়ে, কম আলোতে খামচে খামচে বরফ গিলছো কেন?’অপ্রস্তুত মুখ তুলে দেখি প্রশ্নটা করে ফিক ফিক করে হাসছে আরবি চেহারার এক তরুন। ছেলেটা নিজের থেকেই বলল, ‘আমি আদির। অমুক ল্যাবে তমুক টপিক নিয়ে কাজ করছি।‘ ডান গালে টোপলা মেরে থাকা বরফের গোলাটা জিভে ঠেলে গলা দিয়ে নামিয়ে জবাব দিলাম, ‘হাই হাদী। কেমন আছো?’ ছেলেটা কেমন খঁচে গিয়ে বলল, ‘হাদী না, আমার নাম আদির কানে তো দেখছি শোনো টোনো কম‘একদম অচেনা এই উজবুক আমাকে প্রায় ধমক মেরে কথা বলছে দেখে হকচকিয়ে গেলাম। ‘স্যরি, এত লোকের ভিড়ে ঠিক শুনতে পাই নি।‘ অহেতুক গ্যাঞ্জাম এড়াতে হার মেনে নেয়া ভাল

মূর্তিমান যন্ত্রনাকে এড়াতে মনিকাদের ভিড়ে ভিড়লাম। কিন্তু যন্ত্রনাটাও লাফিয়ে পিছু নিল। ‘আমি কোত্থেকে এসেছি বল তো?’ কি রে বাবা, কাউকে তো এমন গায়ে পড়ে কথা বলতে দেখি নি। দায় সেরে উত্তর দিলাম, ‘সিরিয়া?’আদির নামের বদ ছেলেটা পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে জ্বালিয়ে মুখের ওপর ভক করে ধোঁয়া ফেলে কড়া মেজাজে জবাব দিল,’কি ভয়ংকর স্টেরিওটাইপ নিয়ে ঘুরে বেড়াও তুমি! চেহারায় আরব আরব ভাব দেখেই ফশ্ করে বলে দিলে সিরিয়ান লোক?’ ঘাড় ঝাঁকিয়ে হাত উল্টে ‘কি জানি বাপু’ মুখ করে পালিয়ে যেতে নিলাম। ‘এই যে তুমি ইন্ডিয়ান মেয়ে, তোমাকে কেউ শ্রীলঙ্কান বললে কেমন লাগবে?’এখন আমার ক্ষ্যাপার পালা। ‘কে বললো যে আমি ইন্ডিয়ান, অ্যাঁ?’ নিজের দেশের নাম শুনে দীপ্তি আর মনিকা দু’পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। পিং মিংও আছে সাথে। আদির একটুও ঘাবড়ে না গিয়ে বলল, ‘তাহলে তুমি কোন দেশের? দেখলে কেমন ভুলে ভুলে কাটাকাটি হয়ে গেল? হা হা হা...।‘ এত জোড়ে প্রান খুলে হাসতে পারা লোকের উপর আর ক্ষেপে থাকা গেলো না। শীতের রাতে গল্প জমে গেল অল্পতেই। তবে আমাদের আপত্তির মুখে তাকে বিড়ি নিভিয়ে ফেলতে হল। সেটা গুঁজে দেয়া হল কার যেন বানিয়ে রাখা একটা স্নো ম্যানের মুখে।

বিচ্ছিরি রকমের বিস্বাদ খানাখাদ্য খেয়ে ঘন্টাখানেক পর সেই চারজনের দলটাই আবার ফিরতি পথ ধরলাম। আদিরকে দলে টানার হালকা ইচ্ছে ছিল। তার টিঁকির দেখাও মিলল না দেখে নিজেরাই রাস্তা মাপলাম। মাধ্যাকর্ষণের টানে ফুটবলের মত গড়িয়ে নামতে সময় লাগলো না।

আজকের হাইকিং পরীক্ষায় উৎরে গেলেও কালকে হবে আসল খেল। কনফারেন্সের সকালের সেশন শেষ হলেই দুপুরে নিয়ে যাবে আরেক পাহাড়ে। পেশাদার গাইড সহ স্নো-শ্যু হাইকিং। স্নো-শ্যু ব্যাপারটা ধোঁয়াশার মত লাগছে। আজকে একে ওকে জিজ্ঞেস করে সদুত্তর মেলে নি। যাহোক, আজকে ভাল করে ঘুমিয়ে টুমিয়ে সকালে একেবারে জলজ্যান্ত হয়ে উঠতে হবে।

