Tuesday, April 21, 2020

Discrete Memoir


How I miss sitting at the Uyghur restaurant all by myself,
Devouring the spicy noodles
Or sipping on Turkish tea
With lots of sugar,
Listening songs so foreign yet so familiar
Looking idly through the glass,
Watching kids laughing
Men, women minding their business,
And the tempting smell of food i didnt order
To bring me back to reality and regret,
And to people sitting around,
Black, white, beige, brown
How we felt so home
Being only tables apart
Those broken overheard words, slipped smiles or strange silence
How they means so much now
Now they have all gone
Through the thin air
And only memories left to share.

Munich, Germany
18.04.20

Sunday, April 12, 2020

মেঘ সরে যায়


মার্ক স্মিড আমার পাড়ার লোক। মিউনিখে যে বাড়িটায় থাকি তার দোতালায় থাকে মার্কবয়স সাতাশ থেকে সাঁইত্রিশ যেকোনো কিছু হতে পারে। চুলগুলো একপাশে কদম ছাঁটআরেক পাশ ইচ্ছেমত বড় হয়ে কাঁধ ছুঁয়েছে। হাতে-পায়ে উল্কির উঁকি ঝুঁকিও আছে। বা কানে দুল শীত-গ্রীষ্ম নির্বিশেষে নীল-গোলাপি মাফলার গলায় প্যাঁচানো সব মিলিয়ে বেশ একটা হিপ্পি হিপ্পি ভাবতবে দেখা হলে মাথা নুইয়ে ফিক করে একটা ছেলেমানুষি হাসি দেয়। অদ্ভূতুড়ে বেশভুষা তখন আর কড়া হয়ে চোখে লাগে নাপড়শী হিসেবে মার্ককে আমরা পছন্দই করি

তো, মার্ক একটা রিকশা কিনেছে। সবুজ রঙের ঝাঁ চকচকে রিকশাতার গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে আমাদের সেকেন্ডহ্যান্ড কালো ফক্সওয়াগনটা রাখতাম। রিকশার হঠাৎ আগমনে আরেকটা গ্যারেজ ম্যানেজ করে গাড়ি সরিয়ে নিতে হয়েছেবিনা নোটিশে তিন চাকার এই পংখিরাজ কিনে বিপদে ফেলায় মার্ক দুই মাসের ভাড়া নিল না তো নিলই না।

কিন্তু বরাত খারাপ। ক্রিং ক্রিং রিকশা দাপিয়ে শহর ঘুরে বেড়ানো আপাতত হচ্ছে না মার্কে্রকরোনা ভাইরাসের বিষম গ্যাঁড়াকলে পড়ে মিউনিখ শহর জুড়ে ঘোর লকডাউন চলছে। গমগমে শহরে ভুতুড়ে শুনশান। গাড়িঘোড়া সব হাতে গোনা যায়। শখের নতুন রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামলে বেরসিক জার্মান পুলিশের হাতে বেধড়ক মার খাবার আশংকা আছে। তবে সাইকেল নিয়ে বেরোলে এখনও কিছু বলছে না। বেচারা মার্ক তাই হতাশ চেহারায় সাইকেলের তালা খুলে কই যেন বেড়িয়ে প্রায় সকালেই। তাজা হাওয়ায় এক-দুইপাক ঘুরে এসে আবার ঘরে সেঁধিয়ে যায় বাধ্য ছেলের মত।

জানালার পাশে কফি হাতে এক চিলতে রোদ পোহাতে পোহাতে মার্ক স্মিডের বেরিয়ে যাওয়া দেখছিলাম। চমৎকার রোদটা দেখে লোভ হচ্ছে। লম্বা একটা বিষন্ন শীত পেড়িয়ে এপ্রিলের কাঁধে চড়ে বসন্ত আসি আসি করছে। কিন্তু লাভ কি তাতে। করোনার মারন থাবায় বসন্তও থমকে গিয়েছে এবার। কফি মগ হাতে শাল জড়িয়ে উঠোনে নেমে এলাম।

যত্ন করে বানানো ছোট্ট ষ্পিলপ্লাৎজ শূন্য পড়ে আছে। এখানে প্রায় সব বাড়িগুলোর সামনে কাঠের গুড়ি দিয়ে ঘেরা এক ফালি বালুর খেলাঘর বা ষ্পিলপ্লাৎজ থাকে। শিশুরা খেলবে বলে। এখন আর বাচ্চারা তেমন বেরোয় না। নিজেই বড় শিশু সেজে নরম বালু মাড়িয়ে ষ্পিলপ্লাৎজের স্লিপারটায় চড়ে বসলাম। একেবারে উঁচু ধাপে বসেছি। দূরের আকাশ তাতে খানিকটা কাছে এগিয়ে এল বোধহয়রোদের তীব্রতায় অদ্ভূত মুক্তির আস্বাদ। কফির উষ্ণতা ছাপিয়ে কুসুম কুসুম মায়ায় মন ভরে উঠছে। ইশ্, পৃথিবীটা কত সুন্দর।

