Monday, November 9, 2020

আঠারো নম্বর ট্রোগার স্ট্রিট


১.

সকালের একটা রুটিন আছে। কাগজের কাপে গরম কফি আর এক টুকরো রুটি কিনতে ক্যাফেটেরিয়ায় হানা দেই। করিডোরের সেন্সর লাগানো দরজটা খুলে যায় নিচ থেকে ওপরে। গ্যারেজের দরজার আদলে। এটা হাসপাতালের ব্যাকডোর। জরুরি বিভাগের ঠিক নিচে। ঢুকলেই সাদা বিছানা চোখে পড়ে। নতুন চাদর পালটে স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে মুড়ে রাখা হয়েছে। পরের কোনো রোগীর অপেক্ষায়। হাসপাতালের বিছানাগুলোকে এক ধরনের পোর্টাল মনে হয়। এ যেন আরেক জগতের প্রবেশপথ। সুস্থতা থেকে জরায় আপনাকে স্বাগতম। রোগ-জরাকে পাশ কাটিয়ে কফির উষ্ণতায় ভর দিয়ে বেরিয়ে আসি। সকালের বিশুদ্ধ বাতাস কেটে অফিস বরাবর হাঁটতে থাকি।

রেখস্ট ডের ইজার। মিউনিখের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির নিজস্ব হাসপাতাল। খুব বেশি দিন হয় নি প্যথলজি বিভাগে কাজ করি। ডাক্তার নই, তবে গবেষক। মলিক্যুলার বায়োলজিস্ট। ক্যান্সারের মত অসুখ নিয়ে কাজ করলেও তাই রোগী আর তাদের বাস্তবতা যথেষ্ট দূরে। অন্তত এতদিন তাই ভাবতাম। কিন্তু ইদানীং প্রায়ই হকচকিয়ে যেতে হচ্ছে।  

সেক্রেটারী পেত্রা আর আমি একই অফিসে বসি। হাসিখুশি অমায়িক মানুষ পেত্রা। আজকে কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে রিভলভিং চেয়ারে গা ডুবিয়ে জাঁকিয়ে বসেছি। চোখে পড়লো পেত্রার টেবিলে মোটা প্লাস্টিকের ব্যাগ স্তুপ করে রাখা। ইমেইল পড়তে পড়তে আলপটকা জানতে চাইলাম, ‘ওগুলো আবার কি, পেত্রা?’। রহস্যময় জবাব এল, ‘এগুলো বডি ব্যাগ। লাশ পুরে চেইন টেনে দেয়া হয়, জিইইইপ্’। শুনে আমার চোয়াল ঝুলে হাঁটুতে নেমে এল। ঘাবড়ানো চেহারা দেখে পেত্রা তাড়াতাড়ি করে ধামা চাপা দেয়ার ভঙ্গিতে বলে বসল, ‘আরে ওগুলো তো অ্যানিমেল ল্যাবের জন্যে। বড় সাইজের শুকর বা কুকুর কাটাকুটির পর মুড়িয়ে নিয়ে যাবে।‘ শুনে সরল মনে বিশ্বাস করে ফেললাম। চোয়াল আবার হাঁটু থেকে জায়গামত ফেরত এল। তবে একটা ব্যাগ নাড়াচাড়া করে মনে হল, আস্ত মানুষও প্যাকেট করে ফেলা যাবে অনায়াসে। 

প্যাকেটে মোড়ানো না হলেও আস্ত মানুষের দেখা মিললও খুব শীগগিরই। তৈরি ছিলাম না ব্যাপারটার জন্যে। এক সকালে খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়াশোনা করছি। দুপুরে একটা পেপার প্রেজেন্টেশন আছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স কাজে লাগিয়ে কিভাবে ক্যান্সার ডায়াগনোসিস করা যায়। নেচার জার্নালে ছাপা হওয়া খটোমটো পেপারটার ‘প’ও বুঝতে পারছি না। তাও দাঁত খিঁচে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। 

এমন সময়ে দরজায় আলতো টোকা। কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে দেখি কালো পোশাকে জনাকয়েক অপরিচিত নারী পুরুষ। তাদের চেহারা বিধ্বস্ত। অল্পবয়সী একটা মেয়ে আবার ফুঁপিয়ে কাঁদছেও। দলের বয়স্ক ভদ্রলোক তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেই রুমালে চোখ মুচছে বারবার। ঘটনা দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। খানিকটা ইতস্তত করে একজন প্রশ্ন করলো, ‘আমাদের আত্মীয় মারা গেছেন গতকালকে। শেষবারের মত দেখতে এসেছি। হাসপাতাল থেকে এই সময়ে আসতে বলেছে । কিন্তু কোথায় যাবো, ঠিক বুঝতে পারছি না। যদি একটু সাহায্য করতেন।‘  

