Wednesday, May 20, 2020

হাড়ি-নারী, হারি নারি


আঙ্গুলগুলো আজকে চিবিয়ে খেয়েই ফেলবো। দাঁত কিড়মিড় করছে। ঠিক দশ মিনিটের মাথায় নবাবপুত্রের খানা-পিনার পাট চুকিয়ে টেলি-কন্সফারেন্স ধরতে হবে। হোম অফিস চলছে আজকে দেড় মাস। হোমের ভেতর অফিস ঢুকে যাবার পর থেকে জীবন অতিষ্ঠ ঘরকন্না আর চাকরি মিলিয়ে জগা খিচুড়ি। এই লক্ষী হয়ে হাড়ি ঠেলো, তো পর মূহুর্তেই সরস্বতী সেজে রিসার্চ নিয়ে ভাবো রেতার উপরে শিশু পালন তো আছেই। অন্য সময় হলে শিশুর বাবার কাছ থেকে কিছু সাহায্য মেলে। সে সুযোগ নেই এখন। করোনাকে চোখ রাঙ্গিয়ে সপ্তাহের সব দিনই তাকে অফিস যেতে হচ্ছে। সুতরাং, একাই দশভূজা দূর্গা হয়ে দশ দিক সামলাতে গিয়ে আমার মেজাজটা আজকাল মা কালির মত সপ্তমে চড়ে থাকে। চোখা একটা ত্রিশূল হাতে বাড়ির লোকদের তাড়া করতে পারলে খুব শান্তি পেতাম।

আর বাড়ির লোকেরাও বটে। এই যেমন ছেলেটা সেই যে তখন বিশাল এক পোটলা খাবার মুখে ঢুকিয়ে গালটাকে উঁইয়ের ঢিঁপি বানিয়ে বসে আছে, আর গেলার নাম নেইবন্ধ চোখে তার মৌনি সাধুর ধ্যান। গিলে খেয়ে নিলে সাধনা ফুরিয়ে যাবে, এই ভয়ে গালে জিইয়ে রেখেছে এভাবে চলতে থাকলে সাধু বাবার আঙ্গুলও কামড়ে দিতে পারি। সাধু বাবার নাম তাফসু মিয়া। বয়স পাঁচ হয়ে সারে নি। কিন্তু সারাক্ষন আমাকে সাপের পাঁচ পা দেখাতে থাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে বাহানা দেখার সময় নেই হাতে। কোনোমতে খাদ্য পর্ব চুকিয়ে তাকে খেলতে পাঠিয়ে দিয়ে কিচেনেরই ছোট্ট টেবিলে ল্যাপটপ টেনে বসলাম

জুম লিঙ্কটা টিপে দিতে কাতিয়ার হাসি মাখা চেহারা ভেসে উঠল। কাতিয়া আমার বস। এক্সপেরিমেন্টাল প্যাথলজি বিভাগেরর হেড। এক নামে তাকে মিউনিখের টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই চেনে। জাঁদরেল বিজ্ঞানী। করনোর ভেতর আমাদেরকে হোম অফিসে পাঠিয়ে দিলেও নিজে প্রতিদিনই অফিসে যাচ্ছে, ল্যাব সামলাচ্ছে টেলি কনফারেন্সে আজকে আরো একজন যোগ দিয়েছে। প্রফেসর ডাক্তার রালফ্ হুসআউগসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ষাট পেরোনো শান্ত, সৌম্য চেহারা একই সাথে হাসপাতালের ডিজিটাল মেডিসিন বিভাগের প্রধান, আবার নামী গবেষকও বটে। তার সাথে মিলে আমরা একটা কোম্পানির সাথে ক্যান্সারের উপর নতুন একটা প্রজেক্ট শুরু করবো।

কিন্তু আলোচনা শুরু করবো কি, অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, প্রফেসর হুস্ আর কাতিয়া হাঁ করে কি যেন দেখছে আমার ঘাড় ডিঙ্গিয়ে। “এ্যাই, ওটা কি ঝুলছে ওখান থেকে?“। তাদের দৃষ্টি বরাবর তাকিয়ে একেবারে মরমে মরে গেলাম। রান্নাঘরের আঙটায় এবড়ো-থেবড়ো এক ফালি কাপড় ঝুলছে। সনাতনী রান্নাঘরীয় ভাষায় যাকে বলে ‘ত্যানা’। বাঙালি হেঁশেলের অবিচ্ছেদ্য অপরিহার্য অংশ। জবা ফুলের মত লাল হয়ে মস্তিষ্ক হাতড়ে বাংলা ত্যানার একটা ভদ্রস্থ ইংরেজি নাম খুঁজে নিয়ে জবাব দিলাম, ‘এ্যাঁ, ইয়ে মানে, ওটা কিচেন টাওয়েল’বলেই সিমেন্টের মেঝে খুড়ে তাতে সেঁধিয়ে যাব কি না ভাবছি।

এদিকে হো হো হাসির রোল উঠেছে। কাতিয়া খানিকটা দম নিয়ে বলল, ‘বুঝলে প্রফেসর, মাস খানেক ধরে এই কিচেনই সাবরিনার হোম অফিস সুতরাং হাসলে চলবে না কিন্তু, হা হা হা...‘ ততক্ষনে ল্যাপটপ ঘুরিয়ে নিয়েছি। ব্যাকড্রপে এখন কোনো পাঁচকোনা ত্যানা ঝুলে নেই। আছে কালো হুমদো চেহারার রেফ্রিজারেটর। তাও সই। আর জার্মানদের ত্যানা প্যাঁচানো স্বভাব কম থাকায় পেশাদার কথা বার্তায় ডুবে যেতে সময় লাগলো না। 

ঠিক মোক্ষম সময়ে মিটিং শেষ হল। আর সাথে সাথেই ‘মাআআ...’ বলে হুংকার ছেড়ে এক  দস্যু ঢুকে পড়লোকপট ভয় পাবার বদলে দস্যুর কিম্ভূত পোশাক দেখে হেসেই ফেললাম। তার হাতে কার্ডবোর্ডের ঢাল আর গলায় আমার কালো ওড়নাটা সুপার হিরোর কায়দায় ঝালর বানিয়ে ঝোলানো। কিন্তু পরনে শুধু সবুজ রঙের এক চিমটে জাঙ্গিয়া। এমনতর ডাকাত আগে দেখি নি, যার নিজের মান-ইজ্জতই ডাকাতি হয়ে গেছে। হাসিটা সরিয়ে খুব গম্ভীর স্বরে বললাম, ‘তুমি কে গো?’ উত্তর আসলো, সে নাকি একই সাথে ক্যাপ্টেন আমেরিকা, ব্যাটম্যান আর হাল্ক। সিনেমার পর্দায় হাল্ক নামের অতিনায়ককে কখনো জাঙ্গিয়া পরে উড়ে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি বলে মনে পড়লো না।