৭.
খুব সম্ভবত মরে-টরে গিয়ে স্বর্গে চলে এসেছি। নইলে চারিদিক তীব্র আলোয় ভেসে যাচ্ছে কেন? ধাঁধাটা ভাঙ্গতে ঝটকা মেরে উঠে বসলাম। সাথে সাথে কলকব্জাগুলো ক্যাঁচকোঁচ করে উঠল। যাব্বাবা, হাড়গোড়ের আর্তনাদ মানে জ্যান্তই আছি। তবু জানালার বাইরেটা দেখে ভ্রম কাটছে না। কাঁচা রোদের খপ্পরে পড়ে শ্বেতশুভ্র আল্পবাখ আসলেই স্বর্গ বনে গেছে।

স্বর্গসুখ উবে যেতে সময় লাগলো না। কপালে আজকে স্নো-শ্যু হাইকিং নামের বিষম নরক আছে। মনটা আলপিন খাওয়া বেলুনের মত চুপসে গেলো। চ্যাঁচামেচি করা বাঙ্গালী কলিজায় মাইকিংটা খুব সয়। কিন্তু হাইকিংটা ঠিক ধাতে পোষায় না। কালকে রাতেই হাতে নাতে প্রমান মিলেছেআরেক দফা অত্যাচার সইলে ধড় থেকে জান সটকে পড়ার ভয় আছে।  

প্যাঁচা মুখ নিয়ে কাঁধ ঝুলিয়ে হোটেল থেকে বেরোলাম পা ঘষটে ঘষটে। যথারীতি কাতিয়া পাশে হাঁটছে। ‘দেখেছো কি জব্বর আবহাওয়া’ জাতীয় এক-দুই বাক্য খরচ করে কিপটে হয়ে গেলাম। অবাক করে দিয়ে কাতিয়া গল্প জুড়ে দিল। ‘বেকি তোমার উপহারটা পেয়ে দারুন খুশি হয়েছে।‘ বেকিটা কে মনে করতে কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল। ‘ওহ, তাই নাকি?’ জবাব দিলাম। কাতিয়ার মেয়ে বেকি। দেশ থেকে আড়ংয়ের একটা পাটের ব্যাগ নিয়ে এসেছিলাম ওর জন্যে।

এগারো বছরের বেকি স্কুল ছুটি থাকলে মায়ের সাথে অফিসে চলে আসে। টুকটাক হোমওয়ার্ক করে সময় কাটায়। আমাকে দেখলেই প্রশ্ন ছোড়ে, ‘জ্যুসিগকাইট আছে তোমার কাছে?’ জার্মান জ্যুসিগকাইট মানে বাংলা মিঠাইমন্ডা। বেকির জ্যুসিগকাইটের আব্দারে ডেস্কে ‘কাইত’ হয়ে থাকা আমি সোজা হয়ে উত্তর দেই, ‘আছে, নিয়ে যাও।‘ বলেই একটা চকলেট বাড়িয়ে ধরি। সেই সূত্রে বেকির সাথে সামান্য সখ্যতা আছে।

তা, উপহার পেয়ে বেকি খুশি হয়েই ক্ষান্ত হয় নি। সে উপহারের উৎস্য দেশটা নিয়ে গবেষক মায়ের সাথে খানিকটা গবেষনাও করেছে। আকারে অতি ছোট কিন্তু জনসংখ্যার প্রকারে অতি বড় ইত্যাদি গড়পড়তা খবরের চাইতেও বাংলাদেশে যে হাজারে বিজারে নদী আছে-এই তথ্যে সে অভিভূত। হাজার নদীর ছোট্ট দেশটা দেখতে কেমন- তাই নাকি সে ঘুরে ফিরে ভাবছে এই কয় দিন। সামান্য একটা পাটের থলের মানচিত্র তুলে ধরার শক্তি দেখে আমিও অবাক।  