মুশকিলে পড়লাম। এ ধরনের ব্যাপার আমার কাজের ভেতরে পড়ে না। একে ওকে ফোন লাগিয়ে লাভ হল না। কি কারনে যেন পুরোটা দালান খা খা করছে। পেত্রাও নেই আজকে। থাকলে সে-ই সামাল দিত। চট করে মনে পড়লো, আরে নিচে তো একটা ঘর আছে। প্রেয়ার রুম। ওখানে নিয়ে যাই এদের। অফিসের সামনে জটলা না পাকিয়ে সেখানে অপেক্ষা করলেই বরং ভাল। এর ভেতর কাউকে না কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে। 

এক পাল লোকজন নিয়ে মাইনাস টু-তে নেমে এলাম। চাবি ঘুরিয়ে পাল্লা খুলতেই জমে গেলাম মুহূর্তে। এ ঘর তো খালি নয়! শূন্য ঘরের মাঝে স্টিলের ট্রলিতে কে ওটা? চোখ সয়ে আসতেই দেখি শ্বেতশুভ্র কাপড়ে মিশরীয় মমির আদলে বুকে হাত ভাঁজ করে শুয়ে আছে সৌম্য চেহারার কে যেন। নিথর অথচ কি জীবন্ত। এতটাই জীবন্ত যে এই বুঝি ভুর কুঁচকে তাকিয়ে বলবে, ‘শান্তিতে ঘুমাতেও দেবে না দেখছি। আর ঘুমাবোই না, ধুর্’...। দৃশ্যটা একই সাথে সম্মোহনী আবার অসহনীয়। 

কি যে ভূতে ধরলো, লোকজনকে বললাম, ‘ভেতরে একজন আছেন। একবার কি দেখবেন আপনাদের আত্মীয় কিনা?’ উত্তরে চট্ করে উঁকি মেরে দেখে নিলো অল্পবয়সী মেয়েটা। তারপর প্রবল বেগে মাথা নাড়তে থাকলো। আরেক প্রস্থ কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল। ভুল লোকের কাছে  ভুল পার্টি নিয়ে এসেছি তাহলে। মারাত্মক গুবলেট হয়ে গেল দেখছি। রীতিমত বিপন্ন বোধ করলাম। হাঁচড়ে পাঁচড়ে আবার ওপরে উঠে এলাম সাহায্যের আশায়। ওদিকে পিলে টিলে চমকে গিয়ে ফুসফুস-হৃতপিন্ড যে জায়গা অদল বদল করে ফেলেছে, সেদিকে গ্রাহ্য করারও সময় পেলাম না। 

হঠাৎ দেবদূতের মত উদয় হল পরিচিত এক মুখ। তার পরনে পরিস্থিতির সাথে একদম বেমানান রকমের মেঝে ছোঁয়া পান্না সবুজ ইভিনিং গাউন। ‘কি, ওরা নিচে নাকি? বার বার বলেছি আমার সাথে আপয়েন্টমেন্ট নিতে। একটা প্রোটোকল আছে না!’ গজগজ করতে করতে পাঁচ ইঞ্চি উঁচু স্টিলেটো হিলে ঠক্ ঠক্ তুলে নিচে নেমে গেল বছর ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের ফ্রাউ ব্রাউনআইস। তার হাতে সব ছেড়ে ছুড়ে পালিয়ে বাঁচলাম। তবে নিচে দাঁড়ানো লোকজন ভদ্রমহিলার বেশভুষা দেখে ভড়কে না গেলে হয়। 

লাঞ্চের টেবিলে ঘটনা খুলে বলতেই কলিগদের চোখ কপালে উঠল। ‘এরপর থেকে এমন হলেই ফ্রাউ ব্রাউনআইসকে ফোন লাগাবে। তার কাজই হচ্ছে মৃতদেহ সাজিয়ে গুছিয়ে আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখার ব্যবস্থা করা। এর ভেতরে আর মাথা গলিয়ো না। প্রোটোকল ভাঙ্গার ক্যাঁচালে পড়ে যাবে।‘ 

