Sunday, August 16, 2020

টেনেরিফের বতুতা বাহিনী-৪

৮.

ভাজা পাপড়ের মত মচমচে রোদ উঠেছে। পাহাড়ি পথ বেয়ে ড্রাইভ করে যাচ্ছি আমরা। রেন্ট-এ-কার থেকে সারাদিনের জন্যে গাড়ি নেয়া হয়েছে। গাড়ি ভালোই। তবে রাস্তা ‘রোড টু হেল’। এমন ঘোরেল পথ বাপের জন্মে দেখি নি। এঁকেবেঁকে কোন তেপান্তরে যে মিশেছে, বলা মুশকিল। তার উপর বিশাল এক একটা লরি ভুঁই ফুড়ে উল্টো দিক থেকে ধেয়ে আসছে হুশহাশ। পাশ কাটানো রীতিমত মিশন ইম্পসিবল সিনেমার স্টানবাজি। মুহূর্তের বেখেয়ালে কত কি ঘটে যেতে পারে, ভেবে সিঁটিয়ে বসে প্রমাদ গুনছি। আর যে গাড়ি চালাচ্ছে তার অবস্থা ঘেমে-নেয়ে একাকার।

মনোযোগ ঘুরিয়ে আনলাম চালকের দিকে। বেশ লাল্টু চেহারা। নাকের ডগায় ফোঁটায় ফোটা ঘাম জমেছে। গড়িয়ে পড়লো বলে। ড্রাইভিং সিটের পাশে বসেছি। সাইড মিররে নাক বোঁচা একটা কালো মেয়ে দেখা যাচ্ছে। মনে মনে ক্রুর হাসি হাসলাম। বাংলাদেশের সমস্ত শ্যামলা-কালো মেয়েদের তরফ থেকে এক ফর্সা, লাল্টু ছেলে বাগিয়ে মধুর প্রতিশোধ নিয়ে ফেলেছি। কালো মেয়েদের কি সাধ-আহ্বলাদ নেই নাকি?

আদিবা-আকরামরা অবশ্য দু’জনই ভীষন সুশ্রী। একেবারে ব্রাহ্মণ লেভেলের ফর্সা। খালি তাদের বাচ্চাটা হয়েছে জাপানি। তার চেহারা পুরোই হিরোশিমা-নাগাসাকি। তাকে যথেচ্ছা জাপানি পুতুল বলে ক্ষেপানো হয়। ব্যাপারটা সে দারুন উপভোগও করে। বড় হয়ে আবার কোন কনিচিয়াওয়া-আরিগাতোকে বিয়ে না করে ফেললে হয় প্রবাসে প্রথম প্রজন্ম। ভবিষ্যৎ মতি গতি হলফ করে কিছুই বলা যায় না।

৯.

লোরো পার্ক নামটা শুনেই বেশ লড়ে চড়ে বসেছিলাম। কোথাও বেড়াতে গেলে লোকে বেশ পড়ে টড়ে নেয়, কোথায় কি আছে না আছে দেখার।অতিরিক্ত অলস হবার কারনে এসমস্ত হ্যাপায় যাই না। অন্ধের মত বাকিদের পিছু পিছু হাঁটি। এটা এক ধরনের ফাঁকিবাজিমূলক ধূর্তামি। তবে কি মনে করে এবার কিছু পড়াশোনা করে এসেছি। পথে আসতে আসতে পানি-জুসের সাথে সে বিদ্যা আবার গিলেও ফেলেছি। এমন কি লোরো পার্ক যে টেনেরীফের কোন মাথায়, সে জায়গারই বা নাম কি, কিছুই মনে পড়ছে না। সুতরাং, প্লাসে-মাইনাসে রসগোল্লা। তাছাড়া, বিদ্যার একটা ভার আছে। সব ভুলে গিয়ে বেশ নির্ভার লাগছে। বেড়াতে এসে এত জ্ঞান পেটে নিয়ে ঘুরবোই বা কেন?