“সাবরিনা! হাই!” সম্বিত ফিরে চমকে তাকালাম। ডরোথি ডাকছেডরোথিও দোতলায় থাকে মার্ক স্মিডের পাশের ফ্ল্যাটে। সোনালি চুল অপূর্ব ভঙ্গিমায় কোমর অবধি লতিয়ে স্বর্ণলতা হয়ে নেমে এসেছে। কে বলবে এই মেয়ে পুরোদস্তুর পেশাদার ডাক্তার। মেয়েটা রূপকথার মৎস্যকুমারীর মত সুন্দরী। তবে মোটা ফ্রেমের চশমাটা তার কমনীয় চেহারার সাথে ঠিক যাচ্ছে না। বুঝতে পেরেই কিনা, ডরোথি চশমা খুলে হাতে নিয়ে হালকা হাসলো। তার সাথে আমার দূরত্ব কয়েক মিটার। দুরত্বই যে এখনকার সামাজিকতা। আমি স্লিপারের টঙ থেকে ফিরতি হাসি দিয়ে বললাম, ‘ঘরে না থেকে বাইরে কই যাও?’। অপরাধ মেনে নিয়ে আবার হেসে জবাব দিল ডরোথি, ‘টুকটাক খাবার কিনতে যাই। ঘর খালি। তোমার কিছু লাগলে বলোকলিং বেল চেপে দোরগোড়ায় রেখে যাব।‘এই দুর্দিনে এটুকুই বা কে কাকে বলে কিছুই লাগবে না আপাতত। তাই মাথা নেড়ে ধন্যবাদ জানিয়ে না করে দিলাম। সেও বেনী দুলিয়ে পা চালালো।

ডরোথিকে কাছ থেকে দেখছি বছর খানেকেরও বেশি হবে। একাই থাকে। কোনোকালেও তার বন্ধুবান্ধব দেখি নি। অবশ্য বছর খানেক আগে কোত্থেকে এক ছোকরা ফুলের তোড়া হাতে উদয় হয়ে উঠানের বেঞ্চিটায় পুরোটা বিকাল বসে ছিল। ডরোথির নাম ধরে বেশ ডাকাডাকি করেও ঠিক সুবিধে করতে পারে নি। সেই প্রথম, সেই শেষ।

ব্যাটে-বলে কিছু হচ্ছে না দেখে কিছুটা আফসোসই লাগে। এমন নিখুঁত রূপবতীর পাশে এলোমেলো কালো চুলের ছিপছিপে ধারালো চেহারার একটা বাদামী ছেলে কল্পনা করতে বেশ লাগে। ডরোথি নিটোল লম্বাটে গরনেরছেলেটাকে কম সে কম ছ’ফুটি তো হতেই হবে। কিন্তু হায়, লোকে ভাবে এক আর হয় আরেক। তবে যা হয়েছে, তাও শুকরিয়া।

দরজায় টাঙ্গানো একটা চিঠি পেলাম একদিন। “... আজকে বিকালে আমার বাবা-মা আসবেজানোই তো, আমাদের গ্রামটা মিউনিখ থেকে অনেক দূরে, জার্মানির আরেক মাথায়। ওরা প্লেনে করে আসছে। ওদিকে বলিভিয়া থেকে আমার বন্ধু রড্রিগো আসবেরড্রিগোকে তো দেখেছো সেদিন, মনে আছে? ওর সাথে তাদের এবার দেখা করিয়ে দেবো। তোমার কাছে চাবিটা রেখে গেলাম। যেই আগে আসবে, প্লিজ কষ্ট করে তার হাতে দিয়ে দেবে। আজকে আমার লম্বা ডিউটি। কিছুতেই এড়ানো গেলো না। -ইতি, ডরোথি।“

চিঠি হাতে সেদিন রড্রিগোটা কে, ঠিক মনে পড়ছিলো না। স্মৃতি হাতড়ে লোকটা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে গেলামকয়েক মুহূর্ত পরেই মাঝবয়সী পানামা টুপিতে মাথা ঢাকা বাদামী একটা মুখ ভেসে উঠল। মাস খানেক আগে বাড়ির সামনে আসা-যাওয়ার পথে দেখা হয়েছিল। ডরোথি সলজ্জে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, “আমার বন্ধু, রড্রিগো”। নিজের তাড়াহুড়ায় ‘হ্যাঁ হুঁ’, ‘আচ্ছা দারুন তো’ –এই জাতীয়  কিছু একটা বলে বিদায় নিয়েছি। তো এই বন্ধু তাহলে সেই বন্ধু? বহুত আচ্ছা দেখছি। সেকালে, একালে, এমনকি করোনাকালেও টেকো লোকেরা কি অনায়েসেই না সুন্দরী মেয়েদের বাগিয়ে নিচ্ছে। কোথায় তার লাতিন মুলুকের বলিভিয়া আর কোথায় জার্মান মুলুকের বাভারিয়া। রড্রিগোর টাকের জোরে একেবারে তাক লেগে গিয়েছিল আমার।     