এক মনে শুনে গেলাম কথাগুলো। ফ্রাউ ব্রাউনআইসের পোশাক-রহস্যও বুঝলাম খানিকটা। পাতালঘরের মৃত্যুপুরীতে যার নিত্যদিনের কাজ, তাকে মনে প্রানে বেঁচে থাকতে হলে বর্ম পরে নিতে হয়। আপাদমস্তক ঢাকা জাঁকালো পোশাকগুলো আসলে তার বর্ম। ধূসর মৃত্যুর বনামে দুর্ভেদ্য রঙ্গীন ঢাল।
 
যাহোক, এক ঢোকে প্লেটের খাবার গিলে দারুন এক শিক্ষা নিয়ে ফিরে এলাম অফিসে। শিক্ষাটা হল, আঠারো নম্বর ট্রোগার স্ট্রিটের এই দালানে জীবিতদের সমান্তরালে নীরবে নিভৃতে মৃতরাও বাস করে। যেখানটায় বসে আছি, তার ঠিক দুই তলা নিচেই হাত ভাঁজ করে কেউ একজন শুয়ে আছে প্রিয়জনদের শেষ দেখার আশায়। সে বেলার মত কাজে মন বসানো দায় হয়ে গেল। 

২.
তারপর কেটে গেছে বেশ কয়েক মাস। ঢাকনি চাপানো লম্বা ট্রলিগুলো দেখে আর ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের ট্রলি ভেবে ভুল করি না। এই গাড়িতে চেপে হাসপাতাল-টু-মর্গ আর মর্গ-টু-প্রেয়ার রুমে চুপচাপ কাদের যাওয়া-আসা, সেটাও জেনে গেছি এতদিনে। মোট কথা, মোটা দাগের একটা নির্বিকার ভাব চলে এসেছে। 

এক মাঝ দুপুরে সেই নির্বিকারত্ব জলে ভেসে গেল। সিড়ি ভাঙবো না বলে আলসেমি করে লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। চার তলায় কাজ আছে একটা। এমন সময়ে এক ভদ্রলোক পায়ে পায়ে এগিয়ে এলেন। ‘অমুক নম্বর রুমটা কোথায় বলতে পারেন?’ চট্ করে হাত চলে গেল ফোনে। ফ্রাউ ব্রাউনআইস কেস। ওপাশ থেকে জবাব এল, ‘রিসেপশনে বসতে বলবে একটু? এক্ষুনি আসছি। পাঁচ মিনিট, ওকে?’

একই কথা আবার তোতাপাখির মত আউড়ে লিফটের বোতাম চাপলাম। ভদ্রলোক বাধ্য ছেলের মত সোফার এক কোনে বসে পড়লো। বয়স চল্লিশ কি বেয়াল্লিশ। ছ’ফুটের ওপরে সুপুরুষ চেহারা। মাথা ঝুঁকিয়ে বসায় কোঁকড়ানো চুল কপাল বেয়ে নেমে পড়েছে। কোলের ওপর বাদামী লেদার ব্যাগ। কি ভেবে ব্যাগটার দিকে তাকালাম। যেনতেন ভাবে কাপড় ঠেসে জোর করে চেইন টেনে দিয়েছে কেউ যেন। অলক্ষ্যে এক টুকরো স্কার্ফ বেরিয়ে পড়েছে। তাতে বেগুনি রঙ্গে হালকা ফুলেল ছোপ। 

‘আমার ওয়াইফের ব্যাগ। হাসপাতাল থেকে ফেরত দিল।‘ অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম। কিন্তু জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নামাতে গিয়ে জিজ্ঞাসা যেন আরো বেড়ে গেল। লোকটা বুঝতে পেরে বলেই চললো, ‘ওকেই আরেকবার দেখতে এসেছি।‘ এই দেখতে আসার কারন বুঝিয়ে বলতে হয় না আমাকে। 

বেগুনি স্কার্ফ হাতের মুঠোয় উঠে এসেছে লোকটার। তাকে কূলহারা নিঃস্বের মত লাগছে। অস্ফুট একটা স্বরে চারপাশটা ভারি হয়ে উঠছে ক্রমশ। আশেপাশে লোকজন যে যার মত আসছে-যাচ্ছে; রুটিন কাজের ফাঁকে ডানে বামে ভ্রূক্ষেপ নেই কারো। শুধু আমিই যেন অচল দাঁড়িয়ে রইলাম। ফ্রাউ ব্রাউনআইসের পাঁচ মিনিট বুঝি আর ফুরোয় না। 