শুধু মনে আছে লোরো পার্ক একটা চিড়িয়াখানা টাইপ জায়গা। চিড়িয়াখানা বরাবরই ভাল লাগে। সারাক্ষন মানুষ নামের দু’পেয়ে লেজকাটা চিড়িয়া দেখে দেখে একঘেয়েমি পেয়ে বসে। তখন  রঙ বেরঙের লেজওয়ালা, শিংওয়ালা, পাখাওয়ালা নতুন চিড়িয়ার দেখা পেলে তাই মন্দ লাগে না। তবে লোরো পার্কের চিড়িয়ারা শুধু বসে বসে ঝিমায় না। এখানে তাদের নিয়ে নাকি অনেক রকম খেলা দেখানো হয়। একটা সার্কাস সার্কাস গন্ধ পেয়ে ছেলেমানুষি মনটা চনমনে হয়ে উঠলো

প্রথমেই আমরা পেঙ্গুইনের ডেরায় হানা দিলাম। মাঝারি আকারের পেঙ্গুইনগুলো কাঁচ ঘেরা বরফ রাজ্যের বাসিন্দা। কৌতূহলী হয়ে কাঁচে নাক ঠেকাতেই  তাদের একজন ব্যস্ত পায়ে টলমল এগিয়ে এল। ভাব দেখে মনে হচ্ছে যেন অভিযোগ করছে, ‘এতক্ষনে আসার সময় হল? সেই কখন থেকে টাক্সিডো চাপিয়ে বসে আছি। খালি বো টাইটা খুঁজে পাচ্ছি না। কই যে রাখলাম...’বলেই আবার তেমনি ব্যস্ত ভঙ্গিতে বাকিদের কাছে ফিরে একটা মাছ খুঁজে নিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে চিবোতে লাগলো। এদিকে, এতগুলো টাক্সিডো-ম্যানের সাজগোজের টাই-ফিতা আমি কোত্থেকে যোগাড় দেবো? তাই আস্তে সটকে এলাম

১০.

ইঁদুর-বাদুড়, হাতি-ঘোড়া, বাঘ-ভাল্লুক ইত্যাদি স্যান্ডার্ড চিড়িয়া দেখে-দুখে সী লায়নের বিশাল ছবিটার সামনে এসে দাঁড়ালাম এবং সেখানে ঢুকে পড়লামএতদিন ধারনা ছিল সিন্ধুঘোটকই  বুঝি সী লায়ন। হাত-পা তেমন নেই। অলস। বুকে হেঁটে বেড়ায়। কিন্তু সে হিসেবে দেখা গেল। সী লায়নগুলো দুই ডানায় ভর দিয়ে রীতিমত দাবড়ে বেড়াচ্ছে পুলের পাড়েমিজাজ খিচড়ে গেলে এক আধবার কান ফাটিয়ে চ্যাঁও ভ্যাঁও করে চ্যাঁচাচ্ছেও তাদের সাথের মানুষ সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে।  

তারা সংখ্যায় পাঁচ জন। একে একে নাম ডেকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হল। একজনের নাম মা তারা। ভুল শুনলাম না তো? লোকটা বলেই চলল, ‘আর এই হল লিসা, তার পাশে পেত্রা...’ ইত্যাদি। বাকিদের নাম লোকজনের হাততালিতে আর কানে এসে পৌঁছাতে পারলো না।

খেলা শুরু। প্লাস্টিকের রিং ছুড়ে ছুড়ে মারা হচ্ছে। মা তারা তার দলবল নিয়ে ‘ব্যোম কালি’ জপে কাজে লেগে পড়লো। অসাধারন ক্ষ্রিপ্ততায় মাথা বাগিয়ে রিংগুলো পরে নিতে লাগলো ঝটপটতাদেরকে গাঁদা ফুলের মালা পরা মন্ত্রী-মিনিস্টারদের মত দেখাচ্ছে একদমআমাদের ছানাগুলো খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে আনন্দে চিৎকার জুড়েছেউত্তরে সী লায়নগুলোও হালকা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালো পেশাদারী কায়দায়।

এই সুযোগে বিশাল হোৎকা একজন, পালের গোঁদা হবে হয়তো, অতর্কিতে এক ধাক্কায় তার ট্রেইনারকে পানিতে ফেলে দিল। বাকিদের সে কি হাততালি ফ্লিপার থাবড়ে। সাথে আবার ‘এহে এহে এহে’ হেঁচকি তুলে বিচিত্র এক হাসি। মানুষ-চিড়িয়া জলে পড়ে গেছে, এই খুশিতে একটা উঁচু দরের তামাশা না করলেই নয়।  শোরগোল ছাপিয়ে জোর ভল্যুমে গান ছেড়ে দেয়া হল। সার্কাস চলতে থাকলো গানের তালে।

১১.