সে যাক গে, চাপাচাপিতে পড়ে খানিকক্ষনের জন্যে কাজে বিরতি দিতে হলকাগজের তলোয়ার বানিয়ে নিয়ে পরের আধা ঘন্টা ধরে দুই ফুটি হাইব্রিড সুপার হিরোর বনামে চলল এক তুমুল ঝন ঝন লড়াই

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে টনক নড়ল। আরেকটা মিটিং আছে। ঢাল-তলোয়ার ফেলে একটা যুদ্ধ বিরতি দিয়ে আবার ল্যাপটপের বোতাম চাপলাম। এক সাথে তিনটা মুখ দেখা গেল। তার ভেতর একজন ক্রিস্টিয়ান। ভীষন লম্বা, ঢ্যাঙ্গা মতন জার্মান ছেলেটা নিউরো-ফার্মাকোলজি বিভাগে পিএইচডি করছে। কাজটা অ্যালঝেইমার্স রোগের উপর। আমার সাথে তার কোলাবরেশন আছে। বাকি দু’জন ক্যারোলিন আর আনাস্টাসিয়া। জাতে একজন ফ্রেঞ্চ, আরেক রাশিয়ান। মাস তিনেকের জন্যে এই মেয়ে দু’টোর ব্যাচেলর থিসিস সুপারভাইজ করতে হবে। নিজের জ্বালায় বাঁচি না, আবার পরের কাজের তদারকি

তবে, সানন্দেই রাজি হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাবিলিটেশন প্রোগ্রামে ঢুকেছি। হাবিলিটেশন এক রকমের ডিগ্রি। থাকলে ভালো, না থাকলে ক্ষতি নেই। অধ্যাপনা পেশায় আসলে অবশ্য কাজে দেয়। তাই গবেষনার পাশাপাশি পরীক্ষার হলে ডিউটি দেয়া, ছোটখাট সুপারভিশন ইত্যাদির সুযোগ পেলে লুফে নিচ্ছিবছর খানেক খেটে খুটে হাবিলিটেশন করে হাবিলদার বনে গেলে মন্দ হয় না। আর হতে না পারলেও আফসোস নেই। ভেবে নেবো, চেষ্টা তো করেছি।

আলোচনায় তন্ময় আমরা চারজন ঠিক এমন সময়ে হুড়মুড়িয়ে খানিক আগের সুপারহিরো, ‘দ্যা জাঙ্গিয়াম্যান’ ঢুকে পড়লো। তার সাথে খেলতে হবে। এখন এবং এখনই। ইশারায় মাথা নেড়ে মাফ চাইলাম। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে রীতিমত আস্ফালন আর হম্বিতম্বি চলতে থাকলো। সাথে ব্রহ্মাস্ত্র হিসেবে ভ্যাক কান্না শুরু হল। এবার সত্যি বিপদে পড়ে গেলাম। ঘরে ঘরে নারী নির্যাতনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আসলে শিশুদের হাতে ঘটে থাকে- এই তথ্য কি কেউ জানে?

ক্রিস্টিয়ান, ক্যারোলিনদের কাছে এক মিনিটের জন্যে আলাব্বু নিয়ে নারী নির্যাতনকারী শিশু অপরাধীকে এক টুকরো চকলেট ঘুষ দিয়ে বাগে আনার চেষ্টা চালালামলাভের লাভ যা হল, চকলেটটা টপ্ করে মুখে পুরে সেই তো ভেউ ভেউ বিলাপে ফিরে গেল। যেই লাউ, সেই কদু। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে ক্রিস্টিয়ানদের সাথে শর্টকাটে আলাপ সেরে কাজের সাথে সে বেলার মত আড়ি দিতে হল।

আড়ি দিয়ে এবার হাড়ি চড়ালাম চুলায়। হাউ মাউ কান্নাকাটির আরেকটা কারন, খিদে। কারন, বেলা গড়িয়ে ঘড়ির কাটা দুই ছুঁই ছুঁই। খেয়ালই হয় নি যে দুপুরের খাবারের সময় যায় যায়। সরস্বতীটা আজকে খামচে খুমচে খুব ভাল মত ধরা গিয়েছিল, লেকিন লক্ষী বিবি তো ছুট গায়া। এমনিটাই হয় এক এক দিন। ওদিকে, কালো হুমদো ফ্রিজের পেটও গড়ে মাঠের মত ফাঁকা।

কি আর করা! চালে-ডালে-সবজিতে একটা গোঁজামিলের খিচুড়ি চাপিয়ে দিলাম। সকালে কল্পনার যে ত্রিশূল হাতে গজগজ করছিলাম, এখন সেটাকেই উলটে ধরে বাস্তবের খুন্তি বানিয়ে প্রবল বেগে খিচুড়ি নাড়তে লাগলাম। আর পুরোটা সময়ে কেউ একজন ঢাল তলোয়ার হাতে এলোপাথাড়ি শত্রু বিনাশ করতে লাগলো। তবে, মায়েদের জান বড় শক্ত। সামান্য কাগুজে তলোয়ারেই নাশ হয়ে গেলে জগত সংসার চলবে কি করে?

পেট ঠান্ডা তো সব ঠান্ডা কথাটা পুরোপুরি সত্য না। ছড়রা গুলির শব্দ তুলে লেগোর ব্লক ছুটে আসছে। আবার কেনো মা কাজে বসেছে, তাই এই অভিনব প্রতিবাদ। গা বাঁচিয়ে নির্বিকার একটা রিপোর্ট লিখে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ঠকাশ্ করে মাথার ঠিক পেছনে একটা আধলা ইটের মত কি যেন ছুটে এসে লাগলে আত্মহারা হয়ে হুংকার দিলাম, ‘অ্যাইই...একদম খেয়ে ফেলবো কিন্তু এবার!’। বেদম এক ফ্যাঁচ কান্না শুরু হল এবার। বেচারার দোষ নেই। মিউনিখের কিন্ডারগার্টেন করোনার কারনে ছুটি। ঘরে থাকা প্রতিটা মুহূর্ত শিশুরা সঙ্গ চায়, খেলার সাথী চায়। তার দুঃখটা বুঝে নিয়ে কাজ ফেলে আবারো হার মানলাম। তবে এভাবে আরো কিছুদিন চলতে থাকলে আমাকেও ফ্যাঁচফোঁচ কানতে দেখা যাবে। হোম অফিস না ভোম অফিস! দূর ছাই! রিপোর্ট লেখা রাতের জন্যে শিকেয় তুলে রেখে লেগো খেলতে বসে গেলাম।

আর কেউ শিশু পালন আর চাকরি নিয়ে এমন টালমাটাল অবস্থায় আছে কিনা জানতে দিন কয়েক আগে ডরোথিকে ইমেইল দিয়েছিলাম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা বিজ্ঞানীদের একটা মাসকাবারি আড্ডা বসে। ডরোথি সেটার আয়োজন করে। বিষয়বস্তু সাধারনত একটা গন্ডির ভেতর ঘুরপাক খায়। যেমন, ছোট বাচ্চাওয়ালা মায়েরা কেন বিজ্ঞানকে সেলাম ঢুকে ঘরের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে। কেন জার্মানিতে নারী বিজ্ঞানীদের সংখ্যা কমে কমে ডোডো পাখির মত ভ্যানিশ হবার যোগাড়। তাদেরকে কি কি সাহায্য-সুবিধা দিলে তারা আবার গ্রীক মিথোলজির ফিনিক্স পাখির মত জেগে উঠে বিজ্ঞানের জগতে একটা প্রলয় বইয়ে দিবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