৮.
সামান্য দুঃশ্চিন্তা লাগছে আজকের প্রেজেন্টশন নিয়ে। কয়েকজন মিলে খেটে খুটে যা ফল যোগাড় করেছি, সেটাই সবার হয়ে একজন মেলে ধরবে। কাজ মন মতো না হলে জায়গায় দাঁড়িয়ে ধুয়ে ফেলার একটা ভয়ংকর রীতি চালু আছে জার্মানিতে। তেমন হলে আর ইজ্জত নিয়ে ফিরে যেতে হবে না। বৈজ্ঞানিক জীবনে ইস্তফা দিয়ে অন্য ধান্দার ফিকির করা লাগবেপকেটের কোনায় একটা জং ধরা পিএইচডি নিয়ে হয়তো মিউনিখের ফুটপাথে প্যাঁ পোঁ ভাঙ্গা হারমোনিয়াম বাজিয়ে সিকি আধুলি জুটিয়ে পেট চালাতে হবে। ভাবতেই গা শিউড়ে উঠলো।

ঘন্টা খানেক পরের কথা। প্রজেক্টের হোমড়া চোমড়া একজন, ডক্টর মাইকেল কোয়ান্টে সবার হয়ে দারুন প্রেজেন্টশন দিয়েছে। কান কাটা যাবার হাত থেকে বেঁচে গিয়ে হালকা মন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এ বেলার মত সেশন শেষ।

রিসার্চ কন্সোর্টিয়ামের কো-অর্ডিনেটর ডরোথি সবাইকে তাড়া দিচ্ছে এক জায়গায় জড়ো হবার জন্যে। আমরা জড়ো হবার তোয়াক্কা না করে ছাড়া গরুর মত চরে ফিরছিবেচারা আর না পেরে শেষে সবাইকে ফেলে যাবার হুমকি দিলে কাজ হল। গরু লাইনে আনতে এমন রাখালের দরকার হয় বই কি। দু’চার বার হ্যাট্  হ্যাট্  করতেই সাজিয়ে রাখা সরঞ্জামগুলোর কাছে চলে এলাম সবাই।

সরঞ্জাম বলতে দু’টো ভীষন চোখা হাইকিং স্টিক আর এক জোড়া অদ্ভুতদর্শন ধাতব ফ্রেম ধরিয়ে দেয়া হল জনে জনে এই ফ্রেমই নাকি স্নো-শ্যু। ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। একটা ফোল্ডিং চেয়ার মাঝ বরাবর পটাং করে ভেঙ্গে স্নো-শ্যু বলে চালিয়ে দিলেই হল? এখন এই ভাঙ্গা চেয়ার পায়ে গলিয়ে হাঁটবো কি করেমনিকা আর দীপ্তিকেও দেখছি না। ভারত ভগ্নীরা কাছে থাকলে একটা উপায় হত। লোকজন ঝটপট এই বস্তু জুতার সাথে বেঁধে ছেঁদে রওনা দিয়ে দিয়েছে। পিঁপড়ার লাইনের মত তাদের সারিটাও আস্তে আস্তে এগোতে শুরু করেছে।

‘আমি একবার দেখিয়ে দেই?’ রাবারের স্ট্র্যাপগুলো যেন-তেনভাবে গেঁড়ো বাঁধা বাদ দিয়ে তাকালাম ভদ্রলোকের দিকে। বয়স ষাটের ওপরে হবে। বাঁধানো দাঁতে ঝকঝকে এক গাল হাসতেই সহজ হয়ে গেলাম। পটাপট কি জাদুবলে স্নো-শ্যুয়ের ফ্রেমে আমার হাইকিং জুতা জোড়া ঠিকঠাক জুড়ে দিয়ে দুষ্টুমি চোখে হাত বাড়িয়ে বললো, ‘ওহ্, নামটাই বলা হয় নি। আমি জিম, দুই নম্বর জিম।‘