রড্রিগো বোধহয় বলিভিয়ার পাট চুকিয়ে একেবারে পাকাপোক্তভাবে মিউনিখে ডেরা বেঁধেছে। ডরোথির বাবা-মা’র কাছে পরীক্ষা দিয়ে গোল্ডেন এ প্লাস সহ পাশ করে ডরোথির সাথেই আছে সে। তাও ভালো, নইলে এমন বিদঘুটে সময়ে মেয়েটা একা থাকতো। যাক, একটা ব্যাবস্থা হয়েছে। এই-সেই সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আরেকবার ক্রিং ক্রিং শব্দ কানে এলো। মুখ তুলে দেখি ফ্রাউ মায়ার এসে ঢুকছেন সাইকেলের ছাউনিতে।

শান্ত-সৌম্য চেহারার ফ্রাউ মায়ার পঁচাত্তর পেরিয়ে গেছেন। পুরো নাম বারবারা মায়ার। আমাকে বার কয়েক বলেছেন যেন তাকে বারবারা বলে ডাকি। লাভ হয় নি। স্লিপারের উপর থেকেই ডাক দিলাম, “ফ্রাউ মায়ার, কেমন আছেন?” অনেকটা দূরের ছাউনিতে দাঁড়িয়ে ভদ্রমহিলা হাত নাড়লেন অল্প হেসে।

দূর থেকেই জবাবদিহিতার সুরে বাজারের ঝোলাটা দেখিয়ে বললেন, “এক আধবার না বেরোলে কি চলে?”তার ঝোলা থেকে একটা নধর শশা, চারটা কলা আর এক আঁটি পেয়াজের পাতা মাথা বের করে আছে। কি মুশকিল, টঙ্গে উঠে বসে আছি দেখে লোকে আমাকে চৌকিদার ভাবছি নাকি। অত্র এলাকার সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে আজকে দায়িত্বে আছে ফ্রাউ সাবরিনা। দূরত্ব বজায় না রাখলে উনি গরম কফি ছুড়ে মেরে এক হাত দেখে নেবে
কফি না ছুড়ে চওড়া একটা হাসি ছুড়লাম ফ্রাউ মায়ারের দিকেজবাবে অবাক করে দিয়ে বিরাট এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো ছোটখাটো মানুষটা। এই দীর্ঘশ্বাসের মানে আমি জানি। অনেকগুলো বছর জার্মানদের সাথে উঠে বসে এই ভাষা আমার খুব জানা। বহুকালের যুদ্ধ-বিগ্রহ দেখা এই জাতটার মন কিছুটা ইস্পাত কঠিন। বিপদে এরা মচকায় না, ভাঙ্গেও না। তারপরও,  প্রতিদিনের বেড়ে চলা মৃত্যুর সারিটা ঠিকই মনকে ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে দিয়ে যায়। ফ্রাউ মায়ার আপন মনেই বললো যেন, ‘পৃথিবীটা কেমন বদলে গেল, তাই না? জানো, আমরা কেউ ভাবি নি সব এমন ওলট পালট হয়ে যাবে। পুঁচকে এক জীবানুর কাছে আমরা বন্দী হয়ে যাব‘ কথার পিঠে বলার মত কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। চুপ করে থাকলাম। কোত্থেকে এক খন্ড মেঘ এসে আকাশটা ঢেকে দিল হঠাৎ

ভদ্রমহিলা ছাউনি ছেড়ে যাচ্ছেন না। কিছু একটা শুনতে চান। মেঘটা যেমন এসেছিল, তেমনি উধাও হয়ে গেল। চারিদিক আবারও ঝকঝক করছে। আমিও সোজা হয়ে বসলাম। “ফ্রাউ মায়ার, মেঘ কেটে যাবে নিশ্চয়ই কাটতেই হবে। আমরা সবাই মিলে আবার খুব হাসবো একদিন“ মনের জোরে ঠোঁটের কোনায় একটা হাসি টেনে আনলাম। ফ্রাউ মায়ার সেদিকে না তাকিয়ে চোখ ঝলসে দেয়া সূর্যটার পানে চেয়ে কি যেন লুকালেন। কিন্তু রোদের ঝিলিক তার চোখের কিনারার চিকচিক লুকাতে দিলো কইশুধু অস্ফুটস্বর শুনতে পেলাম, “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। স্রষ্টা নিশ্চয়ই আছেন একজন“

নীল আকাশে মেঘেদের ভিড়ে আমিও স্রষ্টাকে আকুল হয়ে খুঁজতে থাকলাম।  

মিউনিখ, জার্মানি
০৮.০৪.২০


     
   


পর্তুগালের অলিগলি-১

১ এলোমেলো কয়েক পাক ঘুরতেই ছোট্ট লিসবন বিমানবন্দরটা ফুরিয়ে গেল। ডিউটি ফ্রি শপে কেনাকাটা করার লোক নই। তারপরও এক-দুইটা পারফিউমের বোতল টিপেটুপে ...