মুশকিল হচ্ছে, আড্ডার লোকসংখ্যা ভয়াবহ কম। মহিলারা এদেশে ফিনিক্স পাখী হয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। তবুও বাকিরা যারা আসে, তাদের প্রানশক্তি প্রচুর। আমি আগ্রহভরে এই আড্ডায় যাই। চুপচাপ তাদের আলোচনা শুনি। গোটা খানেক স্যান্ডুইচ আর তিন-চার কাপ কাপাচিনো নামিয়ে সন্তষ্ট চিত্তে চলে আসি। ফ্রি ফ্রি খানাপিনার যেকোনো আয়োজন খুব গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে। একটা লাভ অবশ্য হয়েছে। বেশ কিছু পিএইচডি, পোস্টডক আর জুনিয়র গ্রুপ লিডারদের সাথে হালকা সখ্য গড়ে উঠেছে।

ভাবলাম, করোনার এই ফাপরকালীন সময়ে তাদের সাথে কথা বললে হয়তো মনের ক্ষেদ মিটবে কিছুটা। বাচ্চা কাচ্চা চ্যাও ভ্যাও নিয়ে হোম অফিস নামের প্যারার ভেতর তো তারাও আছেএই গ্রহে আমি একাই এই মাইনকা চিপায় পড়ে নেই নিশ্চয়ই।

তাজ্জব ব্যাপার। দেখা গেল, তারা কেউ কাজ থেকে ছুটি নিয়েছে, কেউ বাবাদের সাথে ভাগ করে ছানাপোনা পালছে, কেউ এক ঘন্টা কাজ করছে তো পরের ঘন্টায় ঘর সামলাচ্ছে ইত্যাদি। মোদ্দা কথা, সব কিছু দারুন পেশাদারি হাতে সুচারুভাবে চলছেএই না হলে জার্মান ডিসিপ্লিন আর নিঁখুত যান্ত্রিক প্রোডাক্টিভিটিতাদের বাচ্চারা নাকি অহেতুক কাঁদেও না। নিপাট ভদ্রলোকের মত পাশে বসে নিজের মনে খেলে। দেখেশুনে বিরাট লজ্জায় পড়ে গেলাম। সামাল দিতে না পারার অপরাধবোধটা ছোট্ট পিঁপড়া থেকে এত্ত বড় হাতি হয়ে গেল। তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, একটা দেশী ছানা পেলে-পুষে দেখো পারলে। ও তোমাদের পাঁচটা জার্মান বাচ্চা পালার সমান, হুঁ হুঁ। ব্যর্থ লোকজন অজুহাত বেশি খোঁজে আর কি।


সবুজ সাগরে সফেদ ফেনা বুদ্বুদ তুলছে। কি চমৎকার দৃশ্য। কিন্তু মুহূর্তেই ভুলটা ভাঙলো। রান্নাঘরের মেঝেতে ডিটারজেন্টের সবুজ বোতলের পেটে চেপে সমুদ্দুর বানানো হয়েছে। তাতে হুটোপুটির ফলস্বরূপ খানিকটা ফেনা তৈরি হয়েছে। দৃশ্য দেখে অধিক শোকে পাথর হবার যোগাড়। শরৎচন্দ্রের ভাষায়, “তাহারি মাঝখানে হাতে পায়ে পিচ্ছিল তরল মাখিয়া ভূত হইয়া যে পঞ্চবর্ষীয় বালক দাঁড়াইয়া নিষ্পাপ শিশুতোষ হাসি হাসিতেছে, উহাকে দেখিয়া তাহার মাতার পিত্তি জ্বলিয়া একেবারে খাক হইয়া গেল”দুই মিনিটের জন্যে এক সহকর্মীর সাথে ফোনালাপে ছিলাম পাশের ঘরে। আর ফাঁকতলে একি কান্ড!

পরিস্থিতির কাছে হেরে যাওয়াটা হেড়ে গলায় ডাক ছেড়ে গান গাওয়ার মতই সহজ। এই মুহূর্তে তাই করবো কি না ভাবছি। চিন্তায় গাল চুলকে প্রায় ছাল তুলে ফেললাম। তারপর সিদ্ধান্ত হল, মেজাজ হারালে চলবে নাতাই বিশাল একটা বাজখাঁই হুংকার দিতে গিয়েও থেমে গেলাম। কারন, ছোট শিশুদের সাথে চ্যাঁচামেচির ফল মারাত্মক। তারা তখন মাকে শত্রু ধরে নিয়ে আরো পাঁচ রকমের অনাসৃষ্টির ফন্দি আঁটে।

চার দেয়ালে বন্দী থাকলে লোকের এমনিতেই কিছুদিন পর পাগল পাগল লাগে। আর আমরা প্রায় দুই মাস ধরে করোনা কা ধামাল সামাল দিতে বসত বাড়ির কয়েদে আছি। চার হাতে পায়ে বানরের মত হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটছি না যে এটাই বেশি। শিশুদের তো আরো জ্বালাতাদের পেট ভর্তি এনার্জি। অথচ খরচ করার জায়গা নেই। এই প্রথম বোধহয় রাগ না করে বেচারার দুঃখটা বোঝার চেষ্টা করলাম। দ্রুত হাতে ডিটারজেন্টের সবুজ সাগর শুকিয়ে খটখটে করে শুধালাম, ‘এক পাক দৌড়ে আসি, চলো’। উত্তরে যেন একশো ওয়াটের বাল্ব জ্বলে উঠলো। 

তাফসু মিয়া দৌড়াতে পছন্দ করে। এই স্বভাব খুব সম্ভবত সে তার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে। বাড়ির কাছেই নদী আছে এক চিলতে। নাম তার ইজার। নদীর পাড় ঘেঁষে খোলা মাঠে দৌড়ে বেড়ানোর মজাই আলাদা। ল্যাপটপের ঝাঁপি ফেলে চটপট পোষাক পাল্টে নিলাম। তাফসু মিয়াকে দুর্দান্ত লাগছে ট্রাইজারের সাথে ছোট্ট নীল স্পোর্টস টি-শার্টে মুখে মাস্কের কারনে তাকে আসলেই সুপার হিরোদের মত দেখাচ্ছে। ওদিকে, একই মাস্ক পরে আমাকে সাক্ষাৎ সিঁধেল চোরের মত লাগছে।

যাহোক, মিউনিখের লকডাউন আস্তে আস্তে ডাউন হয়ে আসছে। দোকানপাট, অফিস- আদালত খুলছে। হাঁটা চলা কি দৌড়ে অবশ্য আগে থেকেই বাধা ছিল না। কাজের চাপে সামান্য ঘুরে আসার ইচ্ছাটাও কাজ করে না। আজকে তাই বহুদিন পর গর্ত থেকে মাথা বের করে সুর্যের ঝিলিকে আনন্দে অন্ধ হবার যোগাড়। 