‘আর আমি এক নম্বর জিম, হা হা হা...’। ভ্যাবাচেকা খেয়ে ফিরতি কিছু বলার আগেই আরেক দুষ্টু বুড়ো পেছন থেকে বলে উঠল নম্বর-রহস্য বুঝতে না পেরে বোকার মত বলে ফেললাম, ‘অ্যাঁ, মানে কি?’ ‘মানে আবার কি, আমাদের দু’জনেরই নাম জিম। কাকতাল, বুঝলে না। আমরা আজকের ট্যুর গাইড। তোমার আর কি খেদমত করতে পারি বলে ফেলো তো জলদি।‘

দুই বগলে দুই ফ্রেম চেপে এগিয়ে আসা মনিকা আর দীপ্তিকে দেখিয়ে দিলাম হাতের ইশারায়। জিম বুড়োরা ছোকরার গতিতে তাদের দিকে ছুটে গেল। মিনিট দুয়েকের মনিকারাও তৈরি। তারপর ধীর গতির তিন তিনটে বাদামী মেয়েকে সাথে নিয়ে দলের একেবারে সবার শেষে হাসিমুখে রওনা দিল এক আর দুই নম্বর জিম।  



৯.
ডিগবাজি খেয়ে উল্টে না পড়ে কিভাবে যেন লাঠি ঠুকে ঠুকে এগোতে থাকলাম। দুই দিনের তাজা এক হাঁটু তুষার জমাট বেঁধে সারতে পারে নি। পা দেবে যাচ্ছে পেঁজা তুলোর অতলে। এসব অনর্থক হাইকিং না করে তুষারের বিছানায় শুয়ে আকাশ দেখতে পারলে বেশ হতো। খানিক দূরেই এক খন্ড মেঘ ভাসছে। যেন ডাকলেই চুপচাপ কাছে এসে দাঁড়াবে। কিন্তু মেঘবালিকা হবার ইচ্ছেটাকে ঠেলে সরিয়ে পা চালালাম।

উল্টো পথে একজনকে ফিরে আসতে দেখে শুধালাম, ‘ঘটনা কি, যাচ্ছো কই?’ মেয়েটা জানালো, তার হাঁপানির রোগটা ঝোপ বুঝে কোপ মেরেছে। তাকে আর আটকে না রেখে বিদায় দিয়ে দিলাম। সেও অদৃষ্টের উদ্দশ্যে ভয়ংকর দু’টো গাল পেড়ে নেমে গেল। বিজ্ঞানের মত সূক্ষ্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করা লোকেদের মাঝে গালি দেবার মত স্থূল একটা বদস্বভাব আছে। একটু আগে নিজেও এক প্রস্থ গাল ছুড়েছি ভাঙ্গা চেয়ার, মানে স্নো-শ্যু জোড়া পড়তে গিয়ে। চোস্ত বাংলা গালি বলে কেউ বোঝে নি ভাগ্যিস। নইলে ভালোমানুষি চেহারার জারিজুরি সব ফাঁস হয়ে যেত মুহূর্তেই।

এদিকে, নিজেদের দিকে তাকিয়ে দেখি, আমরাও সংখ্যায় কমে গেছি। মনিকা আর আমার গদাই লস্করি চালকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দীপ্তি বাকিদের সাথে ভিড়ে গিয়েছে কোন ফাঁকে। এক নম্বর জিমকেও দেখছি না। দুই নম্বর জিমই শুধু সাথে আছে। মনিকাও হাঁপিয়ে হেদিয়ে বেশ পিছিয়ে পড়েছে। তার সুবিধের জন্যে গতি কমিয়ে জিম আর আমি গল্প জুড়েছি ঢিমে তালে।

‘তোমার ফুসফুস টুসফুস ঠিক আছে তো? পারবে তো বাকিটা পথ?’, জিমের গলায় উদ্বেগ। দুষ্টুমি করে বললাম, ‘ফুসফুসের বাতাস ফুরিয়ে গেছে সেই কখন। এখন কলিজার চিপা থেকে বাতাস বের করে তাই দিয়ে চলছি।‘ জিম হো হো হেসে উঠল, ‘তুমি দেখি দারুন পাজি। কথার মারপ্যাঁচ এত শিখলে কোত্থেকে?’ অস্ট্রিয়ানদের জার্মান উচ্চারন অন্য রকম। জিমের কথায় সেই টান নেইমুচকি হেসে উত্তর দিলাম, ‘কথার খেলা আমার খুব প্রিয় একটা খেলা। আচ্ছা বলো তো, গাইডের কাজ করছো কত দিন?’ জিম জানালো, ‘এই ধরো তিরিশ-চল্লিশ বছর। যখন একটা কি দু’টো দাড়ি মোচ গজিয়েছে ঠিক তখন থেকে শুরু’