ডলফিনের আস্তানায় এসেছি। আট-নয়টার একটা ঝাঁক। তাদের মুখ হাসি হাসি। বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। বিশ-তিরিশ ফিট ওপরে দড়ি থেকে বল ঝোলানো। বাঁশির তীব্র এক ফু ফোঁকা হল। আর সাথে সাথে পানির ভেতর থেকে দারুন দক্ষতায় উড়ে এল ডলফিনের পাল। জলের প্রানীর উড়ে বেড়ানো যেন ছেলে খেলা।  ধূসর মসৃন ত্বকে রোদ খেলে গেল ঝিকমিকিয়ে। বলের গায়ে গুঁতো মেরে শূন্যে ঘূর্ণি তুলে  ডিগবাজি খেয়ে আবার পানির নিচে হারিয়ে গেল।

পরের খেলা যথেষ্ট বিপদজনক। সাত-আট বছরের একটা ছেলেকে ডিঙ্গিতে বসানো হল। সেও কমলা লাইফ জ্যাকেটের ভেতর থেকে দর্শকের দিকে তাকিয়ে খুব এক চোট হাত নাড়লো। ভয় ডরের চিহ্নমাত্র নেই। একটা আলাপী চেহারার ডলফিন এগিয়ে এসে ডিঙ্গির দড়ির লাটাইটা দাঁতে কামড়ে নিলকিছু বুঝে ওঠার আগের পানিতে বুদ্বুদ তুলে সুতীব্র গতিতে ডিঙ্গি টেনে এপার থেকে ওপারে নিয়ে যেতে থাকলো। কিন্তু ওপারে না নিয়ে তো পানির নিচেও টেনে নিতে পারতো। তখন তো একবারে পরপার অবধি পৌঁছে যেতে হত। ভাবতেই ঘেমে গেলাম। কেন যেন মনে হল, বিনোদন ব্যবসার কাছে বিপদ-আপদের সীমাগুলো ফিকে হয়ে যায় কখনো সখনো।

যাহোক, বাচ্চাটাকে আস্ত আর জ্যান্ত পৌঁছে দিয়ে ডলফিনটা গোটা দুই মাছ গিলে সন্তষ্টচিত্তে ফেরত গেল।

ঘুরপাক খেতে থাকা ছোট্ট আকারের আরেক ডলফিন শিষ্যকে ডেকে নিল তার মানুষ গুরু। তারপর তার মাথায় চড়ে দু’দিকে দুহাত ছড়িয়ে লোকটা সার্ফিং করার ভঙ্গিতে পুরোটা পুল এক পাক ঘুরে দেখালো। গতি, ভারসাম্য আর উত্তেজনার এ এক অদ্ভূত মিশেল। হাত তালি দিতে যাব, অমনি গুরু সমেত শিষ্য জলের অতলে ডুব! ক’টা বুদ্বুদ ভেসে উঠলো খালিতারপর একেবারে সব চুপ। দর্শকের গ্যালারিও দম আটকে চুপতারপর পাঁচ-দশ সেকেন্ডকে প্রায় অসীম অপেক্ষা বানিয়ে চোখে-মুখে অতল রাজ্য জয়ের হাসি নিয়ে লোকটা হঠাৎ ভুশ্ করে ভেসে উঠল ডলফিনের পিঠে আঁকড়ে। আর আমরাও ফোশ্ করে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক বাবা, চোখের সামনে কারো সলিল সমাধি দেখতে হল না। (চলবে)

ছবি কৃতজ্ঞতায়ঃ আদিবা আমাথ

মিউনিখ, জার্মানি

০৮.০০৮.২০২০

No comments:

Post a Comment