খানিক আগে হোম অফিসের মন্ত্রনায় আর ছোট শিশুর যন্ত্রনায় চোখে সর্ষে ফুল দেখছিলাম আর এখন অবারিত সবুজে চোখ ধাঁধিয়ে রীতিমত হতভম্ব হয়ে গেলাম। মানুষের উৎপাত থেকে ক’টা দিন রেহাই পেয়ে প্রকৃতি ইচ্ছেমত সেজেছে। নন্দন কানন কোন ছাড়। এলোমেলো পা চালিয়ে দৌড়াতে থাকা তাফসু মিয়ার ছোট্ট চোখে বিস্ময় আর ধরে না। সে একবার নদীর পাড়ের হাঁসদের ধাওয়া করে তো, পর মুহূর্তেই পড়ে থাকা কঞ্চি তুলে রাখাল বনে গিয়ে অদৃশ্য ভেড়ার পাল চড়ায়।

সপ্তাহের মাঝের দিন। লোকের আনাগোনা কম। ছেলেটার উচ্ছ্বাসের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছি। চার দেয়াল যেন ক্রমশ চেপে ধরেছিলহঠাৎ ইট কাঠের কব্জা থেকে মুক্তি পেয়ে পাঁজরের ফুসফুস বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছে অবাক হয়ে দেখলাম, মনেরও একটা ফুসফুস আছে, সেও আজকের খোলা হাওয়ায় মরচে ঝেড়ে ঝকঝকে চেহারা নিয়েছে। শিশু পালন আর কাজকর্মের চাপকে আর পাহাড়ের মত ভারী লাগছে না। ছোটখাট টিলা মনে হচ্ছে বড় জোর যেন অনায়াসে তাকে লাফিয়ে ডিঙ্গিয়ে পেরোনো যাবে। এই আনন্দটাই যে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো এই কয়দিন। আজকে রোদের কনায়, শিশুর হাসিতে, উড়ে যাওয়া হাঁসের ডানায় তাকে ফিরে পেয়ে নিজেকে শিমুল তুলার মত হালকা লাগছে। বেঁচে থাকার কুসুম কুসুম বোধটা আড়মোড়া দিয়ে জেগে উঠে হতবিহ্বল করে দিচ্ছে।

তুলার মতই প্রায় উড়ে উড়ে দু’জন ঘরে ফিরলাম। আঙ্গুলের ইশারায় অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সারাদিনের লন্ড ভন্ড ঘর গুছিয়ে, আরেক প্রস্থ হাড়ি নেড়ে রেঁধে বেড়ে, ছেলেকে খাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে হদ্দ ক্লান্ত না হয়ে, দারুন চনমনে মন নিয়ে আবার কাজে বসলাম। মনের অতলে যে বল পেলাম, আকারে সে প্রায় ছোটখাট একটা ফুটবলের মতই প্রমান সাইজ। এই মনের বল আর কিছুতেই হারাতে দেয়া যাবে না। মহামারির এই প্রচন্ড সময়ে বেঁচে থাকাটাই আসল জিতে যাওয়া। সামান্য গেরস্থালি উৎপাতে হেরে ভূত হয়ে গেলে ষোলো আনাই যে জলে গেল।

কি মনে করে এক পলকের জন্যে টেবিল থেকে উঠে গেলাম। নিপাট বিছানার ঠিক মাঝখানে ঘুমের রাজ্যে বিভোর ছোট্ট তাফসু মিয়াশিশুদের গায়ে ধোঁয়া ওঠা ভাতের সফেদ একটা বিশুদ্ধ ঘ্রান থাকে। নাক ডুবিয়ে সেই ঘ্রান টেনে নিলাম। এই ক’টা দিন তাকে শত্রু ঠাউরে কতই না বিরক্ত হয়েছি। কাজকেই এক নম্বরে রেখেছি। আর তাকে দুইতে। অথচ উল্টোটাই সহজাত, উল্টোটাই প্রাকৃতিক। শিশুরা নক্ষত্রের মতন। তাদের ঘিরেই আসলে ক্যারিয়ার, ঘর-গেরস্থালি নামের গ্রহগুলোর ঘুরে বেড়ানোর নিয়ম। ঠিক করলাম, ছোট শিশু কোলে কাঁখে হাসিমুখে যতটুক এগোনো যায়, তাই সই। কালকে থেকে ব্যক্তিগত সৌরজগতটা তাই ঢেলে সাজাতে হবে নতুন করে।

এতে কোনো হার নেই, বরং পুরোটাই জিত।

মিউনিখ, জার্মানি
১৯.০৫.২০২০

Friday, May 1, 2020

ভোঁওও...ইন্টারভিউ


 
১ 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ দিয়ে বেড়িয়েছি প্রায় আট মাস। জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিষয়টা দেশে নতুন। চাকরির ভবিষ্যৎ তাই ফকফকে। এটা বুঝে নিয়ে ডানে বামে বন্ধুরা স্কলারশীপ বাগিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় উড়াল দিচ্ছে। কিছুটা অলস আর গবেট প্রকৃতির হওয়ায় আমি এসবের ধার না ধেরে আরামসে তাদেরই কারো কারো বিয়ে খেয়ে বেড়াচ্ছি। আজকেও সেজেগুজে প্রায় নেচে নেচে বিয়ে বাড়ী গিয়েছিলাম। জবরদস্ত এক মুরগীর ঠ্যাং, দেড় প্লেট পোলাও আর দুই গ্লাস বোরহানি গিলে এখন মাতাল মাতাল লাগছে। টালমাটাল বাড়ি ফিরে বাম দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়েছি

ঘুমটা জমে মাত্র ক্ষীর ভাব এসেছে, আর অমনি তড়াক্ করে উঠে বসলামমনের খচখচানিটা একটা বিড়াল সেজে লেজ বাগিয়ে কান চুলকে দিয়েছে। গত কয়েকদিন আলসেমির বশে অ্যাপ্লিকেশনগুলো নিয়ে আর বসা হয় নি স্কলারশীপ তো আর বৃষ্টি না যে আকাশ থেকে টুপটপ করে কোল এসে পড়বে। কিন্তু এত রাতে বিবেকের অত্যাচার ভাল লাগে না, ধ্যাৎ! আরো কটা গুরুতর গালি দিয়ে মুখে পানির ঝাপ্টা মেরে ঘাড় সোজা করে বসলাম।

আধো ঘুমের ভেতরই নেচার জবস-এ একটা স্কলারশিপের বিজ্ঞাপন দেখলামএই ওয়েবসাইটা ছাড়া আর কিছু চিনি না জানি না দেখে সুবিধে হয়েছে। এখানে পিএইচডির খবরাখবর খুব কম। তাই এই একখানেই ঘুরি ফিরি। প্রফেসরের এক আধটা পেপার পড়ে অন্ধের মত লিখে দেই যে তার গবেষনায় আমি মন্ত্রমুগ্ধ। তাকেই তো খুঁজছিলাম এতদিন, ইত্যাদি। কিন্তু বানিয়ে লিখলে লোকে কেমন করে যেন টের পেয়ে যায়। সেজন্যেই বোধহয় এ পর্যন্ত কোন জবাব মেলে নি। শুধু লেখাই সার হয়েছে।