৩.
সপ্তাহ খানেক হল এক তলার অফিসে ছেড়ে তিন তলার নতুন অফিসে ঠাঁই নিয়েছি। ভালই হয়েছে। কালো স্যুট-স্কার্ট পরা লোকজনের হানা থেকে বেঁচে গেছি। শুধু একটাই সমস্যা। হেলিকপ্টারের শব্দে কানে তালা লাগার যোগাড় হয় প্রায়ই। এই শব্দ মানেই কেউ একজন ভয়ানক অসুস্থ বা মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা। তাকে কোন দূর দূরান্ত থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে হাসপাতালের ছাদে।

এইমাত্র কটকটে হলুদ রঙের আরেকটা হেলিকপ্টার নামছে। এই নিয়ে দিনের তিন নম্বর। জানালা বন্ধ করে হেন্ডফোন কানে লাগিয়ে বসলাম। একটা অনলাইন ক্লাস নিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি অল্প কিছু দিন। নেশাটা রয়ে গেছে। কালেভদ্রে সুযোগ পেলে তাই ছাড়ি না। নানান বিভাগের পিএইচডি ছাত্রদের বাড়তি ক্রেডিটের ক্লাস। করোনাকালের এই নতুন স্বাভাবিকে ছাত্রদের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। তারপরও টানা দেড় ঘন্টা ডিজিটাল প্যাথলজির উপর বকবক করে সময় ভালই উড়িয়ে দেয়া গেল। 

ক্লাস শেষে আমার মুক্তি মিললেও ছেলেমেয়েগুলো চারকোনা স্ক্রিনে বন্দী রয়ে গেল। একটা প্র্যাক্টিকাল আছে। ল্যাব ডেমোন্সট্রেশন। নিচের ডিসেকশন রুমের ছবি ভেসে উঠলো পর্দায়। স্টেইনলেস স্টিলের ধাতব টেবিলে ফুটবলের মত কি যেন রাখা। কৌতূহল জাগলো। লাঞ্চে যাচ্ছিলাম। বাদ দিয়ে আবার বসে পড়লাম। ক্যান্টিনের অখাদ্য একদিন নাই বা খেলাম।

খিদে অবশ্য এমনিতেও মিটে গেল। নিউরো-প্যাথলজির ডক্টর ক্লেয়ার ডেলব্রিজ স্বভাবসুল্ভ অমায়িক হেসে আলতো হাতে যে বস্তুটা তুলে নিয়েছে সেটা দেখছি আস্ত মানুষের ঘিলু! ফর্মালিনে চুবিয়ে রাখায় কিছুটা ইলাস্টিক ভাব চলে এসেছে। ছাত্রদের একজন বনে গিয়ে হাঁ করে দেখতে থাকলাম। ভৌতিক-হরর সিনেমার পর্দা থেকে যেমন চাইলেও চোখ সরানো যায় না, তেমন একটা চুম্বক আকর্ষন কাজ করছে। 

ডক্টর ক্লেয়ার বলে চলছে, ‘বয়স আশি পেরোনো। মৃত্যুর কারন, কোভিড ১৯ সংক্রান্ত জটিলতা। গবেষনার কাজে পরিবারের অনুমতি নিতে মৃতদেহ সংরক্ষন করা হয়েছে। আসো, আমরা এবার পুরো মস্তিষ্ক কেটে দেখাবো...।‘ পরের আধা ঘন্টা ছুড়ি, স্কালপেল আর ফরসেপে চড়ে মানুষের মাথার সেরিবেলাম, সেরিব্রাল কর্টেক্স ইত্যাদি ইত্যাদি যত খোপ-খোপর আছে, গোল গোল হতভম্ব চোখে সব ঘুরে এলাম। টেবিলের ওপর চাক চাক করে কাটা স্লাইসের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। 

‘দেখলে, বয়স কিংবা করোনার আঘাত ছাপিয়েও ঘিলুটা দারুন রকমের অক্ষত রয়ে গেছে।‘ ডক্টর ক্লেয়ারের গলায় সরল উচ্ছ্বাস। ওদিকে, কান্ড দেখে আমার গলা শুকিয়ে গেছে। মাথা তো আমরা কেটেকুটে খতম করে দিলাম। মুন্ডুবিহীন ধড়টা তাহলে কোথায়? রোমহর্ষক চিন্তাটা বাকি দিনের মত খিদে-টিদে একদম ঘুঁচিয়ে দিলো।   