তিরিশ আর চল্লিশের মাঝে প্রায় এক যুগ ফারাক, জিমকে সেটা ধরিয়ে না দিয়ে পথের পাশের এক আস্তাবলে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম। অতিকায় গোটা পাঁচেক ঘোড়া দাঁড়িয়ে। ট্রোজান হর্স আকারের পাহাড়ি ঘোড়াগুলোর একেকটার পেটে আস্ত এক প্লাটুন স্পার্টা সৈন্য এঁটে যাবে, এমনই ভীষন তাদের চেহারা। চোখ ঘেঁষে বাদামী ঘন কেশর নেমে এসেছে ঘাড়ের পাশে। ভারী পশমে খুর পর্যন্ত ঢাকা। দু’টো পাখা থাকলে বোধহয় উড়েই যেত আকাশে। জিমের কাছ থেকে জানলাম, কয়েক ঘর চাষী আছে এই এলাকায়, ঘোড়াগুলো তাদেরই। ‘গরমের সময়ে এক বার এসো আল্পবাখ। ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ি রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দারুন লাগবে।‘ সায় দিয়ে মনে মনে তারিফ না করে পারলাম না প্রানীগুলোর।  

জিমের সাথে কথায় কথায় বাড়িঘর, লোকালয় পেরিয়ে কখন যে অনেকটা দূরে চলে এসেছি, টের পাই নি। ভয়ংকর সরু খাদটার কিনারায় এসে টনক নড়লো। দুই পা পরিমান চওড়া পথটার পাশে নেমে গেছে গভীর খাদ। নিচে এক চিলতে পাথুরে ঝরনা। পড়ে গেলে হাড়গোড় গুড়িয়ে সলিল সমাধি। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে প্রকট উচ্চতা ভীতি খোলস খুলে বেরিয়ে এসেছে। এই পুলসিরাত আমি পার হতে পারবো না কিছুতেই। জিমকে ডাকতে গিয়ে দেখি কোথাও কেউ নেই। অনেকটা পিছিয়ে পড়ে মনিকাকে হাতে ধরে এগিয়ে আনতে ব্যস্ত সে।
ভয়ে আতংকে ভেউ করে কেঁদে দেবো কিনা ভাবছি। হঠাৎ মনে হল, আরে দলের একশো লোক একটু আগেই এই পথে দিব্যি হেঁটে পার হয়ে গেছে। আর আমি বাঙ্গাল ঢোক গিলে খাবি খাচ্ছি। ধ্যাত্তেরি, ভয়ের কপালে ম্যাচ জ্বালিয়ে আগুন দেই। লম্বা এক দম নিয়ে রাস্তাটা উড়িয়ে দিলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি জিম দুই হাতের বুড়ো আংগুল দেখিয়ে বলছে, সাবাশ, সাবাশ।

পরক্ষনেই বুড়ো আঙ্গুলটা ভাঁজ করে চার আঙ্গুলের ইশারায় কি যেন কি বলতে লাগলো জিম। ফিরে যেতে বলছে সেমনিকা ধপ্ করে বসে বসে পড়েছে। জিম তার সাথে ফিরে যাবে। চাইলে আমি রয়ে যেতে পারি ইত্যাদি। এক মুহূর্ত ভেবে আমিও ক্ষ্যামা দিলাম। কারন, ঘেমে ভিজে ভারি জ্যাকেট চুপ চুপ করছে। দেখা গেল পানিশূন্যতায় একটা দফা রফা হয়ে ফিট খেয়ে পটল তুলে ফেললাম। তখন বাংলাদেশের কাগজে বেরোলো, ‘পর্বতারোহনে গিয়ে প্রবাসী মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যু’। ওদিকে, মেধাবীও নই, আর শিক্ষার্থী হবার বয়সও পেরিয়ে গেছে কবে সিদ্ধান্ত নিলাম, যাহ্, ফিরেই যাই। প্রায় ঘন্টা দুয়েক ধরে হাইকিংয়ের আদ্যোপান্ত যথেষ্ট দেখা হয়েছে। হেই দুনিয়ার মাবুদ, আরেক দফা এই দুনিয়াবী পুলসিরাতটা পার করে দাও দেখি। পাঁড় ধার্মিক বনে গিয়ে তিন কুল পড়ে বুকে ফুঁ মেরে ইন্ডিয়ানা জোনস্ কায়দায় লাফিয়ে পেরোলাম পথটুকু।