যাহোক, বিজ্ঞাপনটা জার্মানির একটা রিসার্চ সেন্টারের। হেল্মহোল্টজ সেন্টার মিউনিখ।  আর পিএইচডি ডিগ্রিটা দেবে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষনার বিষয়, বিড়ি-সিগারেট খেলে লোকের ফুসফুসে যে ক্রনিক রোগ বাসা বাঁধে, তার উপরমাউস মডেলের উপর গবেষনার অভিজ্ঞতা আছে, এমন কাউকে খুঁজছে ওরা। নড়েচড়ে বসলাম। একটু আগের বাদশাহী খানাপিনার কারনেই কি না কে জানে, হঠাৎ করে নবাবী মেজাজ পেয়ে বসলো। বরাবরের মত ইনিয়ে বিনিয়ে ফেনিয়ে গপ্পো ফাঁদলাম না। বরং এক পাতারও কম ছোট্ট একটা মোটিভেশনাল লেটার লিখে ফেললাম।

তার সারসংক্ষেপ অনেকটা এরকম, ‘বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করেছি ইঁদুরের উপর আর্সেনিকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে। কাজটা করতে গিয়ে ভীষন আনন্দ লেগেছে। বিজ্ঞানকে যে ভালবেসে ফেলা যায়, তখনই প্রথম জেনেছি। বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে ছোট একটা ফান্ডও জুটে গিয়েছিল লেখালিখি করে গ্রান্টের আবেদন করায়। কিন্তু, আমাদের দেশে গবেষনার সীমাবদ্ধতা আছে। চাইলেও অনেক কিছু শেখা যায় না। যেমন, আমার ব্যবহারিক জ্ঞান ভয়াবহ কম। তোমাদের ওখানে যদি গবেষনার সুযোগ মেলে, তাহলে সে ঘাটতি পুষিয়ে নিয়ে আরো নতুন কিছু শেখা যাবেআমি এই সুযোগটা চাই। তাছাড়া, অসুখ-বিসুখ নিয়ে গবেষনার একটা ট্রান্সলেশনাল দিক আছে। আজ না হয় কাল তার ফল লোকের কাজে লাগে। একটা তৃপ্তি কাজ করে। আমি এই তৃপ্তিটা পেতে চাই।‘

সাথে একটা নাতিদীর্ঘ সিভি জুড়ে দিয়ে ব্যাস্ পাঠিয়ে দিলাম ইমেইলটা। আর ওদের চাহিদামত দুইটা রেকমেন্ডশন লেটার যোগ করতে ভুললাম না। ক্লাসে তেরো জনের ভেতর বরাবর বারো নম্বর রোলের ছাত্রীর জন্যে খুব যত্ন করে এই চিঠিগুলো লিখে দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গুরু মানা দুই শিক্ষক আকন্দ স্যার আর নাজমুল স্যার। গুরু দোয়া থাকলে তার শিষ্য একদিন কামিয়াব হবেই -এই অগাধ বিশ্বাস নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে গেলাম সেদিনের মত

২.
মাঝে কিছু দিন কেটে গেছে। এদিক সেদিক টুকটাক চাকরির চেষ্টা করেছি। আরো কিছু বিয়ের দাওয়াতও খেয়ে ফেলেছি। খেয়ে দেয়ে কয়েক কিলো ওজন বেড়ে যাওয়া ছাড়া লাভের লাভ হয় নি। তবে স্কলারশীপের চেষ্টাটা চালু রেখেছি। প্রতিদিন নতুন একটা ল্যাবে লিখি। কিংবা গ্রাজুয়েট স্কুল বরাবর অ্যাপ্লাই করি। তবে চালাক হয়ে গিয়েছি। যারা ছাত্র চেয়ে পিএইচডি বৃত্তির কথা লেখে, শুধু তাদের কাছেই  লিখি। এটা এক ধরনের আলসেমিও বটে।

কিন্তু অবাক করে দিয়ে আগস্টের এক শুক্রবার সকালে এল এক আশ্চর্য উড়াল চিঠি। চায়ে ডুবিয়ে বিস্কুট খাচ্ছিলাম আয়েশ করে। ইমেইল দেখে চোখ ছানাবড়া। এই সুযোগে এক চুমুক গরম চা শ্বাসনালী দিয়ে শর্টকাট মেরে সোজা ফুসফুসে চলে গেল। বিষম খেয়ে যক্ষা রোগীর মত কাশতে কাশতে দেখি একটা ইন্টারভিউয়ের ডাক পেয়েছি। তাও খোদ জার্মানিতে। ঐ যে সে রাতে ফুসফুসের রোগের উপর বিজ্ঞাপন দেখে যে অ্যাপ্লিকেশনটা ছেড়েছিলাম, তারা মিউনিখে ডেকেছে তিন দিনের জন্যে। ভ্রমন বাবদ সব খরচই তাদের আগ্রহী হলে যেন এক্ষুনি জানাই। ওরা ভিসার কাগজ পাঠাবে। সময় কম। ইন্টারভিউটা আগস্টেরই শেষে।   

এক নিঃশ্বাসে ই-মেইলটা পড়ে প্রায় ভেসে ভেসে মায়ের কাছে গিয়ে হড়বড় করে ঘটনা জানালাম। আশির দশকে ফ্রান্স থেকে পিএচডি করা মা মুখে চওড়া হাসি, কিন্তু কপালে ভাঁজ নিয়ে তাকালো। আইবুড়ো মেয়ে আঙ্গুলের ফাঁক গলে বেরিয়ে গেলো বুঝি এবার। কিন্তু এদিকে ব্যাটে-বলেও তো মিলছে না। সুতরাং, তার কাছ থেকে একটা নিমরাজি হ্যাঁ আদায় করে ভিসার কাগজ দাঁড় করাতে লেগে গেলামআগস্টের কালেন্ডার খুব দ্রুত পাতা ওল্টাতে থাকলো।  

৩.
অবিশ্বাস্য অল্প সময়ের ভেতর ভিসা হয়ে গেল। ভিসা অফিসার স্মিত হেসে পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ইন্টারভিউ নিতে লোক উড়িয়ে নিয়ে যায়, এমন কেস আমরা খুব একটা দেখি না। আপনি খুব ভাল করে ইন্টারভিউ দেবেন, ঠিক আছে? স্কলারশিপটা কিন্তু পেতেই হবে।‘ বিরাট একটা ধন্যবাদ দিয়ে ফুরফুরে মনে টিকেট কাটতে ট্রাভেল এজেন্টের অফিস চলে গেলাম বড় ভাইয়ের সাথে।