৪.
আরেকদিন। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ফিরে যাবো। ভাবলাম, পেত্রাকে বিদায় বলে যাই। তিনতলায় চলে যাবার পর আলাপ হয় না আর আগের মতন। দেখি, সে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ফোনে কথা বলছে উঁচু গলায়। কি যেন হারিয়ে গেছে। ফোন রেখে দিলে শুধালাম, ‘কি হারালো আবার? কোনো কাজে আসলে বলো না, হাত লাগাই।‘ পেত্রা ফোশ্ করে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, ‘আর বলো না, ডেথ সার্টিফিকেট মিসিং। একটু আগে একজন আত্মহত্যা করেছে। হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল। সার্টিফিকেট সমেত এখন লাশ আরেকখানে যাবে। অপঘাতে মৃত্যু, তাই ময়নাতদন্ত হবে হয়তো। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার পর প্যারামেডিক দেখলো, আরে কাগজ কই? মাত্রই তো চাদরে ঢাকা স্ট্রেচারে রাখা ছিল।’ 

ছোট্ট একটা ভিমড়ি খেলাম শুনে। ওদিকে, পেত্রা রাগে দুঃখে রীতিমত গজগজ করছে, ‘গবেট একটা। পঞ্চাশ বছর বয়স মাত্র। হাতে আরো কত বছর ছিল। কই রিটায়ার করে দেশ-বিদেশ বেড়াবে, তা না ফটাশ্ করে মরতেই হবে...?‘ শুনে টুনে আমি চলেই যেতে পারতাম। কোনো কাজে আসবো না এখানে। কিন্তু কি কারনে যেন যেতে পারছি না। পেত্রার ফোন আসছে একের পর এক। ইতস্তত দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছু একটা শোনার আশায়। ট্রোগারস্ট্রাসের অতি পুরানো প্যাথলজী ভবনের বাইরে বৃষ্টি নেমেছে। এমন দিনে দেখছি মরেও শান্তি নেই।

এদিকে, ডেথ সার্টিফিকেট বাতাসে উড়ে গেল কিনা খোঁজার জন্যে লোকজনের একদল বৃষ্টির ভেতর রাস্তায় নেমেছে। আরেকদল জরুরি বিভাগের কোনা-কাঞ্চি খুঁজছে, যেখানে লোকটাকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছিল। আর তৃতীয় এক দল রোগীর বিছানা-চাদর ধোয়ার যে লন্ড্রী আছে হাসপাতালে, বুদ্ধি করে সেখানে গিয়েছে। 

আরো পাঁচটা ফোন চালাচালির পর পেত্রার ঠোঁটে স্বস্তির হাসি ফুটলো। লন্ড্রীর চাদরের ভাঁজে লুকিয়ে ছিল কাগজগুলো। আমিও হাঁপ ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। 

ট্রেন সেটেশন বরাবর হাঁটছি। হঠাৎ এক তাড়া কাগজ উঁচিয়ে ইউরেকা কায়দায় দু‘জন ছুটে আসতে দেখলাম। অ্যাম্বুলেন্সের কাছে দাঁড়ানো বাকি দু’জন হাতের বিড়ি ছুড়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে গাড়ির দরজা খুলে দিল তাদের জন্যে। সেই সুইসাইড খাওয়া লোকের গাড়ি নয় তো? হালকা উঁকি দেবার আগেই সশব্দে অ্যাম্বুলেন্সের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। প্যাঁ পোঁ বিকট সাইরেন বাজিয়ে গাড়ি ছুটল পংখিরাজের গতিতে। 

কত কি যে ঘটে এই আঠারো নম্বর ট্রোগার স্ট্রিটে। এখানে যা ঘটে, শহরের আর কেউ তা জানে না। সে কাহিনী প্যাথলজি ভবনের দেয়ালে লেখা থাকে চুনকামের কলমে। সাদা চোখে তার কিছুই দেখা যায় না। শুধু কান পাততে হয় খুব সন্তর্পনে। তাহলেই শোনা যায়, প্রার্থনা ঘরের অনুচ্চ ফিসফিস, ডিসেকশন রুমের ছুড়ি-স্কালপেলের সঙ্গত কিংবা কি শোকে মরে যাওয়া বিষন্ন লোকটার অন্তিম ছাড়পত্রের জন্যে অদ্ভূত অপেক্ষা। 

-মিউনিখ, জার্মানি 

No comments:

Post a Comment

পর্তুগালের অলিগলি-১

১ এলোমেলো কয়েক পাক ঘুরতেই ছোট্ট লিসবন বিমানবন্দরটা ফুরিয়ে গেল। ডিউটি ফ্রি শপে কেনাকাটা করার লোক নই। তারপরও এক-দুইটা পারফিউমের বোতল টিপেটুপে ...