১০.
ফিরে যাচ্ছি শর্টকাট ধরে। এতে নাকি তাড়াতাড়ি হবে। জিম কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা কার্বোনেটেড ড্রিংক ধরিয়ে দিয়েছে। তরমুজের রসের মিষ্টি পানীয়ের খানিকটা কারবালার তৃষ্ণা নিয়ে গলায় ঢেলে বাড়িয়ে দিল মনিকা। জান বাঁচানো ফরজ, তাই জানতেও চাইলাম না ওতে অ্যালকোহল আছে কি না। জিম বুড়ো না থাকলে আজকে আর দেখতে হত না। এগিয়ে যাওয়াটা এ যুগে এত বেশি জরুরী যে পিছিয়ে পড়াদের দিকে খেয়াল করবার ফুসরত মেলে না কারো। কিন্তু পিছিয়ে পড়ে খুব যে খারাপ লেগেছে তা না। বরং প্রাইভেট গাইড জিমের সাথের আল্পবাখের আকে বাঁকে ঘোরাঘুরিটা হয়েছে বাড়তি বোনাসের মতন।

‘ঐ যে বড় গাছটা দেখছো না, ওর বয়স কত জানো?’ আন্দাজ করার আগেই জিম জবাব দিয়ে দিল, ‘আটশ বছর, বুঝলে পাক্কা আটশ। এ তল্লাটের সব চেয়ে পুরানো গাছ। লোকে দেখতে আসে খুব’। হিসেব কষলাম, আটশ বছর আগের সেই সময় গাছটা যখন মাত্র চারা, তখন পৃথিবীর আরেক প্রান্তে দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিশ বাংলা আক্রমণ করে হাতিয়ে নিচ্ছিলেন। এত পুরানো অথচ জ্যান্ত কিছু এর আগে আর দেখি নি বলে বিস্ময় আর ধরে না। জিম বুড়ো আমাদের বিস্ময় দেখে তৃপ্তির হাসি হাসছে। তার দিনটাও একেবারে বাজে খরচ হয় নি।

আরো ঘন্টাখানেক পরে কংগ্রেস সেন্টারের কাছে ফিরে হাজার খানেক ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় দিলাম বুড়োকে। নাম দুই নম্বর জিম হলেও মনটা তার একেবারে এক নম্বর।

বিজ্ঞান, গবেষনা, সম্মেলন ইত্যাদি ব্যাপারগুলো আসলে একেবারে শুষ্কং কাষ্ঠং না। এর ফাঁকতলে ঘুরে নিলে কত রঙের মানুষ আর কত কিছুর দেখা মেলে। কনফারেন্স হলে বসে স্বচ্ছ কাঁচে ঢাকা দেয়ালের ওপাশে ঝিরি ঝিরি তুষার পড়া সন্ধ্যেটার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম কথাগুলো। কফি কাপের উষ্ণ চুমুকে ডুবে আবার মন দিলাম প্রজেক্টরের বিশাল স্ক্রিনে। 

-রিম সাবরিনা জাহান সরকার
মিউনিখ, জার্মানি
০৮.০৩.২০২০



Thursday, March 5, 2020

ভোঁওও...ইন্টারভিউ!!


"...ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ দিয়ে বেড়িয়েছি প্রায় আট মাস। জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিষয়টা দেশে নতুন। চাকরির ভবিষ্যৎ তাই ফকফকে। এটা বুঝে নিয়ে ডানে বামে বন্ধুরা স্কলারশীপ বাগিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় উড়াল দিচ্ছে। কিছুটা অলস আর গবেট প্রকৃতির হওয়ায় আমি এসবের ধার না ধেরে আরামসে তাদেরই কারো কারো বিয়ে খেয়ে বেড়াচ্ছি। আজকেও সেজেগুজে প্রায় নেচে নেচে বিয়ে বাড়ী গিয়েছিলাম। জবরদস্ত এক মুরগীর ঠ্যাং, দেড় প্লেট পোলাও আর দুই গ্লাস বোরহানি গিলে এখন মাতাল মাতাল লাগছে। টালমাটাল বাড়ি ফিরে বাম দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়েছি।

ঘুমটা জমে মাত্র ক্ষীর ভাব এসেছে, আর অমনি তড়াক্ করে উঠে বসলাম। মনের খচখচানিটা একটা বিড়াল সেজে লেজ বাগিয়ে কান চুলকে দিয়েছে। গত কয়েকদিন আলসেমির বশে অ্যাপ্লিকেশনগুলো নিয়ে আর বসা হয় নি। স্কলারশীপ তো আর বৃষ্টি না যে আকাশ থেকে টুপটপ করে কোল এসে পড়বে। কিন্তু এত রাতে বিবেকের অত্যাচার ভাল লাগে না, ধ্যাৎ! আরো কটা গুরুতর গালি দিয়ে মুখে পানির ঝাপ্টা মেরে ঘাড় সোজা করে বসলাম...।"

..এ্যাইইক্! হার্ড ব্রেক্!!! আর না বলি।

ক্লাসের তেরো জনের ভেতর বারো নম্বর রোলের প্রায় নিরেট মাথার আমি কিভাবে যেন হাতড়ে হাতড়ে একটা বৃত্তি জুটিয়ে পিএইচডি করতে জার্মানি চলে এসেছিলাম। এই গল্পটাই নিজের ভাষায় বলেছি লম্বা ম্যারাথন আকৃতির কাহিনী 'ভোঁওও...ইন্টারভিউ'-তে।

তার পুরোটা পড়তে চাইলেঃ
''স্বপ্নের সীমানা পেরিয়ে"
মাতৃভাষা প্রকাশ,
স্টল ২০১-২০২
আর
রকমারিতেও পাওয়া যাচ্ছে বইটা।

দেশে প্রায় বিনে পয়সায় পড়াশোনা করে আমরা যারা বিদেশে এসে পড়ছি আর গবেষনা করছি, তারা সবসময়ই চাই দেশকে কিছু একটা ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু দেশের ঋন শোধ হবার না। তবুও বিদেশের মাটিতে নিজেদের অভিজ্ঞতাগুলো হাসি-ঠাট্টায় গল্পচ্ছলে শুনিয়ে ছোট ভাইবোনদেরকে একটা পথ দেখাতে চেয়েছি। তাই পৃথিবীর নানান প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমরা আট জন মিলে আমাদের জীবন থেকে নেয়া আট রঙের আটটা গল্প দিয়ে সাজিয়েছি এই বইটা। অষ্টব্যঞ্জন বললেও ভুল হবে না।

বইয়ের একটা লভ্যাংশ আবার সুবিধাবঞ্চিত ছাত্রছাত্রীদের সাহায্যে খরচ করা হবে। এমন চমৎকার উদ্যোগ আর হয় না। সাথে জড়িত ঝকঝকে মানুষগুলোকে ঝলমলে অভিনন্দন।

-ডঃ রিম সাবরিনা জাহান সরকার
গবেষকঃ ইন্সটিটিউট অব প্যাথোলজি, স্কুল অব মেডিসিন,
টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি
২৭.০২.২০২০

পর্তুগালের অলিগলি-১

১ এলোমেলো কয়েক পাক ঘুরতেই ছোট্ট লিসবন বিমানবন্দরটা ফুরিয়ে গেল। ডিউটি ফ্রি শপে কেনাকাটা করার লোক নই। তারপরও এক-দুইটা পারফিউমের বোতল টিপেটুপে ...