এজেন্ট অফিসার চিন্তিতমুখে বসে আছে। ‘সাড়ে সাত ঘন্টা ট্রানজিট দোহায়। আপনার কষ্ট হয়ে যাবে। নাহ্, চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এত দূর যাচ্ছেন, এত কষ্ট পোষাবে না।‘ শুধরে দিতে চাইলাম, ‘চাকরি না , একটা পিএইচডি স্কলারশিপের ইন্টারভিউ ভাই...।’ ভদ্রলোক কম্পিউটারে  ব্যস্ত হয়ে গেলেন। পাঁচ সেকেন্ড পরে ঝলমলে মুখ তুলে ঘোষনা দিলেন, ‘আট ঘন্টার একটা ট্রানজিট পেয়েছি। এই আট ঘন্টা এয়ারপোর্ট লাগোয়া পাঁচ তারা হোটেলে নিয়ে যাবে ওরা। খাবেন দাবেন আর আরাম করবেন। শর্ত একটাই, জার্মানি গিয়ে ইন্টারভিউটা ভাল করে দিতে হবে কিন্তু, হা হা হা।‘

দোহার সেই পাঁচ তারা হোটেলে সফেদ বিছানায় বালিশে ভর দিয়ে ল্যাপটপের কাজ করতে করতে ভাল মানুষ এজেন্ট অফিসারের কথাগুলো কানে বাজছে। নিরিবিলি সময়টার জন্যে কৃতজ্ঞ লাগছে। ইন্টারভিউয়ের প্রথম দিনে একটা প্রেজেন্টশন দিতে হবে। মাস্টার্সের থিসিস প্রেজেন্টশনটাই কাটছাট করে ঢেলে সাজিয়েছিতিরিশটা স্লাইড থেকে এক ধাক্কায় তেরোতে নেমে এলামকারন, বরাদ্দ সময় দশ মিনিট মাত্র। কাজটা গুছিয়ে আনতে আমার আট ঘন্টার সময়টাও যেন দশ মিনিটে ফুস্ করে ফুরিয়ে গেল। ছুটলাম পরের ফ্লাইট ধরতে।

৪.
প্লেনে পাশের সিটে ইউরোপিয়ান এক গোমড়ামুখো বুড়ো বসেছে। আমি সিটের বোতামগুলো যথেচ্ছা টিপাটিপি করে তাকে তিতিবিরক্ত করে ফেলছি। চোখের ওপর একটা বাতি জ্বলছে। সেটা নেভানোর সুইচ খুঁজছি। বুড়োটা আর না পেরে বলেই বসলো, ‘এই মেয়ে, এত জ্বালাচ্ছো কেন বলো তো। মাথায় কি ঘিলু বলতে কিচ্ছু নেই? বাতির বোতাম সিটের কই থাকে জানো না?’ ঘাবড়ে চুপসে গিয়ে বিড়বিড় করলাম, ‘মাফ করবেন, এই প্রথম বিদেশ যাচ্ছি তো। কেতা-কানুন তেমন একটা জানি না‘ বুড়োটা চেহারা নরম করে ফেললো, ‘এই দেখো, এখানে চাপ দাও।‘ অস্বস্তিকর বাতিটা নিভে গেল আরামদায়ক অন্ধকার এনে দিয়ে। খানিকবাদে দেখা গেল, বুড়োর সাথে ভাব জমে উঠেছে। আরো জানা গেল, ফ্রান্সিস নামের বেলজিয়ান এই ভদ্রলোক তার ব্যবসার কারনে দুই বছর চিটাগাঙে থেকেছেন। বাংলাদেশ তার হাতের তালুর মত জানা। এখন ব্যবসার কারনে জার্মানিতে আছেন কিছু বছর ধরে।

রাত এগারোটা। প্লেন মিউনিখ ছুঁয়েছে। হাতের ঠিকানা ফ্রান্সিসের হাতে সেও একই দিকে যাচ্ছে। লোকটা না থাকলে ভুল ট্রেনেই উঠে যেতাম নিশ্চিত। নতুন দেশে এসে সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কয়েক স্টেশন পর নেমে যাবো। ফ্রান্সিস একটা কার্ড ধরিয়ে বললো, ‘হোটেলে ঠিক মত পৌঁছেছো কিনা অবশ্যই জানাবে। নইলে হাবাগোবা বাংলাদেশী মেয়েটার জন্যে ভীষন চিন্তায় থাকবোআর ইন্টারভিউ কিন্তু ভাল হওয়া চাই‘ অদ্ভূত ভাল লাগায় তাকে বিদায় জানিয়ে আলো-আঁধারে ঢাকা রাস্তায় নেমে পড়লাম। আর খুব হুশিয়ার হয়ে পরের বাসটা ঠিকঠাক ধরেও ফেললাম।

৫.
হোটেলটায় আমি একা না। আরো বারো দেশের ছেলে মেয়ে এসেছে। সবাই আমারই মত ইন্টারভিউ দিতেই এসেছে। সকালে সবাই ব্রেকফাস্ট টেবিলে আলাপ হল। আলাপটা চললো এক সাথে বাস নিয়ে রিচার্স সেন্টারের ক্যাম্পাস গ্রোসার্ডেন যাবার পথেও। সেখানে পৌঁছে দেখা গেল সব মিলিয়ে আমরা চব্বিশ জন। কয়জনকে নেবে কে জানে। মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। তীরে এসে তরী ডুবিয়ে ফিরে যাবো মনে হচ্ছে।

আজকে সারাদিন ধরে সবার প্রেজেন্টেশন চলবে একটার পর একটা। আমার পালা আসলে আড়ংয়ের সিল্কের ফতুয়ার ভেতর ঘামতে ঘামতে ঘোরের ভেতর কি যেন সব বলে দশ মিনিটের মাথায় ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে থামলামঅনেকগুলো প্রশ্ন আসলো। সাহস করে হাসি মুখে উত্তর দিলাম মগজে যদ্দূর যা কুলালো। তারপরের দৃশ্যেই দেখা গেল, তিন বোতল কমলার জুস খেয়ে চোখ বন্ধ করে পেছনের সারিতে গা এলিয়ে দিয়েছি।

ঘুমিয়েই গিয়েছিলাম বোধহয়। খোঁচা মেরে উঠিয়ে দিয়ে পোল্যান্ড থেকে আসা মেয়েটা বলল, ‘চলো, বাস ধরতে হবে। আরেকটা ক্যাম্পাস আছে ওদের। দেখাতে নিয়ে যাবে।‘ পটাং করে সজাগ হয়ে তার পিছু পিছু চললাম। কমলার জুসের ফ্রুক্টোজ কাজ দেয়া শুরু করেছে।

৬.
ঝাঁ চকচকে ল্যাব আর তার ঝকমকে সব যন্ত্রপাতি দেখে চোখ ট্যারা হয়ে গেল এক রকম। আরো নিয়ে যাওয়া হল অ্যানিমেল ফ্যাসিলিটিতে। বিশাল এয়ার কন্ডিশন্ড চেম্বারের শ’খানেক খাঁচায় প্রায় হাজার খানেক সাদা কালো ইঁদুর সাজিয়ে রাখা। তাদের চোয়ালগুলো ব্যস্ত বাদামী খাবারের বলগুলো চিবোতে। এদিকে, হাতে-পায়ে প্লাস্টিকের গ্লাভস-জুতা আর গায়ে গলাবদ্ধ এপ্রোন জড়ানো আমাদের সবাইকে মহাকাশচারীর মত লাগছে। তারই ভেতর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করলাম সাথের প্রফেসরকে।

দুই দিন আগেও ভাবি নি এমন কোথাও কখনো এসে পড়বো। মনে পড়ে গেল, ঢাকার আইসিডিডিআরবি থেকে ইঁদুর কিনে সিএনজিতে সেই খাঁচা কোলে করে এনে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ভীষন গরম ঘুঁপচি ঘরে রেখে মাস্টার্সের থিসিস করেছি। গরম থেকে বাঁচাতে ইঁদুরের দিকে টেবিল ফ্যান তাক করে রাখা হত। একবার বেজিতে এসে ক’টা ইঁদুর নিয়েও গিয়েছিল। গেল বর্ষায় ঘরটার তালা খুলতে গিয়ে একটা সাপকে গুঁটলি পাঁকিয়ে দরজার সামনে বসে থাকতে দেখে চিল চিৎকার দিয়ে আরেক দিকে দৌড় মেরেছি।

আমার অবাক বিস্ময় দেখে প্রফেসর বলেই ফেলল, ‘তোমার খুব ভাল লাগছে মনে হয়? আমরা
ফিরে যেতে যেতে তোমার বাকি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, এসো।‘ বিনা বাক্যব্যয়ে সানন্দে তার পিছু নিলাম।

পরের দিন অবশ্য বাক্য ব্যয় না করে উপায় থাকলো না। আসল ইন্টারভিউ হচ্ছে আজকে। সাত-আট জন রিসার্চ গ্রুপ লিডার আমাদের চব্বিশ জনকে ভাগ করে নিয়ে এক জন এক জন করে ডেকে নিচ্ছে তাদের অফিসেপ্রায় একই রকমের প্রশ্ন শুনে আর একই উত্তর দিয়ে দিয়ে আমি হদ্দ ক্লান্ত। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, এটা একটা ধৈর্য্যের খেলা। এ পর্যন্ত আমাকে যা যা করতে হয়েছে, সেখানে বুদ্ধির অংশ কম। চিনা জোঁকের মত দাঁত কামড়ে লেগে থাকার পরিমান বেশি। ক্লান্তিকে ঠেলে দূরে পাঠিয়ে ধৈর্য্যকে কাছে ডাকলাম আর হাসিমুখে পাঁচ নম্বর বারের মত পা বাড়ালাম। 

.
অতি দীর্ঘ এক ভাইভা পর্ব চুকিয়ে দুপুরে সবাই দল বেঁধে খেতে গিয়েছিলামগলা দিয়ে কিছু নামছে না। আনমনে টিস্যুর কোনা আঙ্গুলে প্যাঁচাচ্ছি দেখে সাথের চাইনিজ ছেলেটা মুখভর্তি বার্গার সমেত তাড়া দিল,  ‘এই,... গপ্গপ্... খাচ্ছো যে তুমি, গপ্গপ্? তার পাল্লায় পড়ে ঢোক গিলে গিলে কোনোমতে খাওয়া সারলাম।

ফিরে এসে দুরুদুরু বুকে অপেক্ষায় আছি। একটা লিস্ট নিয়ে সেক্রেটারির মত একজন ছুটাছুটি করছে। হঠাৎ কারো হাতে কাগজটা দিয়ে দেয়া হল। পনেরোজনের হাত ঘুরে লিস্টি হাতে এলে এক চোখ বুজে আরেক চোখ ছোট করে তাকালাম সেদিকে। একি, মাত্র চারটা নাম! এত হুজ্জোত করে দুই ডজন লোক এনে নিল মাত্র এক হালি। কাগজটা নাকের সামনের ধরলাম। আরে কি বিচিত্র ব্যাপার! আমার নামটা দেখি তিন নম্বরে জাঁকিয়ে বসে আছে!

আমার অবিশ্বাস আর কাটে না। হাতে কিল মেরে এক চোট হেসে নেবো ভাবছি। ওমা, পাশের তুর্কি মেয়েটা দেখি ফুচ্ফুচ্ করে কাঁদছে। আমার দিগ্বিজয়ী হাসিয়ে মিলিয়ে গেল। ‘জানো, আমি ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট নই বলে আমাকে নিলো না। তিন বছর আগে মাস্টার্স শেষ করেছি। কি এমন বড় গ্যাপ এটা, তুমিই বলো?’ এই প্রতিযোগিতার বাজারে বিরতি মানেই যে কমতি, সেটা আর ভেঙ্গে বললাম না ওকে। খালি তার হাতটা ধরে নরম গলায় বললাম, ‘মনমরা হয়ে কি লাভ, ভাই। তার চেয়ে আবার চার হাত-পায়ে অ্যাপ্লিকেশন শুরু কর। সামনের তিন মাসের ভেতর কিছু না জুটলে আমার নাম পাল্টে দিও।‘ মেয়েটা চোখ মুছে হাসলো আর পাল্টে দেবার জন্যে আমার পুরো নাম আর ইমেইল কাগজে টুকে নিলো।

এই ঘটনার দেড় মাস পরে সত্যি সত্যিই এক তাজ্জব ইমেইল এসেছিলো, ‘জুরিখ ইউনিভার্সিটিতে আমার ফুল স্কলারশিপ জুটে গেছে, রিম। তোমার নাম পাল্টে আর কাজ নেই, কি বলো?’

৮.
তবে নাম তো ঠিকই পাল্টেছে। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসের ছাব্বিশ তারিখজাঁদরেল প্রফেসর অলিভার আইকেলবার্গ পিএইচডি কমিটির বাকিদের ভেতরে রেখে বেরিয়ে এসে আমার গুঁটিয়ে রাখা হাতটা খুঁজে নিয়ে চাপ দিয়ে হুংকার দিল, ‘কংগ্রাচুলেশন্স! প্রশ্নগুলো কি ওন্ডার তোমাকে আগের রাতে শিখিয়ে দিয়েছিল নাকি? নইলে একটা প্রশ্নও তো মাটিতে পড়তে দিলে না...।’ তার মুখের কথা প্রায় কেড়ে নিয়ে আমার গাইড ড. আলি ইলদ্রিম ওন্ডার এগিয়ে এসে সহাস্যে প্রতিবাদ জানালো, ‘একদম বাখোয়াজ কথা, অলিভার।‘ তারপর ছয় ফুটি আকৃতিটা গালিভারের মত ঝুঁকিয়ে আমাকে থাবায় পুরে নিয়ে শুধালো, ‘হেই রিম, আজকে থেকে তুমি ডক্টর সরকার বনে গেলেনামটাই তো পাল্টে গেলো এক ধাক্কায়, হা হা হা...!’ গালিভারে থাবা থেকে সুড়ুৎ করে পালানো লিলিপুটের মুখেও তখন একান ওকান হাসি।

কিন্তু গল্পের আরো বাকি আছে। নিশ্চিন্ত ছাত্রজীবন পেছনে ফেলে এবার শুরু হল চাঁছাছোলা বাস্তব জীবনের ঘাটে ঘাটে ঘোলা পানি খাওয়া। অথচ এমনটা হবার কথা না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের বিভাগ জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তিতে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছি। ভীষন খুশির খবর। কিন্তু আমাকে দেখা গেলো প্রতিদিন ক্লাস শেষে মোকাররম ভবনের গেটে মাথা নিচু করে বসে আছি বিষন্নতায় মনটা অবশ। সাড়ে তিন মাসের ছেলেটাকে নিয়ে চাকরিটা করতে একাই চলে এসেছি। ছেলের বাবা রয়ে গেছে জার্মানিতে। দেশে তার চাকরির বাজার মন্দা। এদিকে, অতি ছোট বাচ্চা ঘরে রেখে আমিও বাইরে পড়ে থাকি সারাদিন। অপরাধবোধ কুড়ে খায়।

টানাপোড়েনের শক্তি অনেক। হার মেনে সব ছেড়ে জার্মানি ফিরে এলাম তবে ফিরে জিতেও গেলাম। তিন জন মিলে ছোট্ট পরিবার আবার। একটা পোস্টডক শুরু করলাম। সেই আগের ল্যাবেই। ওন্ডারের উৎসাহে আর লেখালিখির জোরে ইউরোপিয়ান রেস্পিরেটরি সোয়াইটির এক বছরের একটা স্কলারশিপ জুটে গেল। এগারো মাসের ছানাকে ডে-কেয়ারে রেখে কাজ শুরু করে দিলাম।  

৯.
ভালোয় ভালোয় একটা বছর পেরিয়ে গেল। কিছুটা একঘেয়েমি পেয়ে বসেছি। গবেষনার একই বিষয়ে অনেকদিন আটকে থাকলে যেমন হয় আর কি। উড়াধুরা সিদ্ধান্ত নিলামএকাডেমিয়া অনেক হয়েছে। এবার নতুন কিছু করে দেখি। নতুন কিছু করার নেশায় পেশা বদলটা অত সহজ হল না। দশ মাস বেকার থাকলাম। তার ছয় মাস জার্মান ভাষার উপর ক্লাস করেছি ইন্ডাস্ট্রিতে নাকি ভাষাটা খুব দরকার। আর দুই মাস একটা কোর্স করেছি। লাইফ সাইন্স ম্যানেজমেন্টের উপর এই কোর্সে পাখি পড়া করে পড়ানো হল ইউরোপ-আমেরিকার বায়োটেক কোম্পানি কিংবা ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাজের ধারা আর তাদের রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্সের মত যত খটোমটো খুটিনাটি বিষয় আছে একেবারে ক থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত, সব

এক পেট নতুন ধরনের বিদ্যা আর শ’দুয়েকের মত অ্যাপ্লিকেশন লিখে চুলে পাক ধরানোর বিনিময়ে মেডিকেল ইমেজ অ্যানালাইসিস নিয়ে কাজ করে এমন এক ছোট্ট ফার্মে কাজ জুটে গেল। মিউনিখের প্রানকেন্দ্রে সাজানো গোছানো অফিসে সবাই স্যুট-টাই, স্কার্ট-টপ পরে ফিট বাবু সেজে আসে। ভুশভুশে জিন্স পরে অভ্যস্ত আমার কাছে ব্যাপারটা দুর্দান্ত লাগলো। টকটকে লাল লং স্কার্টের সাথে সাদা বুটিকের টপ পরে আমিও জাতে ওঠার চেষ্টা চালালাম। কিন্তু বিধি বাম। কাজটার গৎবাঁধা ধরন আর অহেতুক মিটিং-আলোচনা-ভালোচনার অত্যাচারে মাস খানেকের মাথায় হাঁপ ধরে গেল। সুযোগ বুঝে ভুশভুশে জিন্স আমাকে ‘আয়, খুকি আয়’  বলে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকলো।

তার আগেই অবশ্য ম্যানেজারের ঘরে ডাক পড়লো। ‘তোমার মনে কাজটা ভাল লাগছে না। আমরা কিছু কিছু বুঝতে পারছি। তুমি কি মানিয়ে নিতে আরেকটু সময় নিতে চাও?’ সুযোগটা লুফে নিলাম। বিনয়ের সাথে একটা অনুচ্চ ‘না’ বলে আধা ঘন্টার ভেতর ল্যাপটপ ইত্যাদি জমা দিয়ে অফিসের বদ্ধ খোপ থেকে বেরিয়ে খোলা বাতাসে অনেকদিন বাদে নিঃশ্বাস নিলাম বুক ভরে।

১০.
এবার পা ফেলতে হবে সাবধানে। তাই খুব বেছে বেছে হাতে গোনা কিছু জায়গায় আবেদন পাঠালাম। অ্যাকাডেমিয়া আর ইন্ডাস্ট্রির মাঝে ফারাক করলাম না। ভাল লাগাকে দাম দিয়ে এগোলাম। হোক বেতন কম  কিংবা বছর খানেকের চুক্তির চাকরি। খুঁজে পেতে একটা মোটামুটি মন মতো চাকরি পেয়ে গেলাম। টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখে পোস্টডক। দুই বছরের চুক্তি। ক্যান্সার রোগীদের টিস্যু ইমেজ অ্যানালাইসিস নিয়ে কাজ। কোম্পানির অভিজ্ঞতাটা কাজে দিয়েছে চাকরিটা পেতে। কোন অভিজ্ঞতাই ফেলনা না আসলে, হোক সেটা মিষ্টি মধুর কি তিতকুটে বিচ্ছিরি স্বাদের।

দুই বছরের এক বছর প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। চুক্তি বাড়লে খুব ভাল। নইলে নতুন চাকরি খোঁজার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। এই খেলাটাকে ভয় পাবার বদলে উপভোগ করি ইদানীং।
সেই ভোঁও ইন্টারভিউ থেকে শুরু হয়েছে এই যাত্রার। সেই পথ এখনো চলছে। এর শেষ কই, জানা নেই শুধু জানি, জীবন একটা বয়ে চলার বস্তু। এর কোনো কিছুই পাথরে খোদাই করা নানতুন জায়গা, নতুন মানুষ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। চলতি পথে নতুন কত কি শিখিবোহেমিয়ান এই প্রবাসজীবনে তাই গন্তব্যের চাইতে ভ্রমনটাই বেশি রোমাঞ্চের।

(উচ্চশিক্ষা বিষয়ক সংকলন, 'স্বপ্নের সীমানা পেরিয়ে', মাতৃভাষা প্রকাশ, বইমেলা ২০২০)

-ডঃ রিম সাবরিনা জাহান সরকার
গবেষকঃ ইন্সটিটিউট অব প্যাথোলজি, স্কুল অব মেডিসিন,
টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি
১৫.০২.